down of head

বাংলাদেশে রোহিঙ্গাদের মধ্যে উদ্বেগ সৃষ্টি করছে ১ লাখেরও বেশি নবজাতকের পরিচয়

বাংলাদেশের ঘনবসতিপূর্ণ শরণার্থী শিবিরে বসবাসকারী ১ মিলিয়নেরও বেশি রোহিঙ্গাদের অধিকাংশ শিশুই বেড়ে উঠছে অমানবিক পরিবেশের মধ্যে। সাড়ে চার বছর আগে গণপ্রস্থানের পর থেকে এই নির্যাতিত মানুষগুলো এখন ১ লাখেরও বেশি নবজাতক শিশুর ভবিষ্যত নিয়ে চিন্তিত। অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের মতে, ২০১৭ সালের আগস্ট মাসে মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যের একটি নৃশংস সামরিক দমন-পীড়ন থেকে প্রায় ৭ লাখ ৫০ হাজার রোহিঙ্গা বাংলাদেশে পালিয়ে আসে, যার জেরে দক্ষিণ এশীয় এই দেশটিতে মোট রাষ্ট্রহীন মানুষের সংখ্যা ১.২ মিলিয়নের উপরে পৌঁছেছে।

শান্তিপূর্ণ ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসনের অনিশ্চয়তা সত্ত্বেও সংখ্যা বৃদ্ধি অব্যাহত থাকায় নবজাতক শিশুদের ভবিষ্যত নিয়ে রাষ্ট্রহীন রোহিঙ্গাদের মধ্যে হতাশা বাড়ছে। ২০২০ সালের আগস্টে প্রকাশিত সেভ দ্য চিলড্রেন রিপোর্ট অনুযায়ী,২০১৭ সালের আগস্ট থেকে তিন বছরে প্রায় ৭৬ হাজার শিশু শরণার্থী শিবিরে জন্মগ্রহণ করেছে। এই পর্যন্ত, বর্তমান বৃদ্ধির হারের উপর ভিত্তি করে শিশুদের সংখ্যা ১ লাখ ছাড়িয়ে গেছে বলে প্রত্যাশিত। দুই সন্তানের রোহিঙ্গা জননী আয়েশা খাতুন আনাদোলু এজেন্সিকে বলেন, “আমরা আমাদের নবজাতক শিশুদের ভবিষ্যত নিয়ে গুরুতর উদ্বিগ্ন কারণ মিয়ানমার সরকার আমাদের বহু প্রজন্মের ঐতিহাসিক পটভূমি থাকা সত্ত্বেও আমাদের দেশের আইনি নাগরিক হিসেবে স্বীকৃতি দেয়নি।”ভাসান চরের প্রত্যন্ত বাংলাদেশি দ্বীপে তার স্বামীর সাথে বসবাসকারী খাতুন বলেন, তিন বছর আগে কক্সবাজারে বাংলাদেশের মূল ভূখণ্ডের ক্যাম্পে তিনি তার দ্বিতীয় সন্তানের জন্ম দিয়েছিলেন এবং কয়েক মাসের মধ্যে তিনি আরেকটি সন্তানের প্রত্যাশা করছেন।

তিনি জানান, “আমি জানি না আমার দুই সন্তানের মর্যাদা বা জাতীয় পরিচয় কী হবে কারণ আমরা বাংলাদেশে শরণার্থী মর্যাদা ছাড়াই রাষ্ট্রহীন মানুষ হিসেবে বসবাস করছি এবং আমাদের জন্মভূমিতে নাগরিকত্ব থেকে বঞ্চিত।” খাতুনের মতো বাংলাদেশের হাজার হাজার রোহিঙ্গা তাদের নবজাতকের ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বিগ্ন।

সুখ দুশ্চিন্তায় পরিণত হয়েছে
কক্সবাজারের মূল ভূখণ্ডের ক্যাম্পে থাকা রোহিঙ্গা দম্পতি মোহাম্মদ খুশান ও তাসলিমা বেগম আনাদোলু এজেন্সিকে জানান, ২ বছর আগে তাদের দুই ছেলের জন্ম নেয় বাংলাদেশে। খুশান বলেন, “আমাদের মতো ক্যাম্পে অনেক পরিবার রয়েছে যাদের নবজাতক শিশু রয়েছে।

শিশুর মুখ দেখলে মানুষ খুশি হয়, কিন্তু প্রতিটি শিশুর জন্মের সাথে সাথে আমাদের উদ্বেগ বাড়তে থাকে।” শিবিরে বসবাসকারী আরেক দম্পতি মনু মিয়া এবং নুন্নাহার বেগম, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় এবং আয়োজক সরকারকে নবজাতক শিশুদের প্রতি আরও নমনীয় হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন যাতে তাদের মৌলিক অধিকারের (যেমন স্কুলে পড়ালেখা) সঙ্গে কোনো আপোস করা না হয়। ক্যাম্পের এক শিক্ষিত রোহিঙ্গা যুবক মোহাম্মদ হামিদুল্লাহ আনাদোলু এজেন্সিকে বলেছেন, ”শরণার্থী শিবিরে জন্ম নেওয়া শিশুদের দোষ নয়। অন্তত আমাদের এখানে যেমন বিধিনিষেধের মধ্যে কাটাতে হচ্ছে তারা যেন সেই সমস্যার মধ্যে না পড়ে।”

দ্বিপাক্ষিক আলোচনায় ‘নবজাতক’ ইস্যু
রাখাইন থেকে বাস্তুচ্যুত ব্যক্তিদের পরিচয় যাচাইয়ের জন্য নবগঠিত অ্যাড-হক টাস্ক ফোর্সের প্রথম বৈঠকটি কার্যত বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের মধ্যে ২৭ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠকে
নবজাতকের কোনো উল্লেখ ছিল না। যদিও বাংলাদেশে রোহিঙ্গা মুসলমানদের একটি বিস্তৃত তালিকা তৈরির প্রক্রিয়ার উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে, যা রাষ্ট্রহীন মানুষদের অধিকার ও মর্যাদার সাথে তাদের দেশে প্রত্যাবাসনে সহায়তা করবে। বৈঠকে বাংলাদেশি প্রতিনিধিদলের নেতৃত্ব দেওয়া শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার শাহ রিজওয়ান হায়াতের মতে চিহ্নিত রোহিঙ্গাদের সকল শিশুকে অবশ্যই মিয়ানমারের নাগরিক হতে হবে। অনেক রোহিঙ্গার নাম ও ভাষার পার্থক্যের কারণে রেকর্ডিংয়ের সময়ে কিছু ভুলত্রুটি রয়ে গেছে।

হায়াত বলেন, যৌথ কমিটি এটিতে কাজ করবে যাতে বাংলাদেশি শিবিরে বসবাসকারী সমস্ত রোহিঙ্গাদের তাদের বাড়ি এবং নিজের দেশ সম্পর্কে নিখুঁত রেকর্ড থাকে। নবজাতকের বিষয়টি পরবর্তী প্রাসঙ্গিক দ্বিপাক্ষিক বৈঠকে উত্থাপিত হবে বলে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন তিনি। জাতিসংঘের ১৯৫১ শরণার্থী কনভেনশন এবং ১৯৬৭ প্রোটোকল (শরণার্থীদের অবস্থা সম্পর্কিত) অনুসারে, “যদি কোনো শরণার্থীর দাবি অস্বীকার করা হয়, তাহলে তার শিশুটিকে অভিবাসনে থাকার অনুমতি দেওয়া যেতে পারে।”হায়াত যোগ করেছেন যে নির্যাতিত রোহিঙ্গাদের জন্য বাংলাদেশ আন্তরিকভাবে তার দরজা খুলে দিয়েছে এবং তাদের সম্ভাব্য সবরকম উপায়ে সাহায্য করছে। ”আমাদের মূল উদ্দেশ্য হল রোহিঙ্গাদের মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসন করা এবং আমরা সেই লাখ্য অর্জন না করা পর্যন্ত তাদের নবজাতক শিশুদের সবরকম যত্ন নেব।” এই আশ্বাস দিয়েছেন হায়াৎ।

সম্পর্কিত খবর