২০৪০ সালের মধ্যে তামাকমুক্ত দেশ গড়া নিয়ে সংশয়

২০৪০ সালের মধ্যে তামাকমুক্ত দেশ বাস্তবায়নে রাষ্ট্রের আন্তরিকতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি সাবের হোসনে চৌধুরী। তিনি বলেন, ‘আসলেই কি বাংলাদেশ এফসিটিসির স্বাক্ষরকারী দেশ হিসেবে থাকতে চায়। ২০৪০ সালের মধ্যে দেশকে তামাকমুক্ত করার প্রধানমন্ত্রীর ঘোষণা বাস্তবায়নে রাষ্ট্রের আন্তরিকতা কতটুকু? আগামী সংসদ অধিবেশনে এ বিষয়ে আমি প্রশ্ন তুলব।’

তিনি বলেন, ‘আমি জনগণের প্রতিনিধিত্ব করছি। তাই জনগণের সুস্বাস্থ্য নিশ্চিত করাও আমার দায়িত্ব। সংবিধানের মূলনীতি ও সর্বোচ্চ আদালতের নির্দেশনা মানা হলে নতুন করে তামাক কারখানার অনুমোদন দেয়া হয় কী করে?’

গতকাল রাজধানীর সিরডাপ মিলনায়তনে ‘তামাক কোম্পানির হস্তক্ষেপ সূচক: এফসিটিসি আর্টিক্যাল ৫.৩ বাস্তবায়ন প্রতিবেদন, বাংলাদেশ ২০২১’ শীর্ষক গবেষণা প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়। সেখানে তিনি এসব কথা বলেন। গবেষণা ও অ্যাডভোকেসি প্রতিষ্ঠান প্রজ্ঞা (প্রগতির জন্য জ্ঞান) ও অ্যান্টি-টোব্যাকো মিডিয়া অ্যালায়েন্স (আত্মা) অনুষ্ঠানটির আয়োজন করে।

অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি সাবের হোসেন চৌধুরী বলেন, ‘এক বছরে তামাকজনিত কারণে যত মৃত্যু হয়েছে, তা গত ২০ মাসে কভিডে মৃত্যুর চেয়ে পাঁচগুণ বেশি। কভিড ভাইরাস নিয়ন্ত্রণে যত তৎপরতা, তামাক নিয়ন্ত্রণে তত তৎপরতা নেই কেন?’

অনুষ্ঠানে জানানো হয়, তামাক কোম্পানির অব্যাহত হস্তক্ষেপে ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে বাংলাদেশ। কভিডকালে তামাক কোম্পানিগুলোর আগ্রাসী কার্যক্রমে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ফ্রেমওয়ার্ক কনভেনশন অন টোব্যাকো কন্ট্রোলের (এফসিটিসি) কার্যকর বাস্তবায়ন ও তামাকমুক্ত বাংলাদেশ গড়ার লক্ষ্যমাত্রাও এখন হুমকিতে। এদিকে ‘তামাক কোম্পানির হস্তক্ষেপ সূচক, ২০২১’-এ বাংলাদেশের অবস্থানের অবনতি হয়েছে। এবারের স্কোর ৭২, গত বছর ছিল ৬৮। অর্থাৎ এ সময়ে দেশে তামাক কোম্পানিগুলোর হস্তক্ষেপ বেড়েছে। এফসিটিসির আর্টিক্যাল ৫.৩-এর নির্দেশাবলি বাস্তবায়নে কোনো অগ্রগতি হয়নি। বৈশ্বিক সূচকে বাংলাদেশের অবস্থান ৬২তম। দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যেও অবস্থান নিচের দিকে। ভারত ৪১তম, পাকিস্তান ২০তম, মালদ্বীপ ১৯তম, শ্রীলঙ্কা ১৫তম ও নেপাল ১৩তম অবস্থানে রয়েছে। চলতি বছর বিশ্বের ৮০টি দেশে গবেষণা পরিচালিত হয়েছে। সূচকে স্কোর যত বেশি হয়, হস্তক্ষেপও তত বেশি বোঝায়।

সরকারের তামাক নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রম কোম্পানির হস্তক্ষেপমুক্ত রাখতে এফসিটিসির আর্টিক্যাল ৫.৩-এর আলোকে একটি নীতিমালা প্রণয়নের প্রয়োজনীয়তা রয়েছে। সেজন্য প্রগতির জন্য জ্ঞান (প্রজ্ঞা) ২০১৮ সাল থেকে এ গবেষণা করছে বলে অনুষ্ঠানে জানানো হয়। ব্লুমবার্গ ফিল্যানথ্রপিস স্টপ (স্টপিং টোব্যাকো অরগানাইজেশন্স অ্যান্ড প্রোডাক্টস) প্রজেক্টের আওতায় গবেষণায় সার্বিক সহযোগিতা করেছে থাইল্যান্ডের থামাসাত ইউনিভার্সিটির গ্লোবাল সেন্টার ফর গুড গভর্ন্যান্স ইন টোব্যাকো কন্ট্রোল (জিজিটিসি)।

কূটনৈতিক পর্যায়েও হস্তক্ষেপ হচ্ছে বলে উল্লেখ করে গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জাপান টোব্যাকো ইন্টারন্যাশনাল (জেটিআই) কোম্পানির পক্ষ থেকে অর্থমন্ত্রীকে লেখা জাপানি রাষ্ট্রদূতের চিঠিতে বলা হয়েছে, জেটিআইয়ের ব্যবসা ক্ষতিগ্রস্ত হয়, এমন কোনো তামাক নিয়ন্ত্রণ পদক্ষেপ নিলে তা বাংলাদেশে ভবিষ্যৎ বিদেশী বিনিয়োগের (এফডিআই) পথে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করবে।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২০ সালের এপ্রিলে লকডাউনের মধ্যে সরকারি আদেশের মাধ্যমে ব্রিটিশ আমেরিকান টোব্যাকো বাংলাদেশ (বিএটিবি) ও জাপান টোব্যাকো ইন্টারন্যাশনালকে (জেটিআই) লকডাউন বাধ্যবাধকতা থেকে অব্যাহতি দেয় শিল্প মন্ত্রণালয়। একই বছর এশিয়ান টোব্যাকো লিমিটেড নামের একটি কোম্পানিকে ঈশ্বরদী রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ এলাকায় কারখানা নির্মাণের অনুমোদন দিয়েছে বাংলাদেশ রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ এলাকা কর্তৃপক্ষ (বেপজা)।

অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি সাংবাদিক মনজুরুল আহসান বুলবুল বলেন, ‘তামাকের পক্ষে লড়ছেন সচিব পদমর্যাদার লোক। আর তামাকবিরোধীদের সংগঠনে রয়েছেন সাবেক অতিরিক্ত সচিব পদমর্যাদার লোক। তাহলে কারা জিতবেন? তামাক কোম্পানিতে চাকরি পেয়ে তরুণরা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেন। এটাও তামাকের পক্ষে এক ধরনের ক্যাম্পেইন।’

ভাইটাল স্ট্র্যাটেজিসের বাংলাদেশ কান্ট্রি অ্যাডভাইজার শফিকুল ইসলাম বলেন, ‘তামাক কোম্পানি যত সুবিধা পাচ্ছে, তার জন্য আইনের ফাঁকফোকর দায়ী। এসব ছিদ্র বন্ধ করতে হবে।’

ক্যাম্পেইন ফর টোব্যাকো ফ্রি কিডসের (সিটিএফকে) লিড পলিসি অ্যাডভাইজার মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, ‘গবেষণায় থলের বিড়াল বের হয়ে আসেনি। আরও অনুসন্ধান করা দরকার ছিল। পরিবেশের ক্ষতির বিষয়টিও গবেষণায় উঠে আসেনি। কভিডকালে তামাক কোম্পানির আয় বেড়েছে। সিএসআরের নামে তারা বিজ্ঞাপনি প্রচারণা চালিয়েছে। সরকারের টার্গেট কি রাজস্ব, নাকি স্বাস্থ্য সুরক্ষা?’

গ্লোবাল হেলথ অ্যাডভোকেসি ইনকিউবেটরের (জিএইচএআই) বাংলাদেশ কান্ট্রি লিড রুহুল কুদ্দুছ বলেন, ‘জনগণের স্বাস্থ্য সুরক্ষা আগে দরকার। তারপর অন্য সব উন্নয়ন।’

দি ইউনিয়নের টেকনিক্যাল অ্যাডভাইজার সৈয়দ মাহবুবুল আলম বলেন, ‘তামাক কোম্পানি রাষ্ট্রের চেয়ে শক্তিশালী নয়। রাজনৈতিক দলের চেয়েও শক্তিশালী নয়।’

অনুষ্ঠানের সভাপতি বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ড. কাজী খলীকুজ্জমান আহমদ সরকারের কাছে সাত দাবি তুলে ধরেন। দাবিগুলো হলোÑ১. তামাক কোম্পানি থেকে সরকারের অংশীদারিত্ব ছেড়ে দিতে হবে। ২. তামাক রপ্তানিতে ২৫ শতাংশ কর পুনর্বহাল করতে হবে। ৩. তামাক চাষ নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। কারণ কুষ্টিয়া ও বান্দরবানসহ দেশে তামাক চাষ বেড়েছে। ৪. তামাক কোম্পানিকে রাষ্ট্রপতি পুরস্কারসহ অন্যান্য স্বীকৃতি দেয়া বন্ধ করে দিতে হবে। ৫. তামাক পণ্যে দাম বাড়িয়ে দিতে হবে। ৬. নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে হস্তক্ষেপ বন্ধ করতে হবে। ৭. তামাকের কুফল নিয়ে প্রচারণা জোরদার করতে হবে।

আত্মা’র কো-কনভেনর নাদিরা কিরণের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে গবেষণাপ্রাপ্ত ফল উপস্থাপন করেন প্রজ্ঞার তামাক নিয়ন্ত্রণ বিষয়ক কর্মসূচি প্রধান হাসান শাহরিয়ার। আত্মার কনভেনর মর্তুজা হায়দার লিটন অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য দেন। বক্তব্য দেন প্রজ্ঞার নির্বাহী পরিচালক এবিএম জুবায়ের।

সম্পর্কিত খবর