down of head

সময়মতো কাঁচামাল না পেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত উৎপাদনমুখী শিল্প

বিশ্বের ৫০টি দেশে তৈরি পোশাক রফতানি করছে প্যাসিফিক জিন্স । দেশের শীর্ষস্থানীয় রফতানিকারক প্রতিষ্ঠানটির বছরে টার্নওভার ৪ হাজার কোটি টাকারও বেশি। পণ্য পরিবহন বন্ধ থাকায় টানা চারদিন চট্টগ্রাম বন্দরে আটকে ছিল প্যাসিফিক জিন্সের ৮০ কনটেইনার পোশাকের কাঁচামাল। এখন পণ্য পরিবহন চালু হলেও সময়মতো কাঁচামাল হাতে না পাওয়ায় এর প্রভাব পড়েছে প্রতিষ্ঠানটির সামগ্রিক উৎপাদন ব্যবস্থায়।

প্যাসিফিক জিন্স গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ মোহাম্মদ তানভির এ প্রসঙ্গে বলেন, ‘উৎপাদন ব্যবস্থা ঠিক রাখতে আমাদের সময়মতো শিল্পের কাঁচামাল পাওয়াটা খুবই জরুরি। কারণ পণ্য প্রস্তুত করে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে রফতানির জন্য জাহাজে তুলে দিতে হয়। বড় সময় ধরে পণ্য পরিবহন বন্ধ থাকায় উৎপাদন থেকে রফতানি পুরো প্রক্রিয়াটিই ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। কাঁচামাল বন্দরে এসে পৌঁছলেও দ্রুত খালাসের পদক্ষেপ নিয়ে উৎপাদনে যুক্ত করা সম্ভব হয়নি। পুরো সাপ্লাই চেইন ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় নির্ধারিত সময়ে পণ্য প্রস্তুত চ্যালেঞ্জের মধ্যে পড়েছে। আমরা মনে করি, দেশের আমদানি-রফতানি কার্যক্রম বাধাগ্রস্ত হয় এমন কোনো পদক্ষেপ যাতে হুট করে কেউ বা কোনো সংস্থা নিতে না পারে সেজন্য সংসদে উপযুক্ত আইন প্রণয়ন করা জরুরি হয়ে পড়েছে।

শিল্প-কারখানার বেশির ভাগ কাঁচামাল আমদানি করা হয় সমুদ্রপথে আসা কনটেইনারের মাধ্যমে। খালাসের অপেক্ষায় থাকা আমদানি পণ্যবাহী কনটেইনার দিনের পর দিন বন্দরের অভ্যন্তরে আটকে থাকা কিংবা রফতানিতব্য পণ্য সময়মতো জাহাজীকরণ না হওয়ায় এভাবেই উৎপাদন প্রক্রিয়ায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন দেশের শিল্পোদ্যোক্তারা। আবার একই কারণে চাপ তৈরি হয়েছে চট্টগ্রাম বন্দরের ওপরও। যদিও সম্প্রতি জাহাজ জটের বদনাম ঘুচিয়ে স্বস্তি এসেছিল বন্দরের পরিচালন কার্যক্রমে।

চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের তথ্যমতে, বন্দরের জলসীমায় জাহাজ আসার পর থেকে জেটিতে ভেড়ানো পর্যন্ত সময়কে ‘অপেক্ষমাণ সময়’ হিসেবে ধরা হয়। টানা চারদিন আমদানি-রফতানিতে যুক্ত পণ্য পরিবহন বাধাগ্রস্ত হওয়ার কারণে যে চাপ তৈরি হয়েছে তা থেকে আগের অবস্থায় ফিরে আসতে কমপক্ষে আরো ১০ দিন সময় লাগবে। গতকাল পর্যন্ত বহির্নোঙর থেকে জেটিতে ভেড়ানোর জন্য অপেক্ষায় থাকা জাহাজের সংখ্যা ছিল ৭। একই সময়ে জেটিতে অবস্থান করেছে ৯টি কনটেইনার জাহাজ। এর আগে করোনার ধাক্কা কাটিয়ে গত আগস্টের মাঝামাঝি সময় থেকে জাহাজ জট কমে আসায় জেটিতে ভেড়ানোর জন্য জাহাজকে একদিনের বেশি অপেক্ষায় থাকতে হয়নি।

বন্দর কর্মকর্তারা বলছেন, চট্টগ্রাম বন্দরের বহির্নোঙরে আসার পর একটা সময় কনটেইনার জাহাজ তিনদিন অপেক্ষার পরই কেবল বন্দর জেটিতে ভেড়ার সুযোগ পেত। কিন্তু বৈশ্বিক বাণিজ্যিক পরিস্থিতি, বেসরকারি জেটিতে পণ্য খালাসের পদক্ষেপ, অগ্রাধিকার বার্থিং সুবিধাসহ চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের বেশকিছু উদ্যোগে বহির্নোঙরে আসা জাহাজ কোনো অপেক্ষা ছাড়াই দিনে দিনেই জেটিতে ভেড়ার রেকর্ড তৈরি করেছে।

চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের সচিব মো. ওমর ফারুক এ প্রসঙ্গে বলেন, ‘নানা পদক্ষেপে চট্টগ্রাম বন্দরে জাহাজ জট শূন্যে নামিয়ে এনেছিল বন্দর কর্তৃপক্ষ। পণ্য পরিবহন চারদিন বন্ধ থাকায় আমদানি-রফতানি কার্যক্রমে প্রায় অচলাবস্থা তৈরি হয়। তবে জাহাজ যাতে অপেক্ষায় থাকতে না হয়, সেজন্য দ্রুত পদক্ষেপে আবার আগের অবস্থায় ফিরিয়ে আনার লক্ষ্য নিয়ে কাজ চলছে। আশা করছি আগামী ১০ দিনের মধ্যে আগের মতো স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে যাওয়া যাবে।’

চট্টগ্রাম চেম্বার ও বন্দর ব্যবহারকারী ফোরামের সভাপতি মাহবুবুল আলম বলেন, ‘একটা দুর্যোগ কাটিয়ে ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছেন ব্যবসায়ীরা। অর্থনীতি স্বাভাবিক গতিতে ফিরে আসার পর্যায়ে রয়েছে, এমন সময়ে আমদানি-রফতানি কার্যক্রম বাধাগ্রস্ত হওয়াটা কোনোভাবেই কাঙ্ক্ষিত ছিল না। টানা চারদিন পণ্য পরিবহনে অচলাবস্থার কারণে ব্যবসায়ীরা চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। সামগ্রিকভাবে এর প্রভাব দেশের অর্থনীতিতে পড়েছে। দেশের আমদানি-রফতানি কার্যক্রম যাতে হুট করে স্থবির করে দেয়া না যায়, এজন্য সময়োপযোগী পদক্ষেপ নিতে হবে।’

চট্টগ্রাম বন্দরে জাহাজ জট কমে এলে দেশের অর্থনীতির জন্য এটা একটা বড় স্বস্তি। কারণ এ বন্দর দিয়ে দেশের আমদানি-রফতানি পণ্যবাহী কনটেইনারের ৯৮ শতাংশ আনা-নেয়া হয়। আবার সময়মতো পণ্য রফতানি কিংবা আমদানি হওয়া পণ্য সময়মতো হাতে না পেলে বাণিজ্য সক্ষমতায় পিছিয়ে পড়েন উদ্যোক্তারা।

 

পোশাক শিল্প মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএর বন্দর ও জাহাজীকরণ-বিষয়ক স্থায়ী কমিটির চেয়ারম্যান নাসির উদ্দিন চৌধুরী এ প্রসঙ্গে বণিক বার্তাকে বলেন, ধর্মঘট কিংবা কর্মবিরতির মতো পদক্ষেপগুলো বন্দরের কার্যক্রমে ধীরগতি এনে দেয়। একটা দেশে টানা চারদিন কারখানা থেকে ডিপো বা বন্দরে রফতানি পণ্য পাঠিয়ে জাহাজে তুলে দেয়া যায়নি—এমন বাণিজ্যিক পরিস্থিতি নিয়ে বহির্বিশ্বে দুর্নাম হয়। রফতানিমুখী পোশাক খাতে বড় পরিসরে এর নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে।

জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির পর ধর্মঘটের ডাক দেন পণ্য পরিবহনের যানবাহনের মালিকরা। এ পরিস্থিতিতে বৈঠকে সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয় যে জ্বালানি তেলের বর্ধিত মূল্য প্রত্যাহার করা হবে না। তবে ট্রাক-কাভার্ড ভ্যানসহ পণ্যবাহী যানবাহনের আয়ের বড় উৎস তৈরি পোশাক খাতের পণ্য পরিবহনে জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির সঙ্গে সামঞ্জস্য করে ভাড়া বাড়ানোর বিষয়ে উদ্যোগ নেয়ার আশ্বাস দেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। এর অংশ হিসেবে তৈরি পোশাক মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএ এবং নিট পোশাক মালিকদের সংগঠন বিকেএমইএর সঙ্গে বৈঠক করা হবে বলে জানান তিনি। এ আশ্বাসের পরিপ্রেক্ষিতে ধর্মঘট স্থগিত করেন পণ্য পরিবহন খাতের নেতারা।

 

সম্পর্কিত খবর