কয়লা নিয়ে অবস্থান ব্যাখ্যা করতে হবে চীন-ভারতের
সবচেয়ে ক্ষতিকর জীবাশ্ম জ্বালানি কয়লার ব্যবহার বন্ধে জাতিসংঘের এবারের কপ২৬ জলবায়ু সম্মেলনে বিশ্বনেতারা একমত হবেন বলে প্রত্যাশা করা হয়েছিল। বিশেষ করে জলবায়ু ঝুঁকিতে থাকা দেশগুলোর স্বার্থরক্ষায় এ প্রতিশ্রুতি করা হবে বলে ধারণা করা হয়েছিল। কিন্তু বহুল আলোচিত এ সম্মেলন শেষে সে প্রত্যাশার মূল বিষয়ই পূরণ হয়নি। অর্থাৎ কয়লা পোড়ানো বন্ধ নয়, বরং এর ব্যবহার কমিয়ে আনার বিষয়ে ঐকমত্যে পৌঁছেছেন বিশ্বের ২০০টিরও বেশি দেশের নেতারা। এজন্য দায়ী করা হচ্ছে চীন ও ভারতকে। বলা হচ্ছে, এ দুটি দেশই কয়লা ব্যবহার বন্ধ করার পরিবর্তে কমিয়ে আনার শর্ত জুড়ে দিতে প্ররোচিত করেছে। এজন্য জলবায়ু ঝুঁকিতে থাকা দেশগুলোর কাছে তাদের অবস্থান ব্যাখ্যা করতে বলেছেন কপ২৬ প্রেসিডেন্ট অলোক শর্মা।
তিনি বলেন, চীন ও ভারত যে কাজটি করেছে, সেটির বিষয়ে তাদের অবশ্যই ব্যাখ্যা দিতে হবে। বিশেষ করে সেই দেশগুলোর কাছে, যারা জলবায়ু পরিবর্তনজনিত কারণে সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থার মধ্যে রয়েছে। তবে যা হয়েছে তাকে পরাজয় হিসেবে দেখছেন না অলোক শর্মা। তিনি বলেন, বৈশ্বিক তাপমাত্রা বৃদ্ধির হার ১ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসে আবদ্ধ রাখার বিষয়ে একমত হয়েছেন বিশ্বনেতারা, যা একটি ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত।
তাছাড়া এটাই বিশ্বের প্রথম কোনো জলবায়ু চুক্তি, যেখানে গ্রিনহাউজ গ্যাস নিঃসরণের জন্য সবচেয়ে খারাপ জীবাশ্ম জ্বালানি কয়লার ব্যবহার কমানোর সুস্পষ্ট পরিকল্পনা করা হয়েছে।
বিবিসির এক অনুষ্ঠানে তিনি বলেন, আমি সবাইকে আহ্বান জানাব আরো বেশি কিছু করার জন্য। এ চুক্তি বিষয়ে আমাদের কাজ করে যাওয়া নিশ্চিত করতে হবে। কিন্তু শনিবার যেটা ঘটেছে, সেটার সঙ্গে সম্পর্ক রেখে আমি বলেছি, চীন ও ভারতকে নিজেদের অবস্থান ব্যাখ্যা করতে হবে। তাদের বলতে হবে, বিশ্বের সবচেয়ে বেশি জলবায়ু ঝুঁকিতে থাকা দেশগুলোর জন্য তারা কী করেছে। অলোক শর্মা বলেন, চূড়ান্ত চুক্তিতে তার ভূমিকা ছিল ঐকমত্য তৈরি করা। কিন্তু তাই বলে গতকাল যেটা হয়েছে সেটাকে ব্যর্থতা হিসেবে দেখতে নারাজ তিনি। বরং এটিকে ঐতিহাসিক অর্জন বলেই মনে করছেন।
১৯ শতকে বিশ্ব যতটা উষ্ণ ছিল, বর্তমানে তার চেয়ে ১ দশমিক ২ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেশি উষ্ণ। কপ২৬ সম্মেলনের মূল লক্ষ্য ছিল যেন ২১০০ সালের মধ্যে বিশ্বের উষ্ণতার হার ১ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের বেশি না হয় সেদিকে নজর দেয়া।
স্কটল্যান্ডের গ্লাসগো শহরে অনুষ্ঠিত এ সম্মেলন থেকে আসা সর্বশেষ সিদ্ধান্তগুলো নিয়ে এখন চলছে নানা আলোচনা-সমালোচনা। যুক্তরাজ্যের ব্যবসা ও জ্বালানিবিষয়ক ছায়ামন্ত্রী এডি মিলিব্যান্ড বলেন, বিশ্বের কাজ হলো আগামী দশকে বৈশ্বিক কার্বন নিঃসরণ অর্ধেক করা, অর্থাৎ ২০৩০ সালের মধ্যে। বিজ্ঞানীরা বলেছেন, উষ্ণতা বৃদ্ধির হার ১ দশমিক ৫ ডিগ্রি অর্জনের লক্ষ্যটি ধরে রাখা প্রয়োজন। কিছু অগ্রগতি থাকা সত্ত্বেও গ্লাসগো চুক্তি বিষয়ে সত্যটা হলো, এ লক্ষ্য অর্জনের পথে মাত্র ২০-২৫ শতাংশ এগিয়েছে বিশ্ব। তবে এর পরও অলোক শর্মার প্রচেষ্টাকেও স্বাগত জানান তিনি।
শান্তিতে নোবেলজয়ী মালালা ইউসুফজাই বলেন, নেতাদের অবশ্যই মুনাফার চেয়ে জনগণ ও পৃথিবীকে গুরুত্ব দিতে হবে। মানুষ ও পৃথিবীর জন্য ভালো হয় এমন সিদ্ধান্তই নেয়া উচিত।
ক্লাইমেট অ্যাকশন ট্র্যাকারের হিসাব বলছে, এভাবে চলতে থাকলে ২১০০ সালের মধ্যে বিশ্বের উষ্ণতা বৃদ্ধির হার হবে ২ দশমিক ৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস। যদি কোনো পদক্ষেপ নেয়া না হয়, তাহলে ভবিষ্যতে বৈশ্বিক উষ্ণতা ৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস ছাড়াবে বলে আশঙ্কা বিজ্ঞানীদের। এর ফলে মারাত্মক তাপপ্রবাহ, খরা, অতিরিক্ত বৃষ্টিপাত ও বন্যার মতো দুর্যোগ দেখা দেবে। সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বেড়ে যাওয়ায় লাখ লাখ মানুষ গৃহহীন হয়ে পড়বে। জলবায়ুর এ পরিবর্তনের ফলে বিলুপ্তির পথে থাকা প্রাণী ও উদ্ভিদ প্রজাতির সঙ্গে বাস্তুতন্ত্রও ধ্বংসের মুখে পড়বে।
গত ৩০ অক্টোবর শুরু হয় জলবায়ু সম্মেলন। চুক্তিতে পৌঁছতে নির্ধারিত সময়ের চেয়ে আরো ২৪ ঘণ্টা বেশি সময়ব্যাপী চলে সম্মেলনের আনুষ্ঠানিকতা। অবশেষে গত শনিবার চুক্তির বিষয়টি নিষ্পত্তি হয়। ১৫ দিনের এ সম্মেলনে ১২০ জন বিশ্বনেতা ও ২০০ দেশের প্রতিনিধিরা অংশ নিয়েছেন।
শনিবার সম্পাদিত চুক্তিতে প্রায় ২০০ দেশ বৈশ্বিক তাপমাত্রা বৃদ্ধির হারকে ১ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসে সীমাবদ্ধ রাখার ব্যাপারে একমত হয়। তবে বহুল প্রত্যাশিত কয়লার ব্যবহার বন্ধের বদলে কমিয়ে আনার শর্ত যুক্ত করা হয়।


