শিরোনাম
down of head

জ্বালানি সংকটে ১০ কোটি ব্যারেল তেল ছাড়বে জি-৭

বিশ্বজুড়ে জ্বালানি সরবরাহ সংকট মোকাবিলা ও ঊর্ধ্বমুখী দাম নিয়ন্ত্রণে ১০ কোটি ব্যারেল পর্যন্ত অপরিশোধিত তেল ও ডিজেল বাজারে ছাড়তে সম্মত হয়েছে শিল্পোন্নত দেশগুলোর জোট জি-৭। জোটটি জানিয়েছে, আগামী দিনগুলোতে জরুরি মজুত থেকে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ ডিজেল বাজারে ছাড়া হবে।

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ডিজেল রপ্তানি নিষিদ্ধ করার হুমকির মধ্যেই জি-৭ এই সিদ্ধান্ত নিল। দেশটির অভ্যন্তরীণ বাজারে জ্বালানির দাম কমাতে যুক্তরাষ্ট্র থেকে ডিজেল রপ্তানি বন্ধের হুমকি দিয়েছিলেন ট্রাম্প। এমন পদক্ষেপ বিশ্ববাজারে জ্বালানির দাম আরও বাড়িয়ে দিতে পারে বলে আশঙ্কা তৈরি হয়েছিল।

এক যৌথ বিবৃতিতে জি-৭ জানিয়েছে, সদস্য দেশগুলো পরস্পরের ওপর জ্বালানি ও জ্বালানি পণ্যের রপ্তানি নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা থেকে বিরত থাকবে। যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, কানাডা, জাপান, জার্মানি, ইতালি ও ফ্রান্স নিয়ে জোটটি গঠিত। ইউরোপীয় ইউনিয়নও এতে প্রতিনিধিত্ব করে।

ইউরোপীয় দেশগুলো তাদের জরুরি মজুত থেকে অতিরিক্ত তেল বাজারে ছাড়তে রাজি না হলে যুক্তরাষ্ট্র থেকে ডিজেল রপ্তানি বন্ধের হুঁশিয়ারি দিয়েছিলেন ট্রাম্প। তবে সমঝোতার পর শুক্রবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তিনি জানান, ইউরোপ তাদের বড় মজুত থেকে বিপুল পরিমাণ ডিজেল বাজারে ছাড়তে সম্মত হয়েছে এবং এই প্রক্রিয়া দ্রুত শুরু হবে।

এর আগে মার্কিন ট্রেজারি সেক্রেটারি স্কট বেসেন্ট বলেছিলেন, জ্বালানির দাম বাড়ার কারণে মার্কিন কৃষক, ট্রাকচালক ও ব্যবসায়ীদের ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করা উচিত নয়। পরিবহন ও কৃষি খাতে ডিজেলের ব্যাপক ব্যবহার থাকায় এ জ্বালানির দাম বাড়লে খাদ্যসহ বিভিন্ন নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দামেও এর প্রভাব পড়ে।

জি-৭ নেতাদের জরুরি বৈঠকের পর ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল মাখোঁ জানান, আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থার সমন্বয়ে চার মাসের মধ্যে ১০ কোটি ব্যারেল পর্যন্ত জরুরি মজুত বাজারে ছাড়ার বিষয়ে জোটটি সম্মত হয়েছে।

বৈঠকে যুক্তরাজ্যের প্রতিনিধিত্ব করেন দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী এড মিলিব্যান্ড। তিনি বলেন, এসব পদক্ষেপ জ্বালানি সরবরাহ স্থিতিশীল করবে, সরবরাহ ব্যবস্থার সক্ষমতা বাড়াবে এবং সাধারণ পরিবার ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানকে অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধির চাপ থেকে সুরক্ষা দিতে সহায়তা করবে।

মাখোঁ বলেন, সমন্বিত এই পদক্ষেপের ফলে পেট্রোলিয়ামজাত পণ্য, বিশেষ করে ডিজেলের দাম কমে আসবে। রপ্তানি নিষেধাজ্ঞা না দেওয়ার চুক্তির প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এ বিষয়ে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প অত্যন্ত স্পষ্ট ছিলেন। তবে পরবর্তীতে হোয়াইট হাউসে বক্তব্য দেওয়ার সময় ট্রাম্প দাবি করেন, ডিজেল রপ্তানি নিষেধাজ্ঞার বিষয়টি কখনোই চূড়ান্তভাবে বিবেচনায় নেওয়া হয়নি।

জি-৭-এর যৌথ বিবৃতিতে বলা হয়, আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থার মাধ্যমে সমন্বিতভাবে চার মাসে ১০ কোটি ব্যারেল পর্যন্ত মজুত ছাড়ার উদ্যোগ বাস্তবায়ন করা হবে। এর অংশ হিসেবে জি-৭ সদস্য ও অংশীদারদের মাধ্যমে প্রথম ২০ দিনের মধ্যেই উল্লেখযোগ্য পরিমাণ ডিজেল বাজারে ছাড়া হবে। তবে কোন দেশ কত পরিমাণ মজুত এবং কত দ্রুত বাজারে ছাড়বে, তা এখনো স্পষ্ট করা হয়নি। মোট ১০ কোটি ব্যারেলের মধ্যে অপরিশোধিত তেলের পাশাপাশি ডিজেলও থাকবে।

ঘোষণার পর আন্তর্জাতিক বাজারে ব্রেন্ট অপরিশোধিত তেলের দাম সাময়িকভাবে ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলারের নিচে নেমে গেলেও শুক্রবার সন্ধ্যায় তা আবার বেড়ে প্রায় ১০২ ডলারে পৌঁছায়। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ইরানে আগ্রাসনের আগে ব্রেন্ট তেলের দাম ছিল প্রায় ৭৩ ডলার ব্যারেল।

বাজার গবেষণা প্রতিষ্ঠান কেপলারের পণ্য গবেষণা পরিচালক ম্যাট স্মিথের মতে, ইয়েমেনে সৌদি আরব ও হুতিদের মধ্যে নতুন করে সংঘাতের খবর তেলের দাম বাড়াতে ভূমিকা রেখেছে। ইউরোপের কৌশলগত মজুত ছাড়ার ঘোষণায় দাম দ্রুত কমলেও বাব আল-মান্দেব প্রণালীতে নিরাপদ নৌপথ নিশ্চিত করতে সৌদি আরব ইয়েমেনে নতুন অভিযান চালাতে পারে এমন গুঞ্জনে বাজারে আবার ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা দেখা দেয়।

মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন নেতৃত্বাধীন সংঘাত এবং রাশিয়া ও চীনের সরবরাহ কমে যাওয়ার প্রেক্ষাপটে যুক্তরাষ্ট্রের ডিজেল রপ্তানি বন্ধের হুমকি ইউরোপীয় দেশগুলোর মধ্যে উদ্বেগ তৈরি করেছিল। সমঝোতায় পৌঁছানোর পর জি-৭ নেতারা জানিয়েছেন, একই সময়ে একাধিক শোধনাগার বন্ধ হয়ে যাওয়া ঠেকাতে সংস্কারকাজের সময়সূচি সমন্বয় করা হবে। পাশাপাশি যেসব শোধনাগারে সক্ষমতা রয়েছে, সেগুলোকে বিশেষ করে ডিজেল উৎপাদন বাড়াতে উৎসাহিত করা হবে।

মার্কিন ডিজেল রপ্তানি বন্ধ না হওয়ার সিদ্ধান্ত আমদানিনির্ভর দেশগুলোর জন্য স্বস্তি তৈরি করেছে। বিশেষ করে যুক্তরাজ্যের জন্য এটি গুরুত্বপূর্ণ। কারণ শুক্রবার দেশটিতে প্রথমবারের মতো পাম্পে প্রতি লিটার ডিজেলের দাম ২ পাউন্ড ছাড়িয়ে যায়।

যুক্তরাজ্যের মোট ডিজেল চাহিদার অর্ধেকের বেশি আমদানির মাধ্যমে পূরণ হয়। এর মধ্যে প্রায় ৩১ শতাংশ ডিজেল আসে যুক্তরাষ্ট্র থেকে। যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বের অন্যতম প্রধান ডিজেল সরবরাহকারী দেশ। দেশটির শোধনাগারগুলো প্রতিদিন প্রায় ৪০ থেকে ৫০ লাখ ব্যারেল ডিজেল উৎপাদন করে। এর মধ্যে প্রায় ৩৬ লাখ ব্যারেল দেশীয় বাজারে ব্যবহৃত হয় এবং বাকি ১২ থেকে ১৫ লাখ ব্যারেল প্রতিদিন রপ্তানি করা হয়।

এদিকে মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেল ও পরিশোধিত ডিজেলের সরবরাহ মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়েছে। অন্যদিকে ইউক্রেনের হামলার পর রাশিয়া তাদের শোধনাগার থেকে ডিজেল রপ্তানি নিষিদ্ধ করায় বৈশ্বিক সরবরাহ সংকট আরও তীব্র হয়েছে।

তবে ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে রাশিয়ার ওপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞা বহাল রাখার ওপর জোর দিয়েছেন জি-৭ নেতারা। পেট্রলের তুলনায় ডিজেল পরিশোধন তুলনামূলক জটিল। একই সঙ্গে পরিবহন ও কৃষি খাতে এর ব্যাপক ব্যবহার থাকায় স্বল্পমেয়াদে ডিজেলের বিকল্প তৈরি বা চাহিদা কমানোও কঠিন।

সম্পর্কিত খবর