down of head

আইনি সুরক্ষায় নতুন ধারা যুক্ত করার প্রস্তাব
‘সরল বিশ্বাসে’ ক্ষতি করলেও পার পাবেন আইডিআরএ কর্মকর্তারা!

জিনান মাহমুদ:

বীমা খাতের অংশীজনদের সঙ্গে কোনো আলোচনা ছাড়াই বীমা আইনে কর্মকর্তাদের আইনি সুরক্ষায় নতুন একটি ধারা যুক্ত করার প্রস্তাব করেছে বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ (আইডিআরএ)। নতুন এ ধারা পাস হলে ‘সরল বিশ্বাসে’ গৃহীত কাজের মিলবে দায় মুক্তি। ফলে কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান ক্ষতিগ্রস্ত হলেও আইডিআরএ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে দেওয়ানি বা ফৌজদারি- কোনো আইনি ব্যবস্থা নেওয়া যাবে না। তবে বীমা খাত বিশেষজ্ঞদের মতামত ছাড়া- এই দায়মুক্তি আইন প্রস্তাবের যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন সংশ্লিষ্টরা।

বীমা আইন, ২০১০-এ ১৫৮ ক- নামে একটি নতুন ধারা সংযোজনের প্রস্তাব করেছেন আইডিআরএ চেয়ারম্যান মীর নাদিয়া নিভিন। প্রস্তাবিত এই ধারায় জনস্বার্থে ‘সরল বিশ্বাসে’ দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান ক্ষতিগ্রস্ত হলে বা হওয়ার সম্ভাবনা থাকলেও, তার জন্য সংশ্লিষ্ট সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী, উপদেষ্টা বা পরামর্শকের বিরুদ্ধে কোনো দেওয়ানি বা ফৌজদারি মামলা কিংবা অন্য কোনো আইনি পদক্ষেপ গ্রহণ করা যাবে না বলে উল্লেখ করা হয়েছে। গত ২২ সেপ্টেম্বর মীর নাদিয়া নিভিন স্বাক্ষরিত ‘বীমা আইন, ২০১০-এর অধিকতর সংশোধনকল্পে প্রণীত প্রজ্ঞাপন’-এর প্রস্তাবনাটি অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগে পাঠানো হয়েছে।

নথি ও প্রস্তাবনার ভাষ্য অনুযায়ী, বীমা আইন বা এর অধীন প্রণীত বিধি-প্রবিধানের আওতায় ‘সরল বিশ্বাসে’ দায়িত্ব পালনকারী ব্যক্তিবর্গ এই বিশেষ সুরক্ষার সুযোগ পাবেন। এতে সরকার, বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ (আইডিআরএ), কর্তৃপক্ষের পক্ষে দায়িত্ব পালনকারী কর্মকর্তা-কর্মচারী এবং তাদের নিয়োজিত উপদেষ্টা ও পরামর্শকদের স্পষ্ট উল্লেখ করা হয়েছে। প্রস্তাবিত বিধানে সুরক্ষার প্রধান শর্ত হিসেবে ‘সরল বিশ্বাসে’ কার্যপরিচালনার বিষয়টি রাখা হলেও এটি চূড়ান্তভাবে বাস্তবায়িত হলে এর পরিধি ও সার্বিক প্রয়োগ নির্ভর করবে চূড়ান্ত আইনের ভাষ্য এবং সংশ্লিষ্ট আইনি ব্যাখ্যার ওপর।

এদিকে, এত বড় একটি গুরুত্বপূর্ণ আইনি পরিবর্তন ও সংবেদনশীল ধারা সংযোজনের ক্ষেত্রে দেশের বীমা মালিকদের সংগঠন বাংলাদেশ ইন্স্যুরেন্স অ্যাসোসিয়েশন (বিআইএ) কিংবা বাংলাদেশ ইন্স্যুরেন্স ফোরামসহ সংশ্লিষ্ট কোনো অংশীজনের মতামত বা পরামর্শ নেওয়া হয়নি। মূল অংশীজনদের সম্পূর্ণ অন্ধকারে রেখে ও কোনো প্রকার আলোচনা ছাড়াই এমন পরিবর্তন আনার বিষয়টিকে খাতের বিশেষজ্ঞরা ‘নজিরবিহীন’ সিদ্ধান্ত হিসেবে দেখছেন।

একইসঙ্গে বীমা খাতের সার্বিক সুশাসন ও স্বচ্ছতার স্বার্থে এ ধরনের বিশেষ আইনি সুরক্ষামূলক ধারা কতটা উপযোগী—তা নিয়ে জোর প্রশ্ন উঠেছে। খাত সংশ্লিষ্টদের মতে, কোনো আইনি বা প্রশাসনিক কাজের ফলে গ্রাহক কিংবা প্রতিষ্ঠান ক্ষতিগ্রস্ত হলে তারা যদি আদালতের দ্বারস্থ হতে না পারেন, তবে তা সংবিধান প্রদত্ত মৌলিক অধিকার ও ন্যায়বিচার পাওয়ার পথকে সংকুচিত করতে পারে। ফলে প্রস্তাবিত এই ধারাটি একদিকে যেমন বীমা খাতে আইডিআরএ-এর জবাবদিহিতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে, অন্যদিকে গ্রাহক ও প্রাতিষ্ঠানিক স্বার্থ রক্ষার ক্ষেত্রেও বড় ধরনের উদ্বেগের সৃষ্টি করেছে।

আইডিআরএ-র সাবেক সদস্য সুলতান-উল-আবেদীন মোল্লা নতুন আইনের প্রস্তাবনা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। অর্থবাংলাকে দেয়া এক বক্তব্যে তিনি এই আইনের বাস্তবায়ন ও যৌক্তিকতা নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, এই আইনের বাস্তবায়ন কীভাবে সম্ভব এবং ‘সরল বিশ্বাস’ কীভাবে নির্ধারণ করা হবে তা ভেবে দেখা দরকার। এছাড়া কোনো অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড সংঘটিত হলে ‘সরল বিশ্বাস’ কতটা কার্যকর হবে, সে প্রশ্নও উঠতে পারে। আদালত কিংবা প্রশাসন ‘সরল বিশ্বাস’ নিয়ে এই ব্যাখ্যা মেনে নিবে কি না—তা ভাবার বিষয় উল্লেখ করে তিনি ‘বিশেষ সুরক্ষামূলক’ এই আইন নিয়ে ব্যাপক আলোচনার প্রয়োজন রয়েছে বলে মত দেন।

তিনি আরও উল্লেখ করেন যে, বীমা আইন-২০১০-এর ১০২ ধারার (২) উপধারায় ইতিমধ্যেই স্পষ্ট বলা আছে, ৯৫, ৯৬, ৯৮, ৯৯ বা ১০০ এর আওতাধীনে সরল বিশ্বাসে কিংবা সরল বিশ্বাসের অভিপ্রায়ে সম্পাদিত কোন কার্যক্রমের পরিপ্রেক্ষিতে উদ্ভূত ক্ষয়-ক্ষতি কিংবা সম্ভাব‍্য কোন ক্ষতির জন‍্য সরকার অথবা কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে কোন মকদ্দমা বা অন‍্য কোন আইনগত কার্যধারা গ্রহণ করা যাইবে না। ফলে আইডিআরএর জন্য বীমা আইন-২০১০-এ যেখানে ইতিমধ্যেই এমন আইনি সুরক্ষার বিধান বিদ্যমান রয়েছে, সেখানে নতুন করে কোনো সুরক্ষামূলক আইনের প্রস্তাবনার আদৌ কোনো প্রয়োজন নেই বলে তিনি মনে করেন।

এ বিষয়ে আইডিআরএ-র পরামর্শক (জনসংযোগ) সাদিক আরমান অর্থবাংলাকে বলেন, “বীমা খাতের কল্যাণে কাজ করে যাচ্ছে আইডিআরএ। তবে কর্তৃপক্ষের অবস্থান পরিষ্কার—খাতের জন্য ক্ষতিকর, এমন কোনো আইন করা হবে না।”

সম্পর্কিত খবর