প্রধানমন্ত্রীর বার্তা বাস্তবায়নের এখনই সময়

মোহাম্মদ জহির উদ্দিন:
জাতীয় সংসদে প্রশ্নোত্তর পর্বে জীবন বিমা খাতের অনিয়ম, গ্রাহকের অর্থের নিরাপত্তা এবং জবাবদিহিতা নিয়ে উত্থাপিত প্রশ্নের জবাবে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জনাব তারেক রহমান যে কঠোর অবস্থান ব্যক্ত করেছেন, তা শুধু একটি প্রশাসনিক ঘোষণা নয়; বরং বাংলাদেশের জীবন বিমা শিল্পের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ নীতিগত দিক নির্দেশনা।

এই বার্তা বাস্তবে রূপ নিতে পারলে বহু বছর ধরে জমে থাকা আস্থার সংকট কাটিয়ে খাতটি নতুন ভিত্তির ওপর দাঁড়াতে পারে।

বাংলাদেশের জীবন বিমা শিল্পে অধিকাংশ প্রতিষ্ঠান সৎভাবে ব্যবসা পরিচালনা করলেও কিছু প্রতিষ্ঠানের অনিয়ম, বিলম্বিত দাবি নিষ্পত্তি, দুর্বল কর্পোরেট গভর্ন্যান্স এবং নৈতিকতার ঘাটতি পুরো শিল্পের ভাবমূর্তিকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। এর ফলে শুধু পলিসিধারীই ক্ষতিগ্রস্ত হননি, দীর্ঘমেয়াদে জাতীয় সঞ্চয় ও আর্থিক অন্তর্ভুক্তির ওপরও নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে।

প্রধানমন্ত্রীর ঘোষিত কঠোর অবস্থানকে কার্যকর করতে হলে প্রথমেই নিয়ন্ত্রক তদারকি আরও ঝুঁকিভিত্তিক, তথ্যনির্ভর এবং সময়োপযোগী করতে হবে। যে প্রতিষ্ঠানে আর্থিক দুর্বলতা, সুশাসনের ঘাটতি বা গ্রাহকের অর্থ ঝুঁকিতে রয়েছে, সেখানে দ্রুত সংশোধনমূলক ব্যবস্থা এবং প্রয়োজনে কঠোর আইনগত পদক্ষেপ নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে যারা সুশাসন ও গ্রাহকসেবায় উৎকর্ষ দেখাচ্ছে, তাদেরও নীতিগতভাবে উৎসাহিত করা প্রয়োজন।

দ্বিতীয়ত, গ্রাহকের দাবি নিষ্পত্তিকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিতে হবে। একটি জীবন বিমা প্রতিষ্ঠানের প্রতি জনগণের আস্থা গড়ে ওঠে প্রতিশ্রুতি পালনের মাধ্যমে। দ্রুত, স্বচ্ছ ও প্রযুক্তিনির্ভর দাবি নিষ্পত্তি ব্যবস্থা চালু হলে জনবিশ্বাস উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পাবে।

তৃতীয়ত, কর্পোরেট গভর্ন্যান্সকে আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করতে হবে। পরিচালনা পর্ষদের কার্যকর জবাবদিহিতা, শক্তিশালী অভ্যন্তরীণ নিরীক্ষা, ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা, ডিজিটাল নজরদারি এবং স্বচ্ছ আর্থিক প্রতিবেদন অনিয়ম প্রতিরোধের মূল ভিত্তি হতে পারে। পাশাপাশি দক্ষ ও নৈতিক মানবসম্পদ গড়ে তোলার জন্য ধারাবাহিক প্রশিক্ষণ এবং পেশাগত মানোন্নয়ন অপরিহার্য।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—অনিয়ম দমনের পাশাপাশি একটি ইতিবাচক ব্যবসায়িক পরিবেশও নিশ্চিত করতে হবে, যাতে সৎ উদ্যোক্তা, দক্ষ ব্যবস্থাপনা এবং পেশাদার উন্নয়নকর্মীরা উৎসাহিত হন। কারণ শক্তিশালী জীবন বিমা শিল্প শুধু একটি খাতের উন্নয়ন নয়; এটি দেশের বিনিয়োগ, দীর্ঘমেয়াদি সঞ্চয়, সামাজিক নিরাপত্তা এবং অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতারও অন্যতম ভিত্তি।

প্রধানমন্ত্রীর সংসদে প্রদত্ত বার্তা আমাদের সামনে একটি স্পষ্ট দায়িত্ব তুলে ধরেছে—জীবন বিমা খাতে আইনের শাসন, সুশাসন এবং গ্রাহকের স্বার্থকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিতে হবে। সরকার, নিয়ন্ত্রক সংস্থা, বিমা কোম্পানি এবং সংশ্লিষ্ট সকল অংশীজন যদি সমন্বিতভাবে এই লক্ষ্য বাস্তবায়নে এগিয়ে আসে, তবে বাংলাদেশের জীবন বিমা শিল্প নতুন আস্থা, নতুন গতি এবং আন্তর্জাতিক মানের একটি টেকসই খাতে পরিণত হতে সক্ষম হবে।

লেখক:

সাবেক ডিএমডি (অপারেশন) এবং সিইও (ভারপ্রাপ্ত)

প্রগ্রেসিভ লাইফ ইন্সুরেন্স কোম্পানি লিমিটেড।

সম্পর্কিত খবর