স্বপ্নের ফ্ল্যাট, দুঃস্বপ্নের জীবন
এ. রশিদ বাবু:
কম দামের লোভে একটি পরিবারের সর্বনাশ। একই রাস্তার দুই পাশে দুটি প্রকল্প। একটি সময়মতো শেষ হয়েছে, অন্যটি আজও কংক্রিটের কঙ্কাল হয়ে দাঁড়িয়ে।”
ঢাকার এক দম্পতি—আরিফ ও মিতু। বহু বছরের সঞ্চয়, ব্যাংক ঋণ আর আত্মীয়দের কাছ থেকে ধার করে তারা একটি ফ্ল্যাট কেনার সিদ্ধান্ত নিলেন।
তাদের সামনে ছিল দুটি প্রকল্প।
একটি প্রকল্প পরিচালনা করছিল রিহ্যাবের একজন সদস্যভুক্ত ডেভেলপার। দাম তুলনামূলক কিছুটা বেশি। তবে প্রতিষ্ঠানটির অতীত কাজ, সুনাম, অফিস, চলমান প্রকল্প—সবই ছিল যাচাইযোগ্য।
অন্য প্রকল্পটি ছিল নতুন একটি কোম্পানির। দাম ছিল অনেক কম। নতুন কোম্পানির বিক্রয়কর্মী বলেছিল, “একই লোকেশন, একই ডিজাইন। অযথা বেশি টাকা দেবেন কেন? এখনই বুকিং দিলে আরও বিশেষ ছাড় পাবেন।” কম দামের প্রলোভন জিতে গেল। আরিফ-মিতু ভাবলেন, “যখন একই ধরনের ফ্ল্যাট তুলনামুলক কম দামে পাওয়া যাচ্ছে, তখন বেশি টাকা খরচ করার কী দরকার?”
তারা ভালোভাবে কোম্পানির অতীত ইতিহাস, নিবন্ধন, সদস্যপদ কিংবা প্রকল্প বাস্তবায়নের সক্ষমতা—কোনোটিই যাচাই করলেন না।
চুক্তিতে লেখা ছিল ৩০ মাসের মধ্যে ফ্ল্যাট হস্তান্তর। প্রথম কয়েক মাস কাজ ভালোই চলল। এরমধ্যে ওই ডেভেলপারের সব ফ্ল্যাট বিক্রি ওহ শেষ। তারপর ধীরে ধীরে শ্রমিক কমে গেল। এরপর নির্মাণ পুরোপুরি বন্ধ।
অফিসে গেলে বলা হতো, “আগামী মাসেই কাজ শুরু হবে।” কিন্তু সেই “আগামী মাস” আর আসেনি। ৩০ মাস পেরিয়ে গেল। চার বছর পেরিয়ে গেল। পাঁচ বছরও শেষ।
বিল্ডিংটি অর্ধনির্মিত অবস্থায় দাঁড়িয়ে আছে। ডেভেলপারের অফিস বন্ধ। মোবাইল নম্বর বন্ধ। অনেক ক্রেতার মতো আরিফ-মিতুও বুঝতে পারলেন—তাদের স্বপ্নের ফ্ল্যাট এখন অনিশ্চয়তার অন্ধকারে।
অথচ ঠিক পাশের প্লটেই আরেকটি ভবন। সেই প্রকল্পটি পরিচালনা করেছিল রিহ্যাবের সদস্যভুক্ত একটি ডেভেলপার প্রতিষ্ঠান। নির্ধারিত সময়েই নির্মাণ শেষ হয়েছে। ফ্ল্যাট হস্তান্তরও সম্পন্ন হয়েছে।
আজ সেখানে পরিবারগুলো স্বাভাবিকভাবে বসবাস করছে। শিশুদের খেলাধুলা, সন্ধ্যায় বারান্দায় আড্ডা—সবকিছুই চলছে স্বাভাবিকভাবে। এটা দেখে আরিফ-মিতুর বুকের মধ্যে হাহা করে উঠতো। তারা তখন ভাবতো আহ কয়েক লাখ টাকা কমের কারণে আজ তাদের স্বপ্ন টা শেষ।
একদিন পরিচিত একজনের পরামর্শে আরিফ-মিতু গেলেন রিহ্যাবের মেডিয়েশন সেলে। তারা ভেবেছিলেন, হয়তো রিহ্যাব তাদের সমস্যার সমাধান করবে।
সেখানে গিয়ে তারা জানতে পারলেন, যে প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে তারা ফ্ল্যাট কিনেছেন, সেটি রিহ্যাবের সদস্যই নয়।
অর্থাৎ প্রতিষ্ঠানটি রিহ্যাবের আওতাভুক্ত না হওয়ায় রিহ্যাবের মধ্যস্থতা বা সাংগঠনিক প্রক্রিয়ায় বিষয়টি নিষ্পত্তি করার সুযোগ নেই।
সেদিন আরিফ শুধু একটি কথাই বলেছিলেন—”মাত্র কয়েক লাখ টাকা বাঁচানোর জন্য আমরা সারা জীবনের সঞ্চয় হারিয়েছি। যদি কেনার আগে একটু খোঁজ নিতাম, তাহলে হয়তো আজ আমাদের জীবনটা এমন হতো না।”
আজও তারা ভাড়া বাসায় থাকেন। একদিকে ব্যাংক ঋণের কিস্তি, অন্যদিকে ভাড়া।
ফ্ল্যাট নেই, টাকা নেই, ডেভেলপারও নেই। কম দামের লোভে নেওয়া একটি সিদ্ধান্ত তাদের পরিবারের ভবিষ্যৎকে অনিশ্চয়তার মধ্যে ঠেলে দিয়েছে।
ফ্ল্যাট কেনার সময় শুধু কম দাম দেখবেন না। ডেভেলপার প্রতিষ্ঠানের অতীত প্রকল্প ও সুনাম যাচাই করুন। প্রতিষ্ঠানটি রিহ্যাবের সদস্য কি না, তা নিশ্চিত হয়ে নিন।
মনে রাখবেন, ফ্ল্যাট জীবনে একবারই কেনা হয়। কয়েক লাখ টাকা বাঁচাতে গিয়ে যেন কয়েক কোটি টাকার স্বপ্ন ভেঙে না যায়।
পোষ্ট শেয়ার করে পরিচিত জনদের সর্তক করুন। আবাসন বিষয়ে নির্ভরযোগ্য তথ্য পেতে ফলো দিয়ে রাখুন।
লেখক: মিডিয়া অ্যান্ড রিয়েল এস্টেট কনসালট্যান্ট
ডিজিএম (হেড অব মিডিয়া অ্যান্ড কমিউনিকেশন্স) রিহ্যাব


