ইষ্টার্ণ ইন্স্যুরেন্স আয়োজিত সেমিনারে অভিমত
সবচেয়ে বেশি অবহেলা করা হয়েছে বীমা খাতকে
স্বাধীনতার পর থেকেই বাংলাদেশে বীমা খাত অবহেলিত হয়ে আসছে। আস্থার সংকটের কারণে প্রিমিয়াম আয় কমে যাওয়ায় এ খাতে দেখা দিয়েছে তীব্র নগদ তারল্য সংকট।
সরকারি ও বেসরকারি সম্মিলিত কার্যকর উদ্যোগ ছাড়া এ খাতকে রক্ষা করা সম্ভব নয়।
সম্প্রতি রাজধানীর একটি অভিজাত হোটেলে ইস্টার্ন ইন্স্যুরেন্স পিএলসি আয়োজিত ‘বাংলাদেশের বীমা খাতের চ্যালেঞ্জ, সম্ভাবনা ও ভবিষ্যৎ উন্নয়ন’ শীর্ষক এক সেমিনারে বক্তারা এসব কথা বলেন।
ইস্টার্ন ইন্স্যুরেন্সের কোম্পানি সচিব ও প্রশাসন প্রধান কাজী ফারহানার সঞ্চালনায় সেমিনারে স্বাগত বক্তব্য দেন কোম্পানির সিইও হাসান তারেক। সেমিনারে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি এবং বাংলাদেশ ইন্স্যুরেন্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিআইএ) প্রেসিডেন্ট সাঈদ আহমেদ। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন এবং মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন ইস্টার্ন ইন্স্যুরেন্সের চেয়ারম্যান আ. স. ম. ওয়াহিদুজ্জামান।
সেমিনারে বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য রাখেন সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের সচিব ড. মোহাম্মদ আবু ইউসুফ, বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের (বিএফআইইউ) প্রধান কর্মকর্তা ইখতিয়ার উদ্দিন মোহাম্মদ মামুন, উত্তরা গ্রুপ অব কোম্পানিজের চেয়ারম্যান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক এবং ইস্টার্ন ইন্স্যুরেন্সের স্পন্সর পরিচালক মতিউর রহমান, বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস অ্যাসোসিয়েশনের (বিটিএমএ) প্রেসিডেন্ট শওকত আজিজ রাসেল এবং বিআইএ-এর ইসি মেম্বার বেলাল আহমেদ। এছাড়া সেমিনারে বিভিন্ন নন-লাইফ বীমা কোম্পানির মালিক, পরিচালক, সিইও এবং কর্পোরেট প্রতিষ্ঠানের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে বিআইএ প্রেসিডেন্ট সাঈদ আহমেদ বলেন, স্বাধীনতা যুদ্ধের পর ব্যাংক খাতের তুলনায় বীমা খাতকে বেশ অবহেলা করা হয়েছে। দেশে ৮০টি বেসরকারি বীমা কোম্পানি কাজ করছে, যার কারণে অনেকেই কোম্পানি একীভূতকরণের কথা বলছেন। আমরা ব্যাংকিং খাতকে প্রতি বছর ১৮ হাজার কোটি টাকার ব্যবসা দিলেও তারা আমাদের আশানুরূপ ঋণ সুবিধা দিচ্ছে না। এমনকি সরকারি প্রতিষ্ঠান সাধারণ বীমা কর্পোরেশনকে (এসবিসি) পুনঃবীমার মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ রাজস্ব দেওয়া হলেও তাদের দিক থেকে প্রয়োজনীয় সহযোগিতা পাওয়া যায় না। বীমা খাতের অসম প্রতিযোগিতার জন্য কেবল সিইওদের দোষ দেওয়া ঠিক নয়, এর জন্য মালিকরাই বেশি দায়ী উল্লেখ করে তিনি এ খাতের উন্নয়নে আমৃত্যু লড়ে যাওয়ার অঙ্গীকার প্রকাশ করেন।
মূল প্রবন্ধ উপস্থাপনে ইস্টার্ন ইন্স্যুরেন্সের চেয়ারম্যান আ. স. ম. ওয়াহিদুজ্জামান বিশ্ববাজারে বীমার গ্রহণযোগ্যতা, বর্তমান পরিসংখ্যান এবং কৃষিভিত্তিক বাংলাদেশে প্রান্তিক পর্যায়ে বীমার সম্ভাবনার কথা তুলে ধরেন। তিনি বলেন, সরকারকে কর না দিলে জনগণ সেবা পাবে কোথা থেকে? প্রতি বছর ৬ লাখ ৪৮ হাজার কোটি টাকা কর আদায় অত্যন্ত অপ্রতুল। দেশপ্রেম না থাকলে প্রবৃদ্ধি অর্জন সম্ভব নয়। বীমা খাতের প্রবৃদ্ধি বাড়াতে পণ্যের পরিধি ও এর বহুমুখীকরণের ওপর আমাদের সকলকে জোর দিতে হবে।
স্বাগত বক্তব্যে কোম্পানির সিইও হাসান তারেক বলেন, দেশে বীমা কোম্পানির সংখ্যা বেশি হলেও বাজারের আকার অত্যন্ত ক্ষুদ্র। মোটর বীমা বাধ্যতামূলক নয় এবং নগরের বড় বড় ঝুঁকিপূর্ণ ইমারতগুলো এখনও বীমার আওতায় আসেনি। তাই বীমা খাতের পেনিট্রেশন বাড়াতে সরকারের আন্তরিক সহযোগিতা কামনা করেন তিনি।
বিএফআইইউ-এর প্রধান কর্মকর্তা ড. ইখতিয়ার উদ্দিন মোহাম্মদ মামুন উল্লেখ করেন, ঝুঁকিহীন বিনিয়োগ ও ভবিষ্যতের সুরক্ষা দেওয়া সত্ত্বেও বীমায় মানুষের আগ্রহ কম, কারণ দেশের আর্থিক খাত আস্থাহীনতায় ভুগছে। বিশেষ করে আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যে নন-লাইফ বীমার তথ্য একটি সুনির্দিষ্ট কাঠামোর আওতায় রাখা জরুরি। বিটিএমএ প্রেসিডেন্ট শওকত আজিজ রাসেল বলেন, আমরা প্রিমিয়াম গ্রহণ করলেও পুনঃবীমায় আগ্রহ দেখাই না, ফলে গ্রাহকের দাবি নিষ্পত্তিতে গড়িমসি তৈরি হয় এবং আস্থার সংকট দেখা দেয়। বাজারের তুলনায় কোম্পানির সংখ্যা বেশি হওয়ায় দুর্বল কোম্পানিগুলোকে একীভূত করার পরামর্শ দেন তিনি।
এছাড়া বিআইএ-এর ইসি মেম্বার বেলাল আহমেদ জানান, দেশে বছরে প্রায় দেড় মিলিয়ন (১৫ লাখ) এলসি (ঋণপত্র) খোলা হয়। এসব এলসিকে একটি সমন্বিত প্ল্যাটফর্মে আনার জন্য তিনি বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতি অনুরোধ জানান। সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের সচিব ড. মোহাম্মদ আবু ইউসুফ হতাশা প্রকাশ করে বলেন, বিশ্বের অন্যান্য দেশে বীমা খাত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখলেও আমাদের চিত্র করুণ। এ খাতে অস্বাস্থ্যকর প্রতিযোগিতা চলছে এবং তথ্যপ্রযুক্তির অপব্যবহার করে অনেক কোম্পানি একাধিক সার্ভার ব্যবহার করছে, যা অবিলম্বে বন্ধ করা প্রয়োজন।
সেমিনারে সার্বিক আলোচনার ভিত্তিতে বীমা খাতের আধুনিকায়ন, তথ্যপ্রযুক্তির অপব্যবহার রোধ, সনাতন কাঠামোর বাইরে গিয়ে নতুন পণ্য চালু করা, দুর্বল কোম্পানিগুলোকে একীভূত করা এবং নগরের বহুতল ভবনসহ প্রধান অর্থনৈতিক ঝুঁকিগুলোকে বাধ্যতামূলক বীমার আওতায় আনার জোর সুপারিশ করা হয়।



