বিশ্বব্যাংকের দীর্ঘসূত্রতায় ধীরগতিতে চলছে উন্নয়নকাজ

৪ হাজার ৩৭৪ কোটি ২১ লাখ টাকা ব্যয়ে চলছে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব শিল্পনগর উন্নয়ন প্রকল্পের কাজ। গত বছরের জানুয়ারি থেকে বাস্তবায়ীতব্য এ প্রকল্পে প্রায় ৪ হাজার কোটি টাকা অর্থায়ন করছে বিশ্বব্যাংক। কিন্তু ক্রয় প্রক্রিয়ার বিভিন্ন পর্যায়ে বিশ্বব্যাংকের অনুমোদন দীর্ঘসূত্রতার কারণে প্রকল্পের অগ্রগতি হচ্ছে বেশ ধীরে। ফলে বরাদ্দকৃত অর্থ খরচ করা সম্ভব হচ্ছে না। তাই চলতি অর্থবছরের সংশোধিত বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে (আরএডিপি) বরাদ্দকৃত অর্থের ৭৬ দশমিক ২৭ শতাংশ কমিয়ে ১৬ কোটি ৭৬ লাখ টাকা নির্ধারণ করার প্রস্তাব দেয়া হয়েছে। সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব ড. আহমদ কায়কাউসের সভাপতিত্বে প্রকল্প স্টিয়ারিং কমিটির (পিএসসি) সভার কার্যপত্র সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।

সংশ্লিষ্ট সুত্র জানায়, চট্টগ্রামের মিরসরাইয়ে দেশের বৃহত্তম অর্থনৈতিক অঞ্চল বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান শিল্প নগরকে দেশী-বিদেশী উদ্যোক্তাদের জন্য দ্রুততম সময়ে প্রস্তুত করা হচ্ছে। এ প্রকল্পের আওতায় শিল্প নগরের দুটি জোনকে সবুজায়ন করার পাশাপাশি আধুনিক সেবা সংযুক্ত করা হবে। দেশের বৃহত্তম এ অর্থনৈতিক অঞ্চলকে সবুজ অর্থনৈতিক অঞ্চল হিসেবে গড়ে তোলার মাধ্যমে বিশ্বের নামি-দামি ব্র্যান্ডগুলোকে আকৃষ্ট করা এবং মানসম্পন্ন কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরির পরিকল্পনা নিয়ে এগোচ্ছে সরকার। এর অংশ হিসেবে ‘বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব শিল্প নগর উন্নয়ন’ শীর্ষক এ প্রকল্প হাতে নেয় বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষ (বেজা)।

এরপর গত বছরের ৩ ফেব্রুয়ারি ৪ হাজার ৩৭৪ কোটি ২১ লাখ টাকা ব্যয়ে প্রকল্পটির অনুমোদন দেয় জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটি (একনেক)। এ প্রকল্পে ৩ হাজার ৯৬৭ কোটি ৪৬ লাখ টাকা ঋণ দিচ্ছে বিশ্বব্যাংক। চার বছরের এ প্রকল্পের কাজ ২০২৫ সালে শেষ করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। তবে প্রকল্পের কাজ দেরিতে শুরু হওয়া এবং বিভিন্ন ক্ষেত্রে বিশ্বব্যাংকের অনুমোদন প্রাপ্তি বিলম্বের কারণে প্রকল্পের কাজ নির্দিষ্ট সময়ে সম্পন্ন করা সম্ভব হবে না বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্টরা।

প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিবের সভাপতিত্বে পিএসসি সভায় বেজার পক্ষ থেকে বলা হয়, প্রকল্পের বিভিন্ন ভৌত কাজের ইনভাইরনমেন্ট সোস্যাল ইম্প্যাক্ট অ্যাসেসমেন্ট, ডিজাইন, সহনশীলতা পরীক্ষাসহ ক্রয় প্রক্রিয়ায় বিভিন্ন পর্যায়ে বিশ্বব্যাংকের অনুমোদনের দীর্ঘসূত্রতার কারণে প্রকল্পের অগ্রগতি ধীরে হচ্ছে। তাই কাঙ্ক্ষিত হারে অর্থ ব্যয় করা সম্ভব হচ্ছে না। এ কারণে চলতি অর্থবছরে প্রকল্পের অনুকূলে এডিপিতে বরাদ্দকৃত ৯৩ কোটি ১৩ লাখ টাকা থেকে কমিয়ে ১৬ কোটি ৮৬ লাখ টাকা অর্থের প্রয়োজন হবে। সভায় আরো বলা হয়, ডিপিপির (উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব) ক্রয় পরিকল্পনায় গ্যাস পাইপলাইন নির্মাণকাজ ডেলিগেটেড কাজ হিসেবে বাস্তবায়ন করার বিষয়টি স্পষ্ট উল্লেখ থাকলেও বিশ্বব্যাংক থেকে এক্ষেত্রে আপত্তি তোলা হয়েছে।

এ পরিপ্রেক্ষিতে বৈঠকে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয় যে, প্রকল্পের ক্রয় প্রক্রিয়ায় বিভিন্ন পর্যায়ে বিশ্বব্যাংকের অনুমোদনের দীর্ঘসূত্রতার কারণে প্রকল্প বাস্তবায়নে ধীরগতির বিষয়টি নিয়ে বিশ্বব্যাংকের সঙ্গে জরুরিভিত্তিতে আলোচনা করতে হবে। এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক আব্দুল্লাহ আল মাহমুদ ফারুক বণিক বার্তাকে বলেন, বিশ্বব্যাংক প্রত্যোকটা জিনিস বেশ সময় নিয়ে নিরীক্ষা করে। তারা ডিজাইন থেকে শুরু করে আর্থসামাজিক ক্ষেত্রে এ প্রকল্পের কী ধরনের প্রভাব পড়বে সবকিছু দেখে। তারপর অর্থায়নের পরিমাণ ঠিক আছে কিনা, জলবায়ুতে ও মানুষের জীবনের প্রকল্পের প্রভাব কী ধরনের হবে এসব বিশ্লেষণ করতে গিয়ে অনেক সময় ক্ষেপণ করে।

তবে প্রথম কয়েকটি ক্ষেত্রে বিশ্বব্যাংক দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে পারত উল্লেখ করে তিনি বলেন, এজন্য আমরা স্বল্প সময়ে অর্থ ছাড় করতে বারবার চিঠি দিচ্ছি। কিন্তু তারা প্রক্রিয়া শেষ না করে টাকা দিচ্ছে না। তাই প্রকল্প বাস্তবায়নে কিছু ধীরগতি রয়েছে। বর্তমানে যে গতিতে কাজ হচ্ছে এভাবে অগ্রসর হলে নির্ধারিত সময়ে প্রকল্প সম্পন্ন হবে কিনা এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, প্রকল্পটির কাজ শুরুই হয়েছে প্রায় ছয় মাস দেরিতে। তাই নির্ধারিত সময়ে কাজ শেষ না হলে মেয়াদ বাড়ানোর সুযোগ রয়েছে।

বেজা সূত্র জানায়, চট্টগ্রামের মিরসরাই ও ফেনীর সোনাগাজীতে ৩০ হাজার একর জমিতে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব শিল্পনগর গড়ে তোলা হচ্ছে। নতুন এ প্রকল্পের আওতায় সেখানকার দুটি জোনের প্রায় এক হাজার একর ভূমি উন্নয়ন করা হবে। একই সঙ্গে গ্যাস পাইপলাইন নেটওয়ার্ক, টেলিকমিউনিকেশন, বিদ্যুৎ, পানির জন্য পৃথক নেটওয়ার্ক ও কেন্দ্রীয় বর্জ্য পরিশোধন প্লান্ট (সিইটিপি) স্থাপন করা হবে। ওয়ানস্টপ সার্ভিস ও একটি দক্ষতা উন্নয়ন কেন্দ্রও গড়ে তোলা হবে প্রকল্পের আওতায়। এছাড়া এনভায়রনমেন্টাল ল্যাব ও মনিটরিং সিস্টেম এবং বায়োগ্যাস প্লান্ট ও বর্জ্য নিষ্কাশন সুবিধা তৈরির কাজ করা হবে। বিশ্বমানের সবুজ কারখানা স্থাপনের উপযোগী করে গড়ে তোলা হবে এ শিল্পনগর।

সম্পর্কিত খবর