একমি পেস্টিসাইডস লিমিটেড
বিনিয়োগকারীদের ঠকানো হচ্ছে তালিকাভুক্তির পর থেকে!
২০২১ সালে প্রাথমিক গণপ্রস্তাবের (আইপিও) মাধ্যমে পুঁজিবাজারের তালিকাভুক্ত হয়েছিল একমি পেস্টিসাইডস লিমিটেড। আর তালিকাভুক্ত হওয়া প্রথম বছরের বিনিয়োগকারীদের মাত্র পাঁচ শতাংশ লভ্যাংশ দেয়া হয়। এরপর ২০২৩ সালে বিনিয়োগকারীদের শেয়ারপ্রতি মাত্র এক পয়সা লভ্যাংশ ঘোষণা দেয়া হয়। অথচ কোম্পানির রিজার্ভে জমা আছে ১০৭ কোটি টাকা। আর ২০২২-২৩ অর্থবছরের শেয়ারপ্রতি আয় ছিল ৯৬ পয়সা এবং নিট মুনাফা প্রায় ১৩ কোটি টাকা। অর্থাৎ একমি পেস্টিসাইডস মুনাফায় থাকলেও বিনিয়োগকারীদের ঠকানোর জন্য নামমাত্র লভ্যাংশ ঘোষণা করে।
বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) সূত্রে জানা যায়, একমি পেস্টিসাইডসকে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (এসইসি) গত ২০২১ সালের ১৯ জুলাইয়ে ৭৮৫তম সভায় প্রাথমিক গণপ্রস্তাবের (আইপিও) মাধ্যমে পুঁজিবাজার থেকে ৩০ কোটি টাকা উত্তোলনের অনুমোদন দেয়। কোম্পানিটি অভিহিত মূল্য ১০ টাকা দামে তিন কোটি সাধারণ শেয়ার ইস্যুর মাধ্যমে পুঁজিবাজার থেকে ৩০ কোটি টাকা উত্তোলন করে। আর উত্তোলিত টাকা দিয়ে ব্যবসা উন্নয়নে কাজ করলেও তালিকাভুক্ত হওয়া প্রথম বছরের বিনিয়োগকারীদের মাত্র পাঁচ শতাংশ লভ্যাংশ দেয়া হয়। এরপর ২০২৩ সালে বিনিয়োগকারীদের শেয়ারপ্রতি মাত্র এক পয়সা লভ্যাংশ ঘোষণা দেয়া হয়। অথচ কোম্পানির রিজার্ভে জমা আছে ১০৭ কোটি টাকা। আর ২০২২-২৩ অর্থবছরের শেয়ারপ্রতি আয় ছিল ৯৬ পয়সা এবং নিট মুনাফা প্রায় ১৩ কোটি টাকা। অর্থাৎ একমি পেস্টিসাইডস মুনাফায় থাকলেও বিনিয়োগকারীদের ঠকানোর জন্য নামমাত্র লভ্যাংশ ঘোষণা করে, যা সাধারণ বিনিয়োগকারীদের সঙ্গে লভ্যাংশের নামে তামাশা। একইভাবে আইপিও’র মাধ্যমে উত্তোলিত টাকা থেকে ন্যাশনাল ফাইন্যান্সের ঋণ পরিশোধের কথা থাকলেও কোম্পানিটি ঋণ পরিশোধ করেনি। ফলে খেলাপি হয়ে পড়েছিল। আর খেলাপি ঋণ আদায়ে অর্থঋণ আদালতে মামলা করে ন্যাশনাল ফাইন্যান্স লিমিটেড।
সর্বশেষ অনিরীক্ষিত আর্থিক প্রতিবেদন অনুসারে, সমাপ্ত ২০২২-২৩ হিসাববছর শেষে একমি পেস্টিসাইডসের শেয়ারপ্রতি আয় (ইপিএস) হয়েছে ৯৬ পয়সা এবং আগের হিসাববছরের একই সময়ে যা ছিল ১ টাকা ৫১ পয়সা। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে শেয়ারপ্রতি আয় কমেছে ৫৬ পয়সা। গত ৩১ জুলাই শেষে কোম্পানিটির শেয়ারপ্রতি নিট সম্পদমূল্য (এনএভিপিএস) দাঁড়িয়েছে ১৮ টাকা ৩৫ পয়সায়। অথচ পুঁজিবাজারের তালিকাভুক্ত হওয়ার আগে ২০২০ সালের ৩০ জুন প্রতিষ্ঠানটির নিট মুনাফা ছিল ১৯ কোটি ৪৭ লাখ টাকা। একই সময়ে শেয়ারপ্রতি আয় ছিল দুই টাকা। অর্থাৎ তালিকাভুক্ত হওয়ার পর থেকে কোম্পানির মুনাফা কমছে।
সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, গত বৃহস্পতিবার ময়মনসিংহের কারখানায় দেখা যায় একমি পেস্টিসাইডসের ফুলপুরের দয়ারামপুরের ঠিকানায় প্রবেশমুখে সারিব ট্রেড সংস্থা (এসটিএস) প্রাইভেট লিমিটেডের সাইনবোর্ড। এ জমির সিনহা গ্রীনারি নামের একটি প্রতিষ্ঠানের পর একমি পেস্টিসাইডসের জমি, কিন্তু কোনো পরিচিত ফলক নেই। আর জমিতে নতুন চারতলা ভবন নির্মাণের কথা থাকলেও তাও দৃশ্যমান নয়। এছাড়া গরুর খামার ও মাছের চাষের পুকুর আছে। তবে সীমিত পরিসারে পেস্টিসাইড তৈরি কাজ হয় বলে স্থানীয় লোকজন ও প্রতিষ্ঠানটির দারোয়ানরা জানান। এ বিষয়ে কারখানার ব্যবস্থাপক নুর উদ্দিন মাহমুদের সঙ্গে সার্বিক বিষয় নিয়ে কথা বলতে চাইলে তিনি হেড অফিসের অনুমতি নেই বলে চলে যান।
একমি পেস্টিসাইডসের একাধিক বিনিয়োগকারী এ প্রতিবেদককে বলেন, একমি পেস্টিসাইডসের ২০২২-২৩ অর্থবছরে শেয়ারপ্রতি ৯৬ পয়সা হিসাবে ১২ কোটি ৯৬ লাখ টাকার নিট মুনাফা
হয়েছে। এর বিপরীতে কোম্পানিটির পর্ষদ ১ পয়সা বা শূন্য দশমিক ১০ শতাংশ হিসাবে ১৩ লাখ ৫০ হাজার টাকার ডিভিডেন্ড ঘোষণা করেছে, যা মুনাফার ১ দশমিক ০৪ শতাংশ। বাকি ১২ কোটি ৮২ লাখ ৫০ হাজার টাকা বা ৯৮ দশমিক ৯৬ শতাংশ রিটেইন আর্নিংসে রাখা হবে। মুনাফার ৭০ শতাংশের বেশি রেখে দেওয়ার সিদ্ধান্তের ফলে ১২ কোটি ৮২ লাখ ৫০ হাজার টাকার ওপরে ১০ শতাংশ হারে অতিরিক্ত এক কোটি ২৮ লাখ ২৫ হাজার টাকার অতিরিক্ত কর দিতে হবে একমি পেস্টিসাইডসকে, যা কোম্পানিটির শূন্য দশমিক ৯৫ শতাংশ ডিভিডেন্ডের সমান। এ হিসাব থেকে স্পষ্ট, কোম্পানিটি জরিমানা দেবে, তবু শেয়ারহোল্ডারদের দেবে না। এছাড়া আইপিও ফান্ডের পুরো টাকার ব্যবহার করতে পারেনি। তদন্ত করলে দেখবেন আইপিও টাকা ভুয়া হিসাবের মাধ্যমে টাকা তুলে নেয়া হয়েছে, অথবা নিজের অন্য প্রতিষ্ঠানে টাকা বিনিয়োগ করে নিজেই সুবিধা ভোগ করছে। এ ধরনের কোম্পানিকে কীভাবে বাজারে আসার অনুমোদন দেয়া হয়? এখন বোর্ড ভেঙে দিয়ে বিনিয়োগকারীদের মধ্য থেকে নতুন বোর্ড গঠন করা হোক, কারণ আসার পর তো লভ্যাংশ নামমাত্র দিচ্ছে। অথচ কোম্পানি ভালো।
এ বিষয়ে জানার জন্য একমি পেস্টিসাইডসের এমডি রেজাউর রহমান সিনহার ব্যবহƒত মুঠোফোন নাম্বারে একাধিকবার যোগাযোগ করা হলে তিনি ফোন রিসিভ করেননি। ফলে এ বিষয়ে উনার মন্তব্য পাওয়া যায়নি। পরে প্রতিষ্ঠানটির প্রধান অর্থ কর্মকর্তা সেলিম রেজার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে সুনির্দিষ্ট বক্তব্য না দিয়ে তিনি বলেন, সমস্যা তো অনেক আছে। নানা অজুহাতে ব্যস্ততা দেখিয়ে প্রশ্নের উত্তর এড়িয়ে দিয়ে শ্যামলী অফিসে চায়ের দাওয়াত দেন।
এ বিষয়ে জানার জন্য বিএসইসি অতিরিক্ত পরিচালক (সুপারভিশন অ্যান্ড রেগুলেশন্স অব ইস্যুয়ার কোম্পানিজ) নজরুল ইসলাম শেয়ার বিজকে বলেন, একমি পেস্টিসাইডসের ঘোষিত লভ্যাংশ নামমাত্র লভ্যাংশ। বিষয়টি আমাদের নজরে এসেছে। এছাড়া কোম্পানিটির আরও বেশকিছু বিষয় নিয়ে আমরা কাজ করছি। এসব বিষয় নিয়ে কথা বলার জন্য আমরা তাদের ডাকব।
উল্লেখ্য, ২০২১ সালে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত একমি পেস্টিসাইডসের অনুমোদিত মূলধন ১৫০ কোটি ও পরিশোধিত মূলধন ১৩৫ কোটি টাকা। বি ক্যাটেগরি কোম্পানির উদ্যোক্তা পরিচালকদের ৩১ শতাংশ ৮০ শতাংশ, প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগাকারীদের ১৯ দশমিক ২৫ শতাংশ এবং সাধারণ বিনিয়োগকারীদের হাতে ৪৮ দশমিক ৯৫ শতাংশ শেয়ার মালিকানা রয়েছে। গতকাল কোম্পানিটির সমাপনী দর ছিল ২২ টাকা ৮০ পয়সা।
এন এস


