ধ্বংসের পথে পদ্মা লাইফ: ঘাটতি ৩২৭ কোটি টাকা
ভয়াবহ আর্থিক সংকটে ধ্বংসের পথে পদ্মা ইসলামী লাইফ ইন্স্যুরেন্স কোম্পানী। দেশের পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত এই প্রতিষ্ঠানটির জীবন বিমা তহবিলের ঘাটতির পরিমাণ বেড়েই চলছে। চলতি বছরের ৩০ জুন শেষে পদ্মার তহবিলে ঘাটতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৩২৭ কোটি ২০ লাখ টাকা। রবিবার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই) সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে।
অনিয়ম, দূর্নীতি, বেপরোয়া লুটপাট, আয়ের তুলনায় ব্যয় বেশি হওয়া এবং দীর্ঘদিন ধরে আর্থিক ব্যবস্থাপনায় দুর্বলতার কারণে এই ঋণাত্মক পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। এস আলম গ্রুপ ২০১৮ সালে কোম্পানির দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে পদ্মার আর্থিক অবস্থা আরও অবনতির দিকে যায়। কোম্পানিটির জীবন বিমা তহবিল ঋণাত্মক হয়ে পড়ায় গ্রাহকদের বিমা দাবি পরিশোধের সক্ষমতা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। শত শত কোটি টাকার বিমা দাবি আটকে ভয়াবহ ধ্বংস হচ্ছে কোম্পানীটি। ফলে গ্রাহকদের পাওনা পরিশোধের পাশাপাশি কোম্পানির আর্থিক সক্ষমতা পুনরুদ্ধার করাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। তবে এ অবস্থা থেকে উত্তরণে সম্পদ বিক্রি করে গ্রাহকদের দাবি পরিশোধের চেষ্টা করছে বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ (আইডিআরএ)।
চলতি বছরের এপ্রিল-জুন প্রান্তিকে জীবন রাজস্ব হিসাবে মোট আয় থেকে দাবি ও অন্যান্য ব্যয়সহ মোট ব্যয় বাদ দেওয়ার পর ঘাটতি হয়েছে ৩ কোটি ৫৭ লাখ টাকা। যদিও ২০২৫ সালের একই সময়ে এ ঘাটতি ছিল ৬ কোটি ৫৩ লাখ টাকা। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে প্রান্তিকভিত্তিক ঘাটতি কিছুটা কমেছে।
এদিকে ২০২৬ সালের জানুয়ারি-জুন সময়ে কোম্পানিটির জীবন রাজস্ব হিসাবে ঘাটতি হয়েছে ৮ কোটি ৫১ লাখ টাকা। আগের বছরের একই সময়ে এ ঘাটতির পরিমাণ ছিল ১৫ কোটি ৯ লাখ টাকা। অর্থাৎ চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে জীবন রাজস্ব হিসাবের ঘাটতি কমলেও কোম্পানিটির জীবন বিমা তহবিলের নেতিবাচক স্থিতি বেড়েছে।
কোম্পানির তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ৩০ জুন শেষে জীবন বিমা তহবিলের ঘাটতি ছিল ৩০৭ কোটি ৭১ লাখ টাকা। এক বছরের ব্যবধানে তা বেড়ে ২০২৬ সালের ৩০ জুনে দাঁড়িয়েছে ৩২৭ কোটি ২০ লাখ টাকা। অর্থাৎ এক বছরে তহবিলের ঘাটতি বেড়েছে প্রায় ১৯ কোটি ৪৯ লাখ টাকা।
কোম্পানিটির আর্থিক পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগের বিষয়টি উঠে এসেছে ২০২৫ সালের আর্থিক হিসাব নিরীক্ষাতেও। নিরীক্ষা প্রতিষ্ঠানটি কোম্পানির ভবিষ্যৎ কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়ার সক্ষমতা নিয়ে শঙ্কা প্রকাশ করেছে।
ফলে জীবন বিমা তহবিলের ঘাটতি কমানো, গ্রাহকদের দাবি পরিশোধ এবং আর্থিক ভিত্তি শক্তিশালী করা- এই তিনটি বিষয়ই এখন পদ্মা ইসলামী লাইফ ইন্স্যুরেন্সের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ।
পদ্মা ইসলামী লাইফ ইন্স্যুরেন্সের আর্থিক সংকট দীর্ঘদিনের। প্রিমিয়াম আয় ও অন্যান্য আয়ের তুলনায় ব্যয়ের চাপ বেশি থাকায় প্রতিষ্ঠানটি আর্থিকভাবে চাপে রয়েছে। এর প্রভাব পড়েছে শেয়ারহোল্ডারদের ওপরও। ২০২১ সালের পর থেকে কোম্পানিটি শেয়ারহোল্ডারদের কোনো লভ্যাংশ দিতে পারেনি। এতে করে একদিকে ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছেন গ্রাহক, অন্যদিকে লভ্যাংশ থেকে বঞ্চিত বিনিয়োগকারীরা।
২০১২ সালে শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত হওয়া পদ্মা ইসলামী লাইফ ইন্স্যুরেন্সের পরিশোধিত মূলধন ২৭২ কোটি ৯২ লাখ টাকা। এর মধ্যে উদ্যোক্তা ও পরিচালকদের বাদ দিয়ে অন্যান্য শ্রেণির বিনিয়োগকারীদের মালিকানা রয়েছে ৬৮ দশমিক ৪৪ শতাংশ।
এ দিকে এস আলম গ্রুপের মালিকানাধীন পদ্মা ইসলামী লাইফ ইন্স্যুরেন্স কোম্পানির গ্রাহকদের জমাকৃত অর্থ ফেরতের দাবিতে দেশের বিভিন্ন জেলায় মানববন্ধন ও আন্দোলন করছেন ভুক্তভোগী গ্রাহকরা।
বীমা দাবি পরিশোধে ব্যর্থ হওয়া কোম্পানিগুলোর ব্যাপারে আইডিআরএ কী ধরনের ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে—জানতে চাইলে আইডিআরএর এক সদস্য বলেন, বীমা গ্রাহকদের টাকা পরিশোধে একাধিক কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হচ্ছে। প্রথম বর্ষের ব্যবসা বন্ধ করা হতে পারে। এছাড়া সম্পদ বিক্রি করে হলেও গ্রাহকদের টাকা পরিশোধ করতে হবে।



