এক মাসেই ৩৫% কমল ইলন মাস্কের স্পেসএক্সের শেয়ারের দাম

শেয়ারবাজারে ইলন মাস্কের কোম্পানি স্পেসএক্সের যাত্রাটা ছিল উৎসবমুখর। তখন কোম্পানিটির শেয়ার কিনতে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে রীতিমতো হুড়োহুড়ি পড়ে যায়। কিন্তু সেই উচ্ছ্বাস এক মাসও টেকেনি। প্রথম মাস পার হতে না হতেই অনেক বিনিয়োগকারীর মুখে হাসির বদলে দেখা দেয় দুশ্চিন্তা। কারণ, শেয়ারের দাম প্রায় ৩৫ শতাংশ পড়ে গেছে।

গত ১২ জুন সাধারণ বিনিয়োগকারীদের জন্য স্পেসএক্সের শেয়ার উন্মুক্ত করা হয়। প্রতিটি শেয়ারের মূল্য নির্ধারণ করা হয় ১৩৫ মার্কিন ডলার। লেনদেন শুরু হতেই দাম বেড়ে ১৫০ ডলারে ওঠে। দিনের এক পর্যায়ে তা ১৭৬ ডলার স্পর্শ করে। পরে কিছুটা কমে ১৬০ দশমিক ৯৫ ডলারে প্রথম দিনের লেনদেন শেষ হয়।

এই আইপিওর মাধ্যমে ইতিহাসের সবচেয়ে বড় প্রাথমিক শেয়ার বিক্রির (আইপিও) রেকর্ড গড়ে স্পেসএক্স। একই সঙ্গে ইলন মাস্কের ব্যক্তিগত সম্পদমূল্য এক ট্রিলিয়ন বা এক লাখ কোটি ডলারে পৌঁছে যায়।

শুধু প্রথম দিনেই নয়, পরের সপ্তাহেও শেয়ারের ঊর্ধ্বগতি অব্যাহত ছিল। একপর্যায়ে দাম উঠে যায় ২২৫ ডলারে। ফলে বাজারমূল্যের দিক থেকে অ্যামাজন ও মাইক্রোসফটকেও ছাড়িয়ে যায় স্পেসএক্স।

তবে প্রথম মাসের লেনদেন শেষে কোম্পানিটির শেয়ারদর নেমে আসে প্রায় ১৪৫ ডলারে। এটি প্রথম দিনের সর্বোচ্চ দামের তুলনায় প্রায় ১৮ শতাংশ কম। আর এখন পর্যন্ত সর্বোচ্চ দামের তুলনায় প্রায় ৩৫ শতাংশ কম।

বিনিয়োগ গবেষণাপ্রতিষ্ঠান সিএফআরএর বিশ্লেষক কিথ স্নাইডারের ভাষায়, ইলন মাস্কের নাম জড়িয়ে থাকলে মানুষ এমনিতেই উত্তেজিত হয়ে পড়ে। এবার আরও একটি বিষয় সেই উত্তেজনা বাড়িয়ে দেয়। সেটি হলো অনেক বিনিয়োগকারীর কাছে এটি ছিল এআই খাতের সম্ভাবনাময় একটি কোম্পানিতে বিনিয়োগের প্রথম সুযোগ।

একই কথা বলেন বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে বিনিয়োগের সুযোগ করে দেওয়া প্ল্যাটফর্ম নিওস্টেলারের বিনিয়োগকারী উইলি লিও। তাঁর মতে, অনেকেই স্পেসএক্সকে মূলত একটি ‘এআই কোম্পানি’ হিসেবেই দেখেছেন।

এর পেছনে কারণও ছিল। চলতি বছরের শুরুতে স্পেসএক্স ইলন মাস্কেরই এআই স্টার্টআপ এক্সএআই অধিগ্রহণ করে। পরে এর নাম বদলে রাখা হয় স্পেসএক্সএআই।

বিনিয়োগকারীদের ভুল ভাঙে

ধীরে ধীরে বিনিয়োগকারীরা বুঝতে পারেন, নানা উদ্যোগ থাকলেও কোম্পানির আয়ের প্রধান ভিত্তি এখনো রকেট তৈরি, উৎক্ষেপণ এবং স্টারলিংক স্যাটেলাইট নেটওয়ার্ক। এই বাস্তবতা সামনে আসতেই শেয়ারবাজারের মনোভাব বদলাতে শুরু করে।

এর বড় উদাহরণ দেখা যায় যুক্তরাষ্ট্রের টেনেসি অঙ্গরাজ্যের মেম্ফিসে। সেখানে একটি বিশাল ডেটা সেন্টার প্রকল্প নিয়ে স্থানীয়দের উদ্বেগের মধ্যে স্টারলিংক মূল্য কমানোর ঘোষণা দেয়। সেদিনই স্পেসএক্সের শেয়ারের দাম প্রায় ৮ শতাংশ পড়ে যায়।

এর পর থেকে কোম্পানিটির শেয়ারদর ধারাবাহিকভাবে কমতে থাকে। প্রযুক্তি খাতের অন্য কোম্পানিগুলোর শেয়ারও তখন অবশ্য চাপে ছিল। তবে স্পেসএক্সের পতনের হার ছিল তুলনামূলক বেশি।

৭ জুলাই নাসড্যাক–১০০ সূচকে অন্তর্ভুক্ত হয় স্পেসএক্স। সেদিন সূচকটি ১ দশমিক ৭ শতাংশ কমলেও স্পেসএক্সের শেয়ারদর পড়ে ৪ দশমিক ৪ শতাংশ। যদিও এর আগে এফটিএসই রাসেল সূচকে যুক্ত হওয়ার সময় শেয়ারদর কিছুটা বেড়েছিল। এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করেনি স্পেসএক্স।

সবচেয়ে বেশি ধাক্কা খেয়েছেন খুচরা বিনিয়োগকারীরা। বিশেষ করে যাঁরা লেনদেন শুরুর প্রথম কয়েক দিনেই শেয়ার কিনেছিলেন।

কিথ স্নাইডারের ভাষায়, ‘আপনি যদি প্রথম দিকেই শেয়ার কিনে থাকেন, তাহলে এখন নিশ্চিতভাবেই লোকসানে আছেন।’ তাঁর মতে, একপর্যায়ে স্পেসএক্সের শেয়ার অনেকটা ‘মিমে স্টকে’ পরিণত হয়েছিল। অর্থাৎ প্রকৃত ব্যবসার চেয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের উচ্ছ্বাসের কারণেই শেয়ারের দাম বেশি বেড়েছিল। গেমস্টপ কিংবা সম্প্রতি ওয়েন্ডিজের ক্ষেত্রেও এমনটি দেখা গেছে।

স্নাইডারের ধারণা, বর্তমান ব্যবসায়িক পরিস্থিতিতে স্পেসএক্সের শেয়ারের দাম আরও কমে ১১৫ ডলারের কাছাকাছি নেমে যেতে পারে। সে ক্ষেত্রে কোম্পানিটির বাজারমূল্য দাঁড়াবে প্রায় ১ দশমিক ৫ ট্রিলিয়ন বা ১ লাখ ৫০ হাজার কোটি ডলার।

তবে সব বিনিয়োগকারীর অবস্থা এক নয়। মার্জারমার্কেটের ইকুইটি ক্যাপিটাল মার্কেটস বিভাগের প্রধান স্যামুয়েল কের বলেন, যাঁরা আইপিওতে ১৩৫ ডলারে শেয়ার পেয়েছেন কিংবা তালিকাভুক্তির আগেই কোম্পানিটির শেয়ারধারী ছিলেন তাঁরা এখনো লাভে আছেন। কিন্তু প্রথম কয়েক দিনের উত্তেজনায় বাজার থেকে শেয়ার কিনেছেন যাঁরা, তাঁদের পরিস্থিতি মোটেও সুখকর নয়।

মাস্কের আত্মবিশ্বাস অটুট

বাজারে শেয়ারের দাম কমলেও ইলন মাস্কের আত্মবিশ্বাসে ভাটা পড়েনি। শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্তির পর বিশ্বের প্রথম ট্রিলিয়নিয়ার হওয়ার পর তিনি ঘোষণা দেন, আগামী ২০৩০ সালের মধ্যে স্পেসএক্সের বার্ষিক আয় ১ ট্রিলিয়ন বা ১ লাখ কোটি ডলারে পৌঁছাবে।

মাস্ক যে কোম্পানির শেয়ারকে একধরনের ‘মুদ্রা’ হিসেবেও ব্যবহার করতে প্রস্তুত, সেটিও জুনের মাঝামাঝি স্পষ্ট হয়। ১৬ জুন স্পেসএক্সের শেয়ারের দাম যখন ঊর্ধ্বমুখী, তখন কোম্পানিটি জানায়, ৬০ বিলিয়ন ডলারের সম্পূর্ণ শেয়ারভিত্তিক চুক্তিতে এআই কোডিং স্টার্টআপ কার্সরকে অধিগ্রহণ করা হচ্ছে।

বিশ্লেষকদের মতে, তখন শেয়ারের মূল্য এতটাই বেড়ে গিয়েছিল যে কার্যত অতিরিক্ত নগদ অর্থ খরচ না করেই মাস্ক এই অধিগ্রহণ সম্পন্ন করেন।

 

স্যামুয়েল কেরের ভাষায়, এমন কৌশল খুব কম কোম্পানিরই আছে। এখন সবার নজর কোম্পানিটির প্রথম আর্থিক প্রতিবেদনের দিকে। বিশ্লেষকদের ধারণা, আগস্টের শুরুতে সেটি প্রকাশিত হতে পারে।

তখনই কর্মীদের জন্য নির্ধারিত ‘লক-আপ’ সময় শেষ হবে। অর্থাৎ এত দিন পারিশ্রমিক হিসেবে পাওয়া যেসব শেয়ার তাঁরা বিক্রি করতে পারেননি, সেগুলো বাজারে ছাড়তে পারবেন।

ফলে একদিকে বাজারে নতুন শেয়ার আসবে, অন্যদিকে কোম্পানির আয় ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা সম্পর্কে আরও পরিষ্কার তথ্য পাওয়া যাবে। এর ফলে স্পেসএক্সের শেয়ারে আবারও বড় ধরনের ওঠানামা দেখা যেতে পারে।

স্যামুয়েল কের বলেন, সব পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে স্পেসএক্স ইতিহাসের সবচেয়ে দামি কোম্পানি হতে পারে। তবে সেই লক্ষ্য অর্জনের আগে কোম্পানিটিকে দীর্ঘ ও কঠিন পথ পাড়ি দিতে হবে।

সম্পর্কিত খবর