অভিজ্ঞতা ছাড়াই সিইও, পদ্মা লাইফে বাড়ছে ক্ষোভ!
জিনান মাহমুদ :
বীমা খাতে পূর্বের কোনো অভিজ্ঞতা ছাড়াই পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত পদ্মা লাইফ ইন্স্যুরেন্সের ভারপ্রাপ্ত মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তা বা সিইও হিসেবে মো.মোস্তাফিদুজ্জামানকে নিয়োগ দিয়েছে পরিচালনা পর্ষদ। যা নিয়ে প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরে বিরাজ করছে চরম ক্ষোভ আর অসন্তোষ। অবিলম্বে তার নিয়োগ বাতিলের দাবী জানান ক্ষুব্ধ একাধিক কর্মকর্তা।
পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত ও দীর্ঘবছরের পুরনো এই জীবন বীমা প্রতিষ্ঠানে এমন অনভিজ্ঞ নতুন ব্যক্তিকে কোম্পানীর সবচেয়ে শীর্ষ গুরুত্বপূর্ণ পদ ভারপ্রাপ্ত মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তা বা সিইও হিসেবে নিয়োগ দেওয়ায় বিস্ময় প্রকাশ করেছেন পদ্মা লাইফের দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা।
পদ্মা ইসলামী লাইফ ইন্স্যুরেন্স লিমিটেডের একাধিক সূত্রে জানা গেছে, মো. মোস্তাফিদুজ্জামানের নিয়োগ পর কোম্পানির একাধিক দক্ষ কর্মকর্তাকে চাকরি ছাড়তে বাধ্য করা হয়েছে।
আইন লঙ্ঘন, দীর্ঘদিনের অনিয়ম, দুর্নীতি, লুটপাট ও অব্যবস্থাপনায় ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে পদ্মা ইসলামী লাইফ ইন্স্যুরেন্স লিমিটেড। গ্রাহকের বীমা দাবি পরিশোধে ব্যর্থ পদ্মা এখন অবসায়নের ঝুঁকিতে রয়েছে। পদ্মা লাইফ বর্তমানে আর্থিক সংকট ও নানা অনিয়মের অভিযোগে জর্জরিত। এরমধ্যেই এমন বিতর্কিত নিয়োগে বিস্ময় প্রকাশ করছে খাত সংশ্লিষ্টরা।
তাদের মতে, দক্ষ ও অভিজ্ঞ নেতৃত্বের পরিবর্তে অদক্ষ ব্যক্তিকে দায়িত্ব দেওয়ার অর্থ হলো সুশাসন প্রতিষ্ঠার বদলে আগের অনিয়ম, দুর্বলতা ও লুটপাটের সংস্কৃতি টিকিয়ে রাখার ঝুঁকি আরও বাড়িয়ে দেওয়া। মো. মোস্তাফিদুজ্জামানের নিয়োগ নিয়ে বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের (আইডিআরএ) কাছে চিঠি দিয়েছে পদ্মা লাইফ। চলতি বছরের ২১ মে থেকে তিনি সিইও পদে দায়িত্বরত আছেন। অথচ দুইমাসে পেরিয়ে গেলেও তার বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেয়নি আইডিআরএ। এর আগে গত বছরের নভেম্বরে মোস্তাফিদুজ্জামানকে এডিশনাল এমডি হিসেবে নিয়োগ দেয় পদ্মা লাইফ। তার নিয়োগের পর কোম্পানীর সিইও মোহাম্মদ আবু মূসা সিদ্দিকীকে বিধিবহির্ভূতভাবে চাকরি থেকে অব্যাহতি দেয় পদ্মা লাইফ। এছাড়াও মূসা সিদ্দিকীর ভাই কোম্পানীর এডিশনাল এমডি মোর্শেদ আলম সিদ্দিকীকেও সরিয়ে দেওয়া হয়।
বীমা আইন ও সংশ্লিষ্ট প্রবিধান অনুসরণ না করে মূসার বিষয় সিদ্ধান্ত নেওয়ায় পদ্মার চেয়ারম্যান ও পরিচালনা পর্ষদের কাছে ব্যাখ্যা চায় বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ (আইডিআরএ)। আইডিআরএর পরিচালক (লাইফ) ও উপসচিব দেবপ্রসাদ পাল স্বাক্ষরিত এক চিঠিতে গত ২২ জুন এ নির্দেশনা দেওয়া হয়।
এ বিষয় মোহাম্মদ আবু মূসা সিদ্দিকীর সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে, হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন বলে জানান।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক কর্মকর্তা অর্থবাংলাকে বলেন, গ্রাহকের বীমা দাবি পরিশোধ করতে পদ্মা লাইফ তাদের সম্পত্তি বিক্রি করার উদ্যোগ নিয়েছে। যদিও কেউ কিনতে তেমন আগ্রহ দেখাচ্ছে না। তারা আরও বলেছেন, কোম্পানিটির সব কার্যক্রম অদৃশ্যভাবে নিয়ন্ত্রণ করছে দেশের একটি শীর্ষ বিতর্কিত প্রভাবশালী শিল্প গ্রুপ।
তথ্যমতে, চট্রগ্রামের সন্তান মো. মোস্তাফিদুজ্জামান দেশের শীর্ষ একটি বির্তকিত শিল্প গ্রুপের খুব কাছের মানুষ। এমনকি বীমা খাতের কোনো কোম্পানিতে তিনি কখনো কাজ করেননি। এ পরিস্থিতিতে খাতে অভিজ্ঞতা না থাকা কাউকে গুরুত্বপূর্ণ পদে নিয়োগ দেওয়ার যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
এ বিষয়ে আইডিআরএর মুখপাত্র সাইফুন্নাহার সুমি বলেন, ভারপ্রাপ্ত সিইও নিয়োগের জন্য কোম্পানিটি এরই মধ্যে বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের (আইডিআরএ) কাছে আবেদন জমা দিয়েছে। এখন আবেদনটি যাচাই-বাছাই করে প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত নেবে আইডিআরএ।
পদ্মা লাইফ ইন্স্যুরেন্সে যোগদানের আগে মো. মোস্তাফিদুজ্জামান ২০২৩ সালের সেপ্টেম্বর থেকে অ্যাভিভা ফাইন্যান্স লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (চলতি দায়িত্ব) হিসেবে কর্মরত ছিলেন। কিছুদিন আগেই প্রতিষ্ঠানটি বন্ধ বা অবসায়নের সিদ্ধান্ত নিয়েছিল বাংলাদেশ ব্যাংক। অ্যাভিভা ফাইন্যান্সের মালিকও ছিল এস আলম গ্রুপ।
আরও জানা যায়, মোস্তাফিদুজ্জামানের নিয়োগের পর পদ্মা লাইফ থেকে মো. মোরশেদ আলম সিদ্দিকীকে জোর করে পদত্যাগ করতে বাধ্য করেছে কোম্পানির পরিচালনা পর্ষদ। এ বিষয়ে জানতে চাইলে মোরশেদ আলম সিদ্দিকী অর্থবাংলাকে বলেন, হ্যাঁ আমি পদত্যাগ জমা দিয়েছি। আর পদ্মা লাইফে থাকছি না। এ সময় মোস্তাফিদুজ্জামানের নিয়োগ প্রক্রিয়ার বৈধতা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন মোর্শেদ আলম সিদ্দিকী। বলেন, এভাবে অনভিজ্ঞ ব্যক্তিকে গুরুত্বর্পূণ পদে নিয়োগ দিয়ে পদ্মা লাইফকে আরও দ্রুত বিপদের মুখে দাঁড় করানো হচ্ছে। বিশেষ উদ্দেশ্য নিয়েই তাকে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। বড় বীমা প্রতিষ্ঠানে এভাবে অনভিজ্ঞ ব্যক্তির নিয়োগ নজীর বিহীন।
বীমা খাতে দায়িত্ব পালনের পূর্ব অভিজ্ঞতা নেই—এমনটি স্বীকার করে পদ্মা লাইফ ইন্স্যুরেন্সের ভারপ্রাপ্ত দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. মোস্তাফিদুজ্জামান অর্থবাংলাকে বলেন, সম্প্রতি পরিচালনা পর্ষদ তাকে এ পদে নিয়োগ দিয়েছে।
তিনি বলেন, পদ্মা লাইফে যোগদানের পর থেকেই গ্রাহকদের বীমা দাবি পরিশোধে জটিলতা এবং একের পর এক মামলার মুখোমুখি হতে হচ্ছে।
তবে বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ (আইডিআরএ) যদি তার নিয়োগ অনুমোদন না দেয়, তাহলে তিনি দায়িত্ব থেকে সরে দাঁড়াবেন।
অভিজ্ঞতা ছাড়া এমন গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পালন নৈতিক কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে মোস্তাফিদুজ্জামান বলেন, তিনি দীর্ঘদিন আর্থিক খাতের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে কাজ করেছেন। বীমা খাত তার জন্য নতুন হলেও তিনি দায়িত্ব পালনের চেষ্টা করছেন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, জীবন বীমা মূলত মানুষের অনিশ্চিত ভবিষ্যতের জন্য আর্থিক নিরাপত্তার একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। কিন্তু অনেক ক্ষেত্রে সেই প্রত্যাশা পূরণ না হয়ে গ্রাহকরা ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন। সেক্ষেত্রে ব্যবস্থাপনায় গুরুতর অনিয়ম ও অপব্যবহারের এই নিয়োগ অভিযোগ পদ্মা লাইফেকে আরও বিপদে ফেলবে। তাই গ্রাহকের স্বার্থ রক্ষা, তহবিলের স্বচ্ছ ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা এবং নিয়োগ প্রক্রিয়াকে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির আওতায় আনা এখন সময়ের অন্যতম দাবি।



