হত্যা মামলার আসামি নিয়ে আইডিআরএ কর্মকর্তার সিন্ডিকেট!
জিনান মাহমুদ:
বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের (আইডিআরএ) উপ-পরিচালক দেলোয়ার হোসেন ভূঁইয়ার বিরুদ্ধে হত্যা মামলার আসামিকে নিয়ে প্রাতিষ্ঠানিক সিন্ডিকেট গড়ে তোলার চাঞ্চল্যকর অভিযোগ উঠেছে। ক্ষমতার চরম অপব্যবহার, কোটি কোটি টাকার টেন্ডার জালিয়াতি ও স্বজনপ্রীতির মতো তথ্য সামনে এলেও অদৃশ্য কারণে দেলোয়ারের বিরুদ্ধে কোনো প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেয়নি নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ।
গত ১ মে আইডিআরএর চেয়ারম্যান বরাবর লিখিত অভিযোগে এসব চাঞ্চল্যকর তথ্য তুলে ধরেন খোরশেদ আলম সীমান্ত নামের এক ব্যক্তি। অভিযোগের অনুলিপি অর্থ মন্ত্রণালয় ও দুর্নীতি দমন কমিশনেও (দুদক) পাঠানো হয়েছে।
অভিযোগপত্রে বলা হয়, উপ-পরিচালক দেলোয়ার হোসেন ভূঁইয়া সরকারি ক্রয়বিধি (পিপিআর) সম্পূর্ণ লঙ্ঘন করে কোনো ধরনের দরপত্র (টেন্ডার) আহ্বান ছাড়াই আইডিআরএ কার্যালয়ের জন্য প্রায় ৪ কোটি টাকার আসবাবপত্র ক্রয়ের কাজ দেন। এই কাজ পান তার আপন শ্যালক নাসের নেওয়াজ। প্রকাশ্য এই জালিয়াতিকে সরাসরি রাষ্ট্রীয় অর্থ আত্মসাৎ হিসেবে চিঠিতে উল্লেখ করা হয়েছে।
এছাড়াও সীমান্ত অভিযোগ করেন, বীমা খাতের সবচেয়ে সংবেদনশীল জায়গা—ক্ষতিপূরণ ও দাবি নিষ্পত্তির প্রক্রিয়াকে প্রভাবিত করে অর্থ হাতিয়ে নিতে দেলোয়ার ‘ভিশন ইনস্পেকশন লিমিটেড’ (ভিশন সার্ভে) নামের একটি প্রতিষ্ঠানকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করছেন। অনুসন্ধানে জানা যায়, প্রতিষ্ঠানটিতে দেলোয়ারের সরাসরি পারিবারিক মালিকানা রয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, বিভিন্ন বীমা কোম্পানিকে স্বাধীনভাবে কাজ করতে না দিয়ে এই প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে সার্ভে করাতে তিনি অঘোষিত প্রশাসনিক চাপ প্রয়োগ করেন।
এই সিন্ডিকেটকে পাহারা দিতে দেলোয়ার তার পারিবারিক প্রতিষ্ঠান ‘ভিশন সার্ভে’-এর পরিচালনা পর্ষদে যুক্ত করেছেন নাঙ্গলকোট উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি আবু ইউসুফকে। উল্লেখ্য, আবু ইউসুফ কুমিল্লা সদর দক্ষিণ থানায় দায়ের হওয়া একটি চাঞ্চল্যকর হত্যা মামলার আসামি। একজন দায়িত্বশীল সরকারি কর্মকর্তা কীভাবে হত্যা মামলার আসামিকে সাথে নিয়ে বাণিজ্যিক সিন্ডিকেট চালান—তা নিয়ে সুশীল সমাজ ও সংশ্লিষ্ট খাতে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে।
ক্ষমতার অপব্যবহারের পাশাপাশি দেলোয়ারের বিরুদ্ধে স্বজনপ্রীতির অভিযোগও পাওয়া গেছে। যোগ্যতা ও স্বাভাবিক নিয়োগ প্রক্রিয়ার তোয়াক্কা না করে, নামমাত্র শিক্ষাগত যোগ্যতাসম্পন্ন একাধিক নিকটাত্মীয়কে তিনি বিভিন্ন বীমা কোম্পানিতে উচ্চ বেতনের পদে বসিয়েছেন, যা পুরো বীমা খাতের পেশাদারিত্বকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, দেশের বীমা খাতে সাধারণ মানুষের আস্থা ফিরিয়ে আনতে অবিলম্বে একটি উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিটি গঠন করা উচিত। তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত অভিযুক্ত দেলোয়ার হোসেন ভূঁইয়াকে দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দেওয়া, ‘ভিশন সার্ভে’র ব্যাংক হিসাব ফরেনসিক অডিট করা এবং ৪ কোটি টাকার টেন্ডার জালিয়াতির নিরপেক্ষ বিচার নিশ্চিত করা জরুরি।
আইডিআরএ-র একাধিক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে অর্থবাংলাকে জানান, উপ-পরিচালক দেলোয়ার হোসেন ভূঁইয়ার এসব ক্রমাগত অনিয়ম ও অনৈতিক কর্মকাণ্ডে পুরো সংস্থাটিই মারাত্মক বিব্রতকর পরিস্থিতিতে পড়েছে। টেন্ডার জালিয়াতি থেকে শুরু করে ‘ভিশন সার্ভে’র লাইসেন্স বাগিয়ে নেওয়া এবং তাদের কাজ পাইয়ে দিতে তিনি দীর্ঘদিন ধরে প্রশাসনিক প্রভাব বিস্তার করে আসছেন। নিরপেক্ষ ও সুষ্ঠু তদন্ত পরিচালনা করা হলে কেবল ভিশন সার্ভেই নয়, আরও একাধিক সার্ভে প্রতিষ্ঠানের সাথে তার প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ সম্পৃক্ততার প্রমাণ উন্মোচিত হবে।
বাংলাদেশ ইন্স্যুরেন্স সার্ভেয়ার্স অ্যাসোসিয়েশনের নেতারা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “ভিশন সার্ভের ব্যবস্থাপনা পরিচালক দেলোয়ার হোসেনের শ্যালক নাসের নেওয়াজ। মূলত পদস্থ পদের প্রভাব ও তদবির কাজে লাগিয়ে দেলোয়ার স্বজনদের নামে লাইসেন্স বাগিয়ে নিয়ে বিভিন্ন বীমা কোম্পানিতে একচ্ছত্র প্রভাব বিস্তার করছেন। কেবল ভিশন সার্ভেই নয়, আরও অন্তত দুটি সার্ভে প্রতিষ্ঠানের সাথে তার প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ সম্পৃক্ততা রয়েছে। তার এই অনৈতিক প্রভাব বিস্তারের কারণে সাধারণ সার্ভে প্রতিষ্ঠানগুলো ব্যবসায়িকভাবে মারাত্মক ক্ষতির শিকার হচ্ছে। আইডিআরএর কর্মকর্তা হওয়ায় ভয়ে কেউ মুখ খুলছে না। “
অভিযোগকারী খোরশেদ আলম সীমান্ত অর্থবাংলাকে বলেন, “কোনো ধরনের দরপত্র (টেন্ডার) আহ্বান ছাড়াই আইডিআরএ কার্যালয়ের জন্য প্রায় ৪ কোটি টাকার আসবাবপত্র ক্রয়ের কাজ কিভাবে দেলোয়ার হোসেন ভূঁইয়ার শ্যালক নাসের নেওয়াজ পেয়েছেন- তা তদন্ত করা দরকার। রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান থেকে এভাবে টেন্ডারের কাজ বাগিয়ে নেওয়া নজিরবিহীন জালিয়াতি। আইডিআরএ ছাড়াও অর্থ মন্ত্রণালয়, দুদক ও সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন দপ্তরে তার বিরুদ্ধে বেশ কিছু অনিয়মের তথ্য নিয়ে অভিযোগে তুলে ধরেছি। তদন্ত করে আইডিআরএ, দুদক এবং রাষ্ট্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা যথাযথ আইনী ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।”
জানতে চাইলে সব অভিযোগ অস্বীকার করে আইডিআরএ-র উপ-পরিচালক দেলোয়ার হোসেন ভূঁইয়া অর্থবাংলাকে বলেন, “আমি সবসময় অনিয়ম ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছি। আমার কাজে ঈর্ষান্বিত হয়ে মূলত আইডিআরএ-র একটি দুর্নীতিবাজ চক্র আমার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র চালাচ্ছে। দীর্ঘ চাকরিজীবনে আমি কখনোই কোনো অনিয়মে জড়াইনি। তবে নিরপেক্ষ তদন্তে যদি কোনো অপরাধ প্রমাণিত হয়, যেকোনো শাস্তি মাথা পেতে নিতে প্রস্তুত আছি।”
আইডিআরএ-র দুর্নীতিগ্রস্ত কর্মকর্তাদের বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি বিষয়টি নিয়ে প্রতিষ্ঠানের জনসংযোগ কর্মকর্তার সাথে কথা বলার পরামর্শ দেন।
তবে ‘ভিশন সার্ভে এবং টেন্ডার’ বিষয়ে জানতে চাওয়া মাত্রই ‘আমেরিকা থেকে ফোন আসছে’ বলে কলটি কেটে দেন দেলোয়ার। পরবর্তীতে একাধিকবার চেষ্টা করা হলেও আর ফোন রিসিভ করেননি।
এ বিষয়ে আইডিআরএ-র পরামর্শক (জনসংযোগ) সাদিক আরমান অর্থবাংলাকে বলেন, “বীমা খাতে যেকোনো ধরনের অনিয়ম ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে আমরা জিরো টলারেন্স নীতি বজায় রাখছি। কোনো কর্মকর্তার বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণিত হলে আইন অনুযায়ী কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”



