ভারসাম্যহীনতার শঙ্কা রপ্তানি আয়ের পতনের কারণে
বৈশ্বিক বাণিজ্যে উত্তেজনা, দেশে বিদ্যমান রাজনৈতিক অস্থিরতা ও গ্যাস-বিদ্যুতের সংকটের কারণে রপ্তানি খাতে নেতিবাচক পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। এতে সার্বিকভাবে রপ্তানি কমে যাচ্ছে। টানা পাঁচ মাস ধরে রপ্তানি আয় নিম্নমুখী।
চলতি অর্থবছরের জুলাই-ডিসেম্বরের হিসাবে রপ্তানি গত অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় কমেছে। তবে রেমিট্যান্স প্রবাহ বেশি মাত্রায় বৃদ্ধি পাওয়ায় চাহিদার চেয়ে ডলারের জোগান বেশি রয়েছে। রপ্তানি আয় কমে যাওয়ায় বৈদেশিক মুদ্রার প্রবাহও কিছুটা হ্রাস পেয়েছে। এতে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার চলতি হিসাবে ঘাটতি দেখা দিয়েছে।
বেশি দিন এ ঘাটতি থাকলে বৈদেশিক মুদ্রা ব্যবস্থাপনায় ভারসাম্যহীনতা দেখা দিতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। এ কারণে রপ্তানি আয়ের বিষয়ে এখনই সতর্ক হওয়া প্রয়োজন বলে মনে করে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রতিবেদন থেকে পাওয়া তথ্যে দেখা যায়, রপ্তানিমুখী শিল্পের কাঁচামাল আমদানি করা হয় ব্যাক টু ব্যাক এলসির মাধ্যমে। চলতি অর্থবছরের শুরু থেকে এ খাতের এলসি খোলা কমে গেছে। আগের বছরের খোলা এলসির কাঁচামাল দেশে আসায় সেপ্টেম্বর পর্যন্ত রপ্তানি শিল্পের কাঁচামাল আমদানিতে প্রবৃদ্ধি ইতিবাচক ছিল। অক্টোবর থেকে তা নেতিবাচক ধারায় চলে গেছে। চলতি অর্থবছরের জুলাই-নভেম্বরে এলসি খোলা কমেছে ১২ দশমিক ৯০ শতাংশ। আমদানি কমেছে ৩ দশমিক ৮৭ শতাংশ।
এর আগের ২০২৪-২৫ অর্থবছরে রপ্তানি শিল্পের কাঁচামাল আমদানি বেড়েছিল ১৮ দশমিক ৬২ শতাংশ এবং এলসি খোলা বেড়েছিল ৭ দশমিক ২৪ শতাংশ।
আন্তর্জাতিক বাজারে রপ্তানির কাঁচামালের দাম কমেনি; বরং স্থিতিশীল রয়েছে। রপ্তানির আদেশ কম আসার কারণে উদ্যোক্তারা কাঁচামাল আমদানির এলসি খুলছেন কম। যে কারণে কাঁচামালের আমদানিও কমেছে। ফলে আগামী মাসগুলোতেও রপ্তানি আয় কমার আশঙ্কা করা হচ্ছে।
প্রতিবেদন থেকে দেখা যায়, গত অর্থবছরের জুলাইয়ের তুলনায় চলতি অর্থবছরের একই মাসে রপ্তানি আয় বেড়েছিল প্রায় ২৫ শতাংশ। এরপর আগস্ট থেকে গত ডিসেম্বর পর্যন্ত টানা পাঁচ মাস ধরে রপ্তানি আয় কমেছে।
গত অর্থবছরের জুলাই-ডিসেম্বরের তুলনায় চলতি অর্থবছরের একই সময়ে রপ্তানি আয় কমেছে ২ দশমিক ১৯ শতাংশ। গত আগস্টের তুলনায় চলতি বছরের আগস্টে রপ্তানি আয় কমেছে ৩ দশমিক ৭০ শতাংশ। গত সেপ্টেম্বরের তুলনায় চলতি বছরের সেপ্টেম্বরে কমেছে ৫ দশমিক ১০ শতাংশ, গত অক্টোবরের তুলনায় চলতি অক্টোবরে কমেছে ৭ দশমিক ৭০ শতাংশ। গত নভেম্বরের তুলনায় চলতি নভেম্বরে কমেছে ২ শতাংশ। গত বছরের ডিসেম্বরের তুলনায় চলতি ডিসেম্বরে কমেছে ১৪ দশমিক ২৫ শতাংশ। চলতি বছরের নভেম্বরের তুলনায় ডিসেম্বরে আয় বেড়েছে ১ দশমিক ৯৭ শতাংশ।
এদিকে রপ্তানি আয় বাড়াতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে নানা ধরনের নীতি সহায়তা দেওয়া হচ্ছে। বৈশ্বিক নেতিবাচক পরিস্থিতির কারণে বিদেশে যেসব রপ্তানি আয়ের ডলার আটকে রয়েছে সেগুলো দেশে আনার জন্য বিশেষ ছাড় দেওয়া হয়েছে। এর মধ্য থেকে বেশ কিছু রপ্তানি আয় দেশে এসেছে। যে কারণে গত সেপ্টেম্বর থেকে রপ্তানি আয় সামান্য হারে বাড়ছে।
এদিকে রপ্তানি আদেশ পর্যালোচনা করে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের দেওয়া আগাম পূর্বাভাসে বলা হয়েছে, ডিসেম্বরের তুলনায় জানুয়ারিতে ব্যাক টু ব্যাক এলসির দায় কমছে। ডিসেম্বরে এ খাতে আমদানি দায় হতে পারে ৯৭ কোটি ডলার। জানুয়ারিতে তা কমে দাঁড়াতে পারে ৮২ কোটি ৯২ লাখ ডলার।
রপ্তানি আয় কমলেও রেমিট্যান্স প্রবাহ বেশি থাকায় ডলারের বাজারে নেতিবাচক প্রভাব পড়েনি। তবে দীর্ঘ সময় ধরে রপ্তানি আয় কম থাকলে দেশের বৈদেশিক মুদ্রা ব্যবস্থাপনায় ভারসাম্যহীনতা দেখা দেওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। কারণ আগামী নির্বাচনের পর নির্বাচিত সরকার ক্ষমতায় এলে দেশের শিল্প-বাণিজ্য চাঙা হবে বলে আশা করা হচ্ছে। তখন আমদানি বাড়বে। আমদানি বাড়লে ডলারের খরচ বেড়ে যাবে। রেমিট্যান্সের পাশাপাশি রপ্তানি বাড়ানো সম্ভব না হলে বৈদেশিক মুদ্রার চলতি হিসাবে ঘাটতি বেড়ে যাবে।
আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে দীর্ঘ সময় এ হিসাবে ঘাটতি ছিল। এ ঘাটতির কারণেই ডলার সংকট প্রকট হয়েছে। কারণ ডলারের আয়ের চেয়ে খরচ বেশি হলেই এ হিসাবে ঘাটতি দেখা দেয়। আর আয়ের চেয়ে খরচ কম হলে উদ্বৃত্ত হয়। দীর্ঘ সময় পর গত অর্থবছরে এ হিসাবে ১৪ কোটি ৯০ লাখ ডলার উদ্বৃত্ত হয়েছে। চলতি অর্থবছরের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত এ হিসাবে উদ্বৃত্ত ছিল। রপ্তানি আয় কমায় অক্টোবর থেকে ঘাটতি দেখা দেয়। জুলাই-নভেম্বরে ঘাটতি বেড়ে ৭০ কোটি ডলারে উঠেছে।
এছাড়া রপ্তানি আয় কমতে থাকলে তৈরি পোশাক কারখানাগুলো স্বাভাবিক কার্যক্রম চালাতে পারবে না। উদ্যোক্তাদের তারল্যে ঘাটতি দেখা দেবে। কারখানা বন্ধ হওয়ার আশঙ্কাও রয়েছে। ইতোমধ্যে বেশ কিছু কারখানা বন্ধ হয়েছে। গ্যাস, বিদ্যুতের সংকট, ঋণের চড়া সুদ, রাজনৈতিক অস্থিরতা, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতির কারণে এ খাতে নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে।


