ভ্যাট প্রত্যাহারের পরও দাম বেড়েছে ভোজ্যতেলের
ইউক্রেনে রাশিয়ার সামরিক অভিযান শুরুর পর কয়েক দিনেই দেশের ভোজ্যতেলের দাম মণপ্রতি ১ হাজার টাকা পর্যন্ত বেড়ে যায়। পণ্যটির দামে লাগাম টানতে মজুদবিরোধী অভিযান পরিচালনাসহ অন্যান্য উদ্যোগের প্রভাবে সপ্তাহের ব্যবধানে পণ্যটির দাম আগের অবস্থায় ফিরে যায়। এতে সরকার নির্ধারিত দামের চেয়ে কম দামেই বিক্রি হয়ে আসছিল পণ্যটি। এরপর উৎপাদন ও ভোক্তা পর্যায়ের পাশাপাশি আমদানিতেও ভোজ্যতেলের ওপর থেকে ভ্যাট প্রত্যাহার করে সরকার। তবে গত দুদিনে দেশে ভোগ্যপণ্যের সবচেয়ে বড় পাইকারি বাজার খাতুনগঞ্জের পণ্যটির দাম মণপ্রতি ২০০-৩০০ টাকা বেড়ে গিয়েছে।
জানা গেছে, বিশ্ব ভোগ্যপণ্যের বাজার কিছুদিন ধরে ঊর্ধ্বমুখী ছিল। কভিডের প্রকোপ কমে আসার পর বিশ্বব্যাপী খাদ্যপণ্যের চাহিদা বৃদ্ধি, জ্বালানির দাম বেড়ে যাওয়ায় শিপিং ভাড়া বৃদ্ধিতে পণ্যবাজারে আরো বেশি প্রভাব পড়ে। তবে সাম্প্রতিক ইউক্রেন সংকট, রাশিয়ার ওপর পশ্চিমাবিশ্বের পাঁচ হাজারের বেশি নিষেধাজ্ঞায় বিশ্বব্যাপী সব ধরনের পণ্যের দাম ক্রমাগত বাড়ছে। এ কারণে বাংলাদেশের আমদানিনির্ভর ভোগ্যপণ্যের বাজারও অস্থির হয়ে ওঠে।
আসন্ন রমজানের দ্বিগুণ চাহিদার প্রায় শতভাগ আমদানিযোগ্য ভোগ্যপণ্য দামের অস্বাভাবিক বৃদ্ধি ক্রেতাদের পাশাপাশি বিচলিত করেছে সরকারকেও। গত ৬ ফেব্রুয়ারি সরকার সবচেয়ে বেশি বেড়ে যাওয়া পণ্য ভোজ্যতেলের দাম নতুন করে নির্ধারণ করে দেয়। পাশাপাশি ভোজ্যতেল আমদানিতে ১০ শতাংশ ভ্যাট জুন পর্যন্ত প্রত্যাহার করে নেয়। কিন্তু তার আগেই দেশব্যাপী প্রশাসনের নজরদারি বৃদ্ধি, পাইকারি বাজার ও পরিশোধন মিলে সরকারের বিভিন্ন সংস্থার অভিযানে হঠাৎ করেই অস্বাভাবিক বেড়ে যাওয়া ভোজ্যতেলের দাম প্রায় সমপরিমাণ কমে গিয়েছিল। ভ্যাট প্রত্যাহারের প্রজ্ঞাপন জারির পর সরকার নির্ধারিত দামের চেয়েও কম দামে বিক্রি হওয়া ভোজ্যতেলের দাম ফের বাড়তে শুরু করেছে। মূলত প্রশাসনের চাপে বিক্রি বন্ধ থাকা ও দাম কমে যাওয়া পণ্যটির বাজার সরকারি দামের সঙ্গে সমন্বয়ের প্রয়োজনে দাম বাড়ছে বলে দাবি ব্যবসায়ীদের।
এদিকে পাইকারি বাজারগুলোতে প্রশাসনের অভিযানের পরিপ্রেক্ষিতে নড়েচড়ে বসেছেন পাইকারি ব্যবসায়ীরাও। বৃহস্পতিবার সকালে দেশে ভোগ্যপণ্যের সবচেয়ে বড় পাইকারি বাজারের সংগঠন খাতুনগঞ্জ ট্রেড অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজ অ্যাসোসিয়েশন বৈঠকে বসে ব্যবসায়ীদের নিয়ে। ওই বৈঠকে পাইকারি বাজারটির প্রায় কয়েকশ ব্যবসায়ী অংশ নেন। সংগঠনটির সভাপতি মাহবুব আলমের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত বৈঠকে সরকার নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি দামে ভোজ্যতেল, চিনিসহ রমজানের প্রয়োজনীয় পণ্য বিক্রি না করতে নির্দেশনা দেয়া হয়। পাশাপাশি প্রশাসনের অভিযানের সময় ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ করে পালিয়ে না যেতেও ব্যবসায়ীদের নির্দেশনা দেয়া হয়। এ সময় সরকার নির্ধারিত দামের চেয়েও বেশি দামে পণ্য বিক্রির সময় প্রশাসনের শাস্তির মুখে পড়ছে সংগঠনের পক্ষ থেকে কোনো ধরনের আইনি সহায়তা দেয়া হবে না বলেও জানিয়ে দেয়া হয়।
এ প্রসঙ্গে ব্যবসায়ী সমিতির সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ ছগীর আহমেদ বলেন, কিছুদিন আগেও ভোজ্যতেলের দাম বেড়েছিল, এখন সেটি সরকার নির্ধারিত দামের চেয়েও কমে গেছে। আমরা সরকারের নির্দেশনা অনুযায়ী পণ্য বিক্রি করতে ব্যবসায়ীদের নির্দেশ দিয়েছি। ভ্যাট প্রত্যাহারের কারণে আমদানিকারকরাও আগের চেয়ে কম দামে ভোজ্যতেলসহ অন্যান্য পণ্য বিক্রি করতে পারবে। তবে নির্ধারিত দামের মধ্যে থাকলে বর্তমান মূল্যের চেয়েও ভোজ্যতেলের পাইকারি দাম আরো কিছুটা বাড়তে পারে বলে মনে করছেন তিনি।
গত ৬ ফেব্রুয়ারি বাণিজ্য মন্ত্রণালয় সয়াবিনের দাম নির্ধারণ করে দেয়। সরকারের নির্ধারণ করে দেয়া বাজারমূল্য অনুযায়ী, প্রতি লিটার বোতলজাত সয়াবিনের সর্বোচ্চ খুচরামূল্য ১৬৮ টাকা এবং বোতলজাত পাঁচ লিটারের দাম ৭৯৫ টাকা। এছাড়া খোলা সয়াবিন প্রতি লিটার সর্বোচ্চ ১৪৩ টাকা এবং খোলা পাম অয়েল লিটারপ্রতি ১৩৩ টাকা। গত এক সপ্তাহ ধরে খাতুনগঞ্জে পাইকারিতে পাম অয়েলের দাম মণপ্রতি দাম ৫ হাজার ৫০ টাকায় নেমে আসে। গত দুদিনে দাম ৫ হাজার ২৫০ টাকায় উঠে গেছে। এছাড়া সয়াবিনের দাম মণপ্রতি ৬ হাজার টাকায় নামলেও বর্তমানে বৃদ্ধি পেয়ে ৬ হাজার ২০০ থেকে ৬ হাজার ২৫০ টাকায় উঠেছে।
খাতুনগঞ্জের সবচেয়ে বড় ট্রেডিং প্রতিষ্ঠানগুলোর ব্যবসায়ীরা গতকালের বৈঠকে দাবি করেন, সরকার নির্ধারিত দরের চেয়ে পাইকারি বাজারে পাম অয়েলের দাম কম। প্রতি মণ পাম বিক্রি হচ্ছে ৫ হাজার ২০০ টাকায়। আবার সয়াবিনের দামও সরকার নির্ধারিত দরের চেয়েও কম দামে বিক্রি হচ্ছে। ফলে সরকারের নির্দেশনার মধ্যে থেকেই ট্রেডিং প্রতিষ্ঠান থেকে শুরু করে ব্রোকার্স প্রতিষ্ঠানগুলো ভোজ্যতেল লেনদেন করতে পারবে। তবে এর থেকে বেশি দাম যাতে না বাড়ে, সে বিষয়ে সব শ্রেণীর ব্যবসায়ীকে সজাগ থাকতে নির্দেশনা দেয়া হয়।
বৈঠকে অংশ নেয়া খাতুনগঞ্জের এক ব্যবসায়ী বলেন, সরকার কিংবা নিয়ন্ত্রণকারী সংস্থাগুলোর হস্তক্ষেপও অনেক সময় বাজারে পণ্যের দাম বৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখে। সরকার পণ্য আমদানিতে শুল্ক কমানোর পাশাপাশি আমদানি প্রক্রিয়া স্বচ্ছ রাখলে চাহিদা ও জোগানের স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় দাম নির্ধারণ হয়। বর্তমানে দাম কম থাকলেও সরকারি নির্ধারিত দামের মারপ্যাঁচে ভোজ্যতেলের দাম নতুন করে সমন্বয় হচ্ছে। এ কারণে গত কয়েক দিনে ধীরে ধীরে দাম বাড়ছে বলে স্বীকার করেছেন তিনি।
এদিকে পাইকারি ব্যবসায়ী ও ব্রোকাররা বলছেন, ডিও (সরবরাহ আদেশ) ব্যবসার নিয়ম অমান্য করে আমদানিকারকদের নির্ধারিত সময়সীমার মধ্যে পণ্য উত্তোলন না করার কারণে ভোজ্যতেলের বাজার অস্থিরতার জন্য সবচেয়ে বেশি দায়ী। গত কয়েকদিন ধরে দেশের বিভিন্ন এলাকায় প্রশাসনের অভিয়ানের সময় দীর্ঘদিনের পুরনো ডিও নিয়ে পণ্য উত্তোলনের প্রমাণ পাওয়া যায়। আমদানিকারকদের কাছ থেকে এসও ক্রয় করে পণ্যটি ১৫ দিনের মধ্যে মিলগেট থেকে সংগ্রহ করার নিয়ম থাকলেও যোগসাজশে দীর্ঘদিন বাজারে রেখে হাতবদল করা হয়। এতেই বাজারে পণ্যের দাম অস্বাভাবিক বাড়তে ভূমিকা রাখে বলে মনে করছেন ব্যবসায়ীরাও।


