নিয়ন্ত্রণ না থাকায় বকেয়া পাওনা আদায়ে ব্যর্থ বিপিসি

জ্বালানি সরবরাহে বিপিসির অন্যতম সহযোগী প্রতিষ্ঠান স্ট্যান্ডার্ড এশিয়াটিক অয়েল কোম্পানি লিমিটেড (এসএওসিএল)। প্রতিষ্ঠানটির কাছে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) বকেয়া প্রায় ২০০ কোটি টাকা। বকেয়া আদায়ে সর্বোচ্চ চেষ্টা করলেও প্রতিষ্ঠানটির স্বেচ্ছাচারিতা এবং দুর্নীতির কারণে কার্যত কোনো সমাধান হয়নি। এমনকি বিপিসির বোর্ড সভায় নিয়ন্ত্রণাধীন প্রতিষ্ঠানগুলো যেখানে নিয়মিত আয়-ব্যয়ের হিসাব প্রদান করে, সেখানেও এসএওসিএল চলছে উল্টোপথে। এমনকি শেষ তিন অর্থবছরে কোনো বার্ষিক সাধারণ সভা (এজিএম) করতে পারেনি প্রতিষ্ঠানটি। এসএওসিএলের এমন কার্যক্রম নিয়ে বিব্রত খোদ বিপিসির কর্মকর্তারা।

বিপিসির অন্যান্য রাষ্ট্রায়ত্ত বিপণন কোম্পানিতে (পদ্মা, মেঘনা, যমুনা অয়েল) সরকারি শেয়ারের পরিমাণ ৫১ শতাংশ এবং বেসরকারি ৪৯ শতাংশ হলেও এসএওসিএলের ক্ষেত্রে সরকারি ও বেসরকারি শেয়ারের পরিমাণ সমান ৫০ শতাংশ করে। এ সুযোগের কারণে বিপিসির সরাসরি কোনো নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে পারেনি এসএওসিএলে।

২০২০ সালে কভিডে আক্রান্ত হয়ে এসএওসিএলের তত্কালীন মহাব্যবস্থাপক মো. শাহেদ মৃত্যুবরণ করলে কোম্পানিটির বকেয়া নিয়ে বেশ চাপে পড়ে বিপিসি। সে সময় জ্বালানি তেল বিপণন বাবদ কোম্পানিটির কাছে বিপিসির বকেয়া পাওনা ছিল ৫২৯ কোটি টাকা। এছাড়া ব্যক্তিগত ও অন্যান্য খাতে প্রায় ১৫০ কোটি টাকা পাওনা ছিল বিপিসির। এ বিপুল অর্থ উদ্ধারে বিপিসি নতুন পর্ষদকে ২০২০ সালের ডিসেম্বরে প্রতিষ্ঠানটির আর্থিক অসংগতি এবং কোম্পানি পুনর্গঠনের জন্য নিয়োগ দেন।

নিয়োগ পাওয়ার পর নতুন পর্ষদ বকেয়া উদ্ধার করে বিপিসিকে পরিশোধ করা, ব্যক্তিগত খাতে চালানো কোম্পানির গাড়ি উদ্ধার করে নিলামে বিক্রি, এসএওসিএলের সীতাকুণ্ডে ৩ দশমিক ৭২ একরের জমি (আনুমানিক মূল্য ৩৫ কোটি টাকা) বিক্রির জন্য নিলামে তোলা, এসএওসিএলের ১৯০ কোটি টাকা এফডিআর ভেঙে বিপিসির বকেয়া পরিশোধ করা, অপ্রয়োজনীয় সেলস সেন্টার বন্ধ করা, কক্সবাজারে এসএওসিএলের এভিয়েশনের ডিপো মেঘনার কাছে হস্তান্তর, কোম্পানির নামে থাকা ভিআইপি সিমকার্ড বন্ধ করা, অপ্রয়োজনীয় লোকবল ছাঁটাই করে কোম্পানির ব্যয় সংকোচন করে বিপিসির পাওনা কমিয়ে আনা হয়।

পরবর্তী সময়ে প্রতিষ্ঠানটিকে আবারো ঢেলে সাজাতে বিপিসির মহাব্যবস্থাপক (অর্থ) মণি লাল দাশকে এসএওসিএলের ভারপ্রাপ্ত মহাব্যবস্থাপক হিসেবে নিয়োগ দেয় বিপিসি বোর্ড। বর্তমানে এসএওসিএলের কাছে জ্বালানির স্টক এবং ব্যক্তিগত পাওনা বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ২০০ কোটি টাকার কাছাকাছি। তবে শুধু জ্বালানি বাদে পাওনার পরিমাণ প্রায় ৭২ কোটি টাকা।

বিপিসির কর্মকর্তারা জানান, সরকারি এবং পাবলিক শেয়ার সমান হওয়ায় এসএওসিএলে সরাসরি নিয়ন্ত্রণ নেই বিপিসির। যার কারণে বিপিসি তার পাওনা আদায়ে এসএওসিএলের যদি অন্তত ১ শতাংশ শেয়ার কেনার পরিকল্পনা করত, তাহলে এ প্রতিষ্ঠানটি বিপিসির নিয়ন্ত্রণে আসত।

বিপিসি সূত্রে জানা গেছে, প্রতিষ্ঠানটির বকেয়া পরিশোধে গত পর্ষদ প্রায় ১০৯ জন অস্থায়ী কর্মকর্তাকে চাকরিচ্যুত করেছে। যদি এসএওসিএল থেকে সব টাকা একবারে নেয়া হয়, তাহলে প্রতিষ্ঠানটিকে লে-অফ ঘোষণা করা ছাড়া বিকল্প পথ খোলা ছিল না। তাছাড়া অন্যান্য অজুহাতে পর্ষদ পরিবর্তন করে নতুন পর্ষদ গঠন করে বিপিসি। যার কারণে নানা অস্থিরতায় এসএওসিএলের জ্বালানি বিপণন কার্যক্রম বন্ধ ছিল, যা নতুন পর্ষদ আবারো চালু করেছে।

এ প্রসঙ্গে বিপিসির মহাব্যবস্থাপক (অর্থ) এবং এসএওসিএলের মহাব্যবস্থাপক (ভারপ্রাপ্ত) মণি লাল দাশ বলেন, আমি দায়িত্ব নিয়েছি মাত্র দুই মাস হলো। আমি দায়িত্ব পাওয়ার পর প্রতিষ্ঠানটিকে আবারো নতুন কাঠামোতে গোছানোর চেষ্টা করছি। মূলত এসএওসিএলের কাছে বিপিসির পাওনা ছিল ৬৭৮ কোটি টাকার মতো। গত পর্ষদ এবং আমার পর্ষদ মিলে প্রায় ৬০৮ কোটি টাকা পরিশোধ করা হয়েছে। এখনো নিট প্রায় ৭২ কোটি টাকা বকেয়া আছে। যেহেতু প্রতিষ্ঠানের মার্কেটিং বন্ধ ছিল আমি দায়িত্ব পাওয়ার পর লুব অয়েলসহ অন্যান্য জ্বালানি বিক্রি করা শুরু করেছি। এখনো আমরা কমিশন বাদে ব্রেক ইভেন্ট পয়েন্টে আছি। বিক্রি বাড়লে আমরা লভ্যাংশ বিপিসিকে পরিশোধ করব। একটা প্রতিষ্ঠান লে-অফ ঘোষণা করা কোনো সমাধান নয় বলে মনে করেন তিনি।

তিনি আরো বলেন, পাবলিক-প্রাইভেট কোম্পানি হওয়ার অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের মতো এসএওসিএলে সরাসরি নিয়ন্ত্রণ সম্ভব না। প্রতিষ্ঠান ৫০ শতাংশের মালিক দুই ভাইয়ের কাছে বিপিসি পাওনা প্রায় শতকোটি টাকার বেশি। কিন্তু তারা পর্যাপ্ত কাগজপত্র নেই এমন অজুহাতে টাকা দেয়া নিয়ে গড়িমসি করছে। বিষয়টি সমাধানে কাজ করছি।

বিপিসির তথ্যমতে, দুদকের সাবেক মহাপরিচালক (প্রশাসন) মুনির চৌধুরী ২০১৯ সালের জানুয়ারিতে এসএওসিএলের বিরুদ্ধে অর্থ আত্মসাতের অভিযোগে তদন্ত শুরু করেন। পরবর্তী সময়ে তার নির্দেশে ২৮ জানুয়ারি উপপরিচালক এসএম সাহিদুর রহমান ও মোহাম্মাদ মাহমুদুর রহমানের সমন্বিত এনফোর্সমেন্ট টিম ব্যাংকে অনুসন্ধান চালায়। এসময় প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে তদন্ত করে ৫৭ কোটি টাকা আত্মসাতের প্রমাণ পায়। ব্যাংকের দেয়া তথ্যমতে, এসএওসিএলের পরিচালক মঈনউদ্দিন ও তার স্ত্রীর পিরামিড এক্সিম লিমিটেডের নামে বিভিন্ন ব্যাংকে প্রায় ৪৩ কোটি টাকা এবং মহাব্যবস্থাপক মোহাম্মদ শাহেদের গুডউইন কোম্পানির নামে প্রায় ১৪ কোটি টাকা জমা ও উত্তোলন করেন তারা। মামলাটি বর্তমানে দুদকে তদন্তাধীন আছে।

অন্যদিকে এসএওসিএলের কাছে বিভিন্ন সময়ে বকেয়া বিপিসিকে ফেরত দেয়ার জন্য কোম্পানির পক্ষ থেকে গত পাঁচ বছরে বেশ কয়েকবার চিঠি দেয়া হয়েছিল। কিন্তু টাকা পরিশোধে আগ্রহ দেখায়নি প্রতিষ্ঠানটি।

 

সম্পর্কিত খবর