গোয়েন্দা সংস্থা এনএসআইর রিপোর্ট
৫ সিইওর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে প্রধান উপদেষ্টা কার্যালয়ের নির্দেশ
আইন লংঘন করে চলতি দায়িত্ব পালনকারী দেশের বেসরকারি খাতের ৫টি বীমা কোম্পানির মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তার বিরুদ্ধে দ্রুত ব্যবস্থা নিতে প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয় থেকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয় থেকে গত ৪ জুন আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সচিব বরাবর এই সংক্রান্ত একটি চিঠি পাঠানো হয়।
আর, চলতি দায়িত্বে থাকা এই সিইওদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করে জাতীয় নিরাপত্তা গোয়েন্দা অধিদপ্তর এনএসআই।
৫টি বীমা কোম্পানির ভারপ্রাপ্ত সিইও হলেন- সোনালী লাইফ ইন্স্যুরেন্স কোম্পানী লিমিটেড এর রফিকুল ইসলাম, মার্কেন্টাল ইসলামী লাইফ ইন্স্যুরেন্স লিমিটেড এর এস. কে. আব্দুর রশিদ, কন্টিনেন্টাল ইন্স্যুরেন্স লিমিটেড এর মোশাররফ হোসেন এসিআইআই, রূপালী ইন্স্যুরেন্স কোম্পানী লিমিটেড এর ফৌজিয়া কামরুন তানিয়া এবং গার্ডিয়ান লাইফ ইন্স্যুরেন্সের নাম উল্লেখ করা হয়।
জানা গেছে, গোয়েন্দা সংস্থা এনএসআই স্মারক নম্বর ০৩.১২.২৬৬৬.৫৪২.২৩.০০১.২৫-৫৩৪ সূত্র উল্লেখ করে আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ (অর্থ মন্ত্রণালয়) এর সচিবকে প্রেরিত সম্প্রতি এক চিঠিতে এ নির্দেশ দেন প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয় এর পরিচালক-১২ র. হ. ম. আলাওল কবির। সে চিঠির সূত্র ধরে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা দ্রুত গ্রহণের জন্য আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ থেকে বীমা খাতের নিয়ন্ত্রণকারী প্রতিষ্ঠান বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষকে (আইডিআরএ) চিঠিতে জানানো হয়েছে।
সূত্র জানায়, বীমা কোম্পানিগুলোতে অনিয়ম ও দুর্নীতি তদন্তে মাঠে নেমেছে সরকারের গোয়েন্দা সংস্থাগুলো। সে কাজের ধারাবাহিকতায় এনএসআই সম্প্রতি এক তদন্ত করে প্রতিবেদন পেশ করে।
এনএসআই প্রতিবেদনে জানায়, সোনালী লাইফ ইন্স্যুরেন্স কোম্পানী লিমিটেড এর রফিকুল ইসলাম ২০২৪ সালের ২ সেপ্টেম্বর থেকে চলতি বছরের ২২ মে অবধি ৮ মাস ১৭ দিন, গার্ডিয়ান লাইফ ইন্স্যুরেন্স লিমিটেডের সিইওর ৪ বছর, মার্কেন্টাল ইসলামী লাইফ ইন্স্যুরেন্স লিমিটেড এর এস. কে. আব্দুর রশিদ ২০২৪ সালের ১ জুলাই থেকে ২০২৫ সালের ২২ মে অবধি ১০ মাস ২১ দিন, কন্টিনেন্টাল ইন্স্যুরেন্স লিমিটেড এর মোশাররফ হোসেন এসিআইআই গত ১০ অক্টোবর থেকে ২০২৫ সালের ২২ মে অবধি ৭ মাস ১০ দিন এবং রূপালী ইন্স্যুরেন্স কোম্পানী লিমিটেড এর ফৌজিয়া কামরুন তানিয়া ২০২৩ সালের ২ জানুয়ারি থেকে ২০২৫ সালের ২২ মে অবধি ২ বছর ৪ মাস ১৭ দিন বীমা আইন লংঘন করে নিয়ম বর্হিভূতভাবে সিইও পদে চলতি দায়িত্ব পালন করে আসছেন। প্রতিবেদনে বলা হয়, এ অনিয়মের বিপরীতে আইডিআরএ এখনো কোন পদক্ষেপ গ্রহণ করেনি।
উল্লেখ্য, রূপালী ইন্স্যুরেন্স কোম্পানী লিমিটেড এর ফৌজিয়া কামরুন তানিয়া ২ বছরের বেশি সময় ধরে মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) অবৈধভাবে কাজ করছেন। অনিয়মের জন্য ৫ লাখ টাকা জরিমানা করে এবং শর্ত হিসেবে পরবর্তি ৬০ দিনের মধ্যে সিইও নিয়োগ করতে বলা হয়। কিন্তু রূপালী ইন্স্যুরেন্স কোম্পানী লিমিটেড সে নির্দেশের কর্ণপাত করেনি। এমনকি সোনালী লাইফ ইন্সুরেন্সের রফিকুল ইসলাম দীর্ঘদিন বীমা আইন লংঘন করে নিয়ম বর্হিভূতভাবে সিইও পদে চলতি দায়িত্ব পালন করছেন। রফিকুল ইসলামের বিরুদ্ধে জাল সার্টিফিকেট দিয়ে চাকরির গুরুতর অভিযোগ রয়েছে। একইসঙ্গে মার্কেন্টাল ইসলামী লাইফের এস কে আব্দুর রশিদ ও কন্টিনেন্টাল ইন্স্যুরেন্সের মোশাররফ হোসেন সিইও পদে নিয়মহীন দায়িত্ব পালন করে আসছেন।
বিদ্যমান বীমা আইন, ২০১০ এর ৮০(৪) ধারা অনুয়ায়ি বীমা কোম্পানির মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) পদে একাধারে ৩ মাস অধিক সময়ের জন্য শূন্য পদ রাখার বিধান নেই। তবে বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ (আইডিআরএ) অপরিহার্য় পরিস্থিতি বিবেচনায় এ সময়সীমা আরো ৩ মাস বাড়াতে পারে।
প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয় থেকে প্রেরিত চিঠিতে মতামত পর্বে বলা হয়- আইন লংঘন করে চলতি দায়িত্ব পালনকারী সিইও এবং বীমা কোম্পানিগুলোর বিরুদ্ধে আইডিআরএ কঠোর কোন পদক্ষেপ গ্রহণ করছে না তা প্রতীয়মান। বরং নিয়ন্ত্রক আইডিআরএ’র এ ধরনের কার্যক্রম বীমা কোম্পানিগুলোর দুর্নীতিতে উৎসাহিত করছে। কোম্পানিগুলোর চেয়ারম্যান কোম্পানি থেকে তাদের নিজস্ব স্বার্থ হাসিলের জন্য তাদের অনুগত ব্যক্তিদের সিইও পদে নিয়োগ প্রদান করে থাকে। অনুগত ব্যক্তি যোগ্য না হলেও তার জন্য জরিমানা দিয়ে বছরের পর বছর সিইও পদে বহাল রাখা হয়। জরিমানার এ টাকা বীমা গ্রাহকের। ফলে গ্রাহক স্বার্থ ক্ষুন্ন হওয়ার পাশাপাশি বীমা খাতের শৃঙ্খলা নষ্ট হচ্ছে।
প্রধান উপদেষ্টার দপ্তরে জমা দেওয়া ওই প্রতিবেদনে গোয়েন্দা সংস্থাটি একটি সুপারিশও করেছে। সংস্থাটি বলছে, আইন লঙ্ঘনকারী সিইও এবং বীমা কোম্পানিগুলোর বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য আইডিআরএ’কে নির্দেশনা/সুপারিশ প্রদান করা যেতে পারে।
এদিকে বীমা কোম্পানির সিইও নিয়োগের অভিজ্ঞতা ও যোগ্যতার সময়কাল কমিয়ে বিদ্যমান আইনের সংশোধনী প্রস্তাব সরকারের কাছে পেশ করেছে আইডিআরএ।
প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয়ের চিঠির বিষয়ে আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সচিব নাজমা মোবারেক বিষয়টির সত্যতা নিশ্চিত করে বলেন, “এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে আইডিআরএকে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।”
আইডিআরএর (মিডিয়া ও যোগাযোগ) ও মুখপাত্র সাইফুন্নাহার সুমি বলেন, ” বীমা খাতে সিইও সংকট রয়েছে। ১৯টি বীমা কোম্পানিতে সিইও নেই। সিইও নিয়োগের প্রবিধানমালা সংশোধন নিয়ে কাজ করছে আইডিআরএ।”
নিয়ম বর্হিভূতভাবে দীর্ঘ সময় এভাবে দীর্ঘদিন সিইওর দায়িত্ব পালন প্রসঙ্গে বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ (আইডিআরএ) চেয়ারম্যান ড. এম. আসলাম আলম বলেন, “আমি দায়িত্বভার নেওয়ার পরই বিষয়টি তুলেছি। আগে বিষয়টি নিয়ে কোন কথা বলেনি কেউ।”


