৫ ট্রিলিয়ন ডলারের হালাল বাজারে বাংলাদেশের রফতানি মাত্র ৮৫০ মিলিয়ন ডলার
বিশ্বজুড়ে হালাল অর্থনীতির বাজার ৫ ট্রিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে গেলেও এ বিশাল বাজারে বাংলাদেশের অবস্থান এখনো সীমিত। বর্তমানে বাংলাদেশ বছরে মাত্র ৮৫০ মিলিয়ন ডলার মূল্যের হালাল পণ্য রফতানি করছে। খাতসংশ্লিষ্টদের মতে, নীতিগত সংস্কার, আন্তর্জাতিক মানের সার্টিফিকেশন ব্যবস্থা এবং দক্ষ মানবসম্পদ গড়ে তুলতে পারলে এ বাজারে বাংলাদেশের রফতানি ও বৈদেশিক মুদ্রা আয় উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ানো সম্ভব।
শনিবার (১৮ জুলাই)বাংলাদেশ চেম্বার অব ইন্ডাস্ট্রিজের (বিসিআই) উদ্যোগে রাজধানীর তেজগাঁওয়ে বিসিআই বোর্ড রুমে অনুষ্ঠিত ‘হালাল ফর এক্সপোর্ট ডাইভার্সিফিকেশন’ শীর্ষক কর্মশালায় ব্যবসায়ী, গবেষক ও রফতানিকারকরা এসব কথা বলেন। কর্মশালায় একক সার্টিফিকেশন কর্তৃপক্ষ, আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি, আধুনিক পরীক্ষাগার, ডিজিটাল ট্রেসেবিলিটি এবং দক্ষ জনবল গড়ে তোলার ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়।
বিসিআই সভাপতি আনোয়ার-উল আলম চৌধুরী পারভেজের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) ভাইস চেয়ারম্যান ও প্রধান নির্বাহী (অতিরিক্ত সচিব) মোহাম্মদ হাসান আরিফ। মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি অব বিজনেস এগ্রিকালচার অ্যান্ড টেকনোলজির (আইইউবিএটি) বিজনেস স্কুলের সহকারী অধ্যাপক ড. মো. মোমিনুল ইসলাম। এছাড়া আলোচনায় অংশ নেন বাংলাদেশ-মালয়েশিয়া চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সাবেক সভাপতি শাব্বির এ খান এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. দীন ইসলাম।
মোহাম্মদ হাসান আরিফ বলেন, বর্তমানে বৈশ্বিক হালাল অর্থনীতির আকার প্রায় ৫ দশমিক ২ ট্রিলিয়ন ডলার। তবে বাংলাদেশ এখনো মূলত খাদ্য ও কৃষিভিত্তিক হালাল পণ্য রফতানিতেই সীমাবদ্ধ। অথচ প্রসাধনী, ওষুধ, ফ্যাশন, পর্যটন, উৎপাদন সরবরাহ শৃঙ্খল, আর্থিক প্রযুক্তি, শিক্ষা ও গবেষণাসহ বিভিন্ন খাতে বড় সম্ভাবনা রয়েছে।
তিনি বলেন, দেশের হালাল খাতের অন্যতম বড় সমস্যা হলো সমন্বয়হীনতা। আন্তর্জাতিকভাবে গ্রহণযোগ্য একক সার্টিফিকেশন কর্তৃপক্ষ না থাকায় রফতানিকারকদের নানা জটিলতায় পড়তে হচ্ছে। এ কারণে মালয়েশিয়া বা তুরস্কের আদলে একটি আন্তর্জাতিক স্বীকৃতিপ্রাপ্ত সার্টিফিকেশন কর্তৃপক্ষ গঠনের ওপর গুরুত্বারোপ করেন তিনি।
বিসিআই সভাপতি আনোয়ার-উল আলম চৌধুরী পারভেজ বলেন, বাংলাদেশের হালাল পণ্যের বিপুল সম্ভাবনা থাকলেও এ খাত সম্পর্কে সচেতনতা এবং সার্টিফিকেশন ব্যবস্থা এখনো পর্যাপ্ত নয়। দ্রুত প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়া গেলে রফতানি, কর্মসংস্থান এবং দেশীয় শিল্পে ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে। তিনি জানান, ২০৩৪ সালের মধ্যে বৈশ্বিক হালাল বাজারের আকার প্রায় ৯ দশমিক ৪৫ ট্রিলিয়ন ডলারে পৌঁছাতে পারে।
মূল প্রবন্ধে ড. মো. মোমিনুল ইসলাম বলেন, বাংলাদেশের বার্ষিক হালাল পণ্য রফতানির মূল্য মাত্র ৮৫০ মিলিয়ন ডলার, যা এখনো ১ বিলিয়ন ডলারের মাইলফলক স্পর্শ করতে পারেনি। তিনি বলেন, হালাল শুধু খাদ্যপণ্য নয়; প্রসাধনী, ওষুধ, ফ্যাশন, পর্যটন এবং আর্থিক সেবাসহ বিভিন্ন খাতের সঙ্গে যুক্ত। দেশের কৃষিভিত্তিক অর্থনীতি ও শিল্প সক্ষমতাকে কাজে লাগিয়ে এ বাজারে শক্ত অবস্থান তৈরি করা সম্ভব।
বিএমসিসিআইয়ের সাবেক সভাপতি শাব্বির এ খান বলেন, হালাল পণ্যের রফতানি বাড়াতে ভোক্তা সচেতনতা, টেকসই মাননিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা এবং দক্ষ মানবসম্পদ গড়ে তোলার বিকল্প নেই। এ জন্য শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ কার্যক্রম জোরদারের আহ্বান জানান তিনি।
অধ্যাপক ড. মো. দীন ইসলাম বলেন, বর্তমানে বিশ্বে প্রায় ২৫ হাজার প্রতিষ্ঠানের ২০ লাখ হালাল পণ্য রয়েছে। অথচ বাংলাদেশে হালাল সনদপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা প্রায় ৩০০ এবং রফতানিযোগ্য পণ্য ৬০০ থেকে ৭০০টির মধ্যে সীমাবদ্ধ। আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে ডিজিটাল ট্রেসেবিলিটি, আধুনিক পরীক্ষাগার এবং আন্তর্জাতিক মান নিশ্চিত করার ওপর তিনি গুরুত্বারোপ করেন।
উন্মুক্ত আলোচনায় ইজি প্রসেস ফুডের চেয়ারম্যান জিয়া হায়দার মিঠু বলেন, বিএসটিআই ও ইসলামিক ফাউন্ডেশন থেকে হালাল সনদ নিতে উদ্যোক্তাদের অতিরিক্ত ব্যয় বহন করতে হয়, যা অনেক প্রতিষ্ঠানের জন্য বড় বাধা। তিনি সহজ শর্তে, স্বল্প ব্যয়ে বা বিনা মূল্যে হালাল সনদ, প্রশিক্ষণ ও কারিগরি সহায়তা নিশ্চিত করার দাবি জানান।
বম্বে সুইটস অ্যান্ড কোম্পানি লিমিটেডের মহাব্যবস্থাপক খুরশিদ আহমেদ ফরহাদ বলেন, বাংলাদেশের ইসলামিক ফাউন্ডেশন ও বিএসটিআইয়ের কোনো সংস্থাই সৌদি অ্যাক্রেডিটেশন সেন্টারের স্বীকৃতি পায়নি। ফলে সৌদি আরবে রফতানির জন্য ভারত, সিঙ্গাপুর বা থাইল্যান্ডের স্বীকৃত সংস্থার সনদ নিতে হচ্ছে। এ কারণে তাদের দুই শতাধিক পণ্যের মধ্যে প্রায় ৫০টির মোড়ক থেকে হালাল লোগো অপসারণ করতে হয়েছে।


