সাবকন্ট্রাক্টিং তালিকাভুক্তির জন্য পূরণ করতে হবে নয়টি শর্ত
দেশের সম্ভাবনাময় কুটির, মাইক্রো, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পগুলো (সিএমএসএমই) নির্ধারিত পদ্ধতিতে সাবকন্ট্রাক্টিংয়ের তালিকাভুক্তির লক্ষ্যে শিল্প মন্ত্রণালয়ের আইন শাখা ‘সাবকন্ট্রাক্টিং আইন, ২০২২’ প্রণয়ন করছে। খসড়া আইন অনুযায়ী সাবকন্ট্রাক্টিংয়ে তালিকাভুক্তির জন্য দেশীয় সিএমএসএমই শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলোকে পূরণ করতে হবে নয়টি শর্ত। এরই মধ্যে এ-সংক্রান্ত একটি খসড়া প্রণীত হয়েছে। আইনের প্রয়োজনীয়তা উল্লেখ করে খসড়ায় বলা হয়, দেশের কর্মসংস্থান ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জনে সিএমএসএমই শিল্প গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। তাই চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জ মোকাবেলার অংশ হিসেবে দেশের শিল্পায়ন আরো গতিশীল করতে এবং কুটির, মাইক্রো, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের অধিকতর বিকাশ ঘটাতে সাবকন্ট্রাক্টিং আইন প্রণয়ন হয়েছে।
খসড়ায় সাবকন্ট্রাক্টিংয়ের ব্যাখ্যায় বলা হয়েছে, বিদ্যমান অন্য কোনো আইনে যা-ই থাকুক না কেন, সাবকন্ট্রাক্টিং বলতে বিভিন্ন মন্ত্রণালয় বা বিভাগ বা সরকারি প্রতিষ্ঠান বা করপোরেশন বা কোম্পানি বা রাষ্ট্রায়ত্ত শিল্প-কারখানা বা প্রকল্প বা ওয়ার্কশপ প্রভৃতির মধ্যে চুক্তি বা উপ-চুক্তি বা আন্তঃসংযোগ ব্যবস্থায় দেশীয় সিএমএসএমই শিল্প কর্তৃক দেশে উৎপাদিত যন্ত্র বা যন্ত্রাংশ বা পণ্য ক্রয়ের জন্য প্রযোজ্য পদ্ধতি বোঝাবে। এক্ষেত্রে দেশে উৎপাদিত পণ্য বিবেচিত হওয়ার জন্য কোনো পণ্য দেশীয় কোনো সিএমএসএমই শিল্প কর্তৃক দেশের অভ্যন্তরে কমপক্ষে ৫০ শতাংশ মূল্য সংযোজিত হতে হবে।
সাবকন্ট্রাক্টিং আইনটি বাস্তবায়ন সম্পর্কে খসড়ায় বলা হয়েছে, তফসিলে উল্লেখিত মন্ত্রণালয়, বিভাগ, সংস্থা, প্রতিষ্ঠানগুলো সাবকন্ট্রাক্টিং পদ্ধতি বাস্তবায়ন করবে। এক্ষত্রে তফসিলে উল্লেখিত মন্ত্রণালয়, বিভাগ, সংস্থা বা প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের ব্যবহূত কিন্তু আমদানীকৃত যন্ত্র বা যন্ত্রাংশ বা পণ্যের প্রযোজ্য ক্ষেত্রে কমপক্ষে ২৫ শতাংশ দেশীয় কুটির, মাইক্রো, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প কর্তৃক দেশে উৎপাদিত যন্ত্র বা যন্ত্রাংশ বা পণ্য ক্রয় করবে।
সাবকন্ট্রাক্টিং তালিকাভুক্তির জন্য দেশের ক্ষুদ্র ও মাঝারি প্রতিষ্ঠানকে নয়টি শর্ত পূরণ করতে হবে। শর্তগুলো হলো প্রস্তুতকারক লাইসেন্স, ট্রেড লাইসেন্স, টিআইএন সার্টিফিকেট, ভ্যাট সার্টিফিকেট (প্রযোজ্য ক্ষেত্রে), শিল্প প্রতিষ্ঠানটির মালিকানার দলিলপত্র, বিসিকের রেজিস্ট্রেশন সনদ, গত দুই বছরের তৈরীকৃত দ্রব্যাদি এবং ক্রয়কারী বা ব্যবসায়ী সংস্থাগুলোর নাম, প্রতিষ্ঠানটি নিজস্ব জায়গায় স্থাপিত হলে জায়গার দলিলপত্র অথবা ভাড়া জায়গায় হলে অন্তত পাঁচ বছরের চুক্তিপত্র ইত্যাদি। সাবকন্ট্রাক্টিং তালিকাভুক্তির সময় বিসিক সংশ্লিষ্ট কুটির, মাইক্রো, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প কর্তৃক উৎপাদিত যন্ত্র বা যন্ত্রাংশ বা পণ্য ব্যবহারকারী দেশীয় সরকারি, আধা সরকারি, স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান, প্রকল্প বা ওয়ার্কশপের তালিকা প্রস্তুত, সংরক্ষণ, ওয়েবসাইটে প্রকাশ ও সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর মাঝে প্রচারের ব্যবস্থা করবে বলেও খসড়ায় উল্লেখ করা হয়েছে।
সাবকন্ট্রাক্টিং বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া সম্পর্কে খসড়ায় বলা হয়েছে, বিসিক তালিকাভুক্ত সিএমএসএমই শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলো তাদের উৎপাদিত যন্ত্র বা যন্ত্রাংশ বা পণ্যের প্রকৃতি অনুযায়ী শ্রেণী বিন্যাস করবে। এক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় যন্ত্র বা যন্ত্রাংশের যদি একাধিক প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান থাকে, তবে তাদের মধ্যে সীমিত দরপত্র আহ্বান করতে হবে। দরপত্রের জন্য কোনো মূল্য ও আর্নেস্ট মানি এবং সংবাদপত্রে বিজ্ঞাপনের প্রয়োজন হবে না। দরপত্র আহ্বানের পর সর্বনিম্ন দরের ভিত্তিতে কার্যাদেশ দিতে হবে। এক্ষেত্রে কোনো দরপত্রে যদি বিনির্দেশক ঠিক না থাকে, তাহলে তা বাতিল করতে হবে। দরপত্র বাতিলের বিষয়ে খসড়া আইনে বলা হয়েছে, কোনো প্রতিষ্ঠান যদি কার্যাদেশকৃত যন্ত্র বা যন্ত্রাংশ বা পণ্য সরবরাহে অপারগতা বা পরপর তিনবার দরপত্রে অংশগ্রহণ না করে, তাহলে সাবকন্ট্রাক্টিং তালিকাভুক্তি থেকে ওই প্রতিষ্ঠানের নাম বাতিল করা হবে।
প্রস্তাবিত খসড়া আইনে সাবকন্ট্রাক্টিংয়ের অর্থ আদায়, চুক্তি, আমদানি বিকল্প যন্ত্রাংশ বা যন্ত্রপাতি সংগ্রহ, বৃহৎ শিল্প থেকে যন্ত্রাংশ বা যন্ত্রপাতি সংগ্রহ, সাবকন্ট্রাক্টিং বাস্তবায়ন মনিটরিং কমিটি, বিরোধ নিষ্পত্তি এবং আইন অমান্যের বিষয়ে বিস্তারিত বলা হয়েছে।
শিল্প মন্ত্রণালয়ের একজন অতিরিক্ত সচিবের নেতৃত্বে মনিটরিং কমিটি গঠন করা হবে এবং বিসিকের একজন কর্মকর্তা কমিটির সদস্য সচিব হবেন। এছাড়া কমিটিতে বাণিজ্য ও শিল্প সংগঠনের প্রতিনিধিসহ সংশ্লিষ্ট সরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তারাও থাকবেন। কমিটি সাবকন্ট্রাক্টিং বাস্তবায়নের অগ্রগতির প্রতিবেদন প্রতি মাসে সরকারের কাছে পেশ করবে।
সাবকন্ট্রাক্টিংয়ের অন্তর্ভুক্ত কোনো প্রতিষ্ঠান যদি আইনের ব্যত্যয় ঘটায়, তাহলে ওই প্রতিষ্ঠানের মালিক-ম্যানেজারসহ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা দায়ী হবেন এবং এজন্য দুই বছর পর্যন্ত সশ্রম বা বিনাশ্রম এবং ৫ লাখ টাকা অর্থদণ্ড অথবা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হবেন।
বাংলাদেশ ইঞ্জিনিয়ারিং শিল্প মালিক সমিতির সভাপতি মো. আব্দুর রাজ্জাক বলেন, এ আইনটি পাস হলে আমাদের সিএমএসএমই শিল্প মালিকদের জন্য খুবই ভালো হবে। আমি মনে করি আইনটি আরো দ্রুত পাস হওয়া উচিত। দেরি হওয়াতে সিএমএসএমই শিল্প মালিকরা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
খসড়া সম্পর্কে শিল্প মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব (নীতি, আইন ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতা) শেখ ফয়েজুল আমিন বলেন, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পপ্রতিষ্ঠানকে সহযোগিতা করার জন্য এ আইন প্রণয়ন হচ্ছে। এর আগে ১৯৮৯ সালের একটি প্রজ্ঞাপনের আলোকে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প মালিকরা সাবকন্ট্রাক্টিং করতে পারত, এখন সেটি আইনে রূপান্তরিত করা হচ্ছে।


