সবজির বাজারে আগুন, চাপে ক্রেতা

রাজধানীর কাঁচাবাজারে গেলেই এখন ক্রেতাদের প্রথম প্রতিক্রিয়া ‘সবজির এতো দাম’! মাছ-মাংসের উচ্চমূল্যের কারণে অনেক পরিবার যেখানে খাবারের তালিকায় সবজির ওপর নির্ভরশীল হয়ে উঠেছে, সেখানে এখন সেই সবজিও নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে। প্রায় সব ধরনের সবজির কেজি এখন প্রায় সেঞ্চুরিতে বা একশো টাকার কাছাকাছি।

সবজির অস্বাভাবিকভাবে দাম বেড়ে যাওয়ায় সবচেয়ে বেশি চাপে পড়েছেন নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারের মানুষ। সবজি কিনতে গিয়ে এখন তাদের অনেকটাই হাঁসফাঁস অবস্থা। কেউ কেউ এক কেজি সবজি কিনতে গিয়ে আধাকেজি বা তারও কম কিনছেন।

ব্যবসায়ীরা বলছেন, বর্ষা মৌসুমে অনেক এলাকায় উৎপাদন ও সরবরাহে বিঘ্ন ঘটে, এতে সবজির দাম বেড়ে যায়। এবারও তেমনটিই ঘটেছে। কয়েকদিন ধরে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বৃষ্টি হচ্ছে। এতে অনেক খেতের ক্ষতি হয়েছে। বাজারে সবজির সরবরাহ কমে গেছে। এ কারণে সবজির দাম বেড়ে গেছে।

তবে ক্রেতরা বলছেন, বাজারে সবজির পর্যাপ্ত সরবরাহ রয়েছে। কোনো দোকানেই সবজির কমতি নেই। কিন্তু দাম অস্বাভাবিক। বাজারে কার্যকরি তদারকি না থাকায় এমনটি হচ্ছে। ব্যবসায়ীরা নানান অজুহাতে দাম বাড়িয়ে দিচ্ছেন। বাজারে তদারকি বাড়ালে দাম কিছুটা হলেও কমে আসবে।

তারা বলছেন, বাজারে এখন অধিকাংশ সবজির কেজি ১০০ টাকার কাছাকাছি বা তারও বেশি। ফলে এখন শুধু মাছ-মাংস নয়, সাধারণ সবজিও অনেক পরিবারের জন্য বিলাসিতার পণ্যে পরিণত হয়েছে। টমেটো, গাজরের মতো সবজিতে তো নিম্নআয়ের মানুষের পক্ষ হাত দেওয়া অসম্ভব হয়ে পড়েছে।

বুধবার রাজধানীর বিভিন্ন বাজার ঘুরে দখো গেছে, বাজারে সবচেয়ে বেশি দামে বিকি হচ্ছে শিম। এক কেজি শিম ১৮০ থেকে ২২০ টাকা কেজি বিক্রি হচ্ছে। এছাড়া এক কেজি টমেটো বিক্রি হচ্ছে ১৩০ থেকে ১৫০ টাকা। এর পরেই রয়েছে গাজর। প্রতি কেজি গাজর ১১০ থেকে ১৩০ টাকা কেজি বিক্রি হচ্ছে।

বেগুন, শসা, বরবটি, করলা, কচুর লতি, ঝিঙা, কাঁকরলের কেজিও সেঞ্চুরি স্পর্শ করেছে। বেগুনের কজি বিক্রি হচ্ছে ৮০ থেকে ১০০ টাকা। একই দামে বিক্রি হচ্ছে বরটি। করলার কেজি বিক্রি হচ্ছে ৮০ থেকে ১২০ টাকা। কচুর লতি ৮০ থেকে ১০০ টাকা বিক্রি হচ্ছে। একই দামে বিক্রি হচ্ছে ঝিড়া ও কাঁকরোল। শসার কেজি বিক্রি হচ্ছে ৬০ থেকে ১০০ টাকা।

বাজারে এখন সবচেয়ে কম দামে পাওয়া যাচ্ছে কাঁচা পেপে। প্রতি কেজি কাঁচা পেপে বিক্রি হচ্ছে ৩০ থেকে ৪০ টাকা। এছাড়া পোটল ৬০ থেকে ৭০ টাকা, ঢ্যাঁড়স ৬০ থেকে ৮০ টাকা, চিচিংগা ৬০ থেকে ৭০ টাকা, ধুন্দল ৬০ থেকে ৮০ টাকা, মিষ্টি কুমড়া ৪০ থেকে ৬০ টাকা কেজি বিক্রি হচ্ছে। লাউয়ের পিস বিক্রি হচ্ছে ৫০ থেকে ৭০ টাকা, কাঁচা কলার হালি বিক্রি হচ্ছে ৪০ থেকে ৫০ টাকা, এক আঁটি শাক বিক্রি হচ্ছে ১৫ থেকে ২০ টাকা।

এদিকে, বাজারে বয়লার মুরগির কেজি বিক্রি হচ্ছে ১৯০ থেকে ২০০ টাকা। আর সোনালী মুরগির কেজি বিক্রি হচ্ছে ৩০০ থেকে ৩২০ টাকা কেজি। বাজারে কাঁচা মরিচের দামও চড়া। এক পোয়া (২৫০ গ্রাম) কাঁচামরি বক্রি হচ্ছে ৫০ থেকে ৬০ টাকা। তবে এক কেজি নিলে ১৮০ থেকে ২০০ টাকায় পাওয়া যাচ্ছে।

রামপুরার বাসিন্দা বেসরকারি চাকরিজীবী মো. সোহেল রানা বলেন, আগে বাজারে এসে এক কেজি করে কয়েক ধরনের সবজি কিনতাম। এখন দাম শুনেই অর্ধেক কেজি নিতে হচ্ছে। পরিবারের খরচের সঙ্গে আয় আর মিলছে না। প্রতিদিন নতুন করে হিসাব কষতে হচ্ছে।

তিনি বলেন, সব ধরনের সবজির দাম চড়া। অধিকাংশ সবজির কেজি এক’শ টাকার কাছাকাছি। এতো দামে মানুষ সবজি কিনে খাবে কি করে? মাছ-মাংসের দামও চড়া। আমাদের মতো মধ্যবিত্তদের এখন সংসার চালাতে হিমশিম খেতে হচ্ছে।

মালিবাগ হাজিপাড়ার বাসিন্দা পোশাককর্মী রুমা আক্তার বলেন, মাছ-মাংসের দাম অনেক বেশি। গরু-খাসির মাংস খাওয়া অনেক আগেই ছেড়ে দিয়েছি। মাঝে মধ্যে বয়লার মুরগি কিনে খায়। এখন বয়লার মুরগির কেজিও ২০০ টাকা হয়ে গেছে। সবজি কিনে খাবো তারও উপায় নেই। একটা টমেটো কিনতে গেলেই প্রায় ২০ টাকা লাগে। আমরা যে কিভাবে দিন কাটাচ্ছি আল্লাহ ছাড়া কেউ জানে না।

বাড্ডার রিকশাচালক আবদুল কাদেরের বলেন, দিনে যা আয় করি, তার বড় অংশ চলে যায় খাবার কিনতেই। আগে ৫০০ টাকার বাজারে কয়েকদিন চলতো। এখন একই টাকায় দুদিনের বেশি চলে না। সবজির দাম কমলে অন্তত কিছুটা স্বস্তি মিলত।

বনশ্রীর বাসিন্দা অবসরপ্রাপ্ত ব্যাংক কর্মকর্তা শাহীন আহমেদ বলেন, মূল্যস্ফীতির কারণে জীবনযাত্রার ব্যয় অনেক বেড়েছে। তার ওপর সবজির এমন দাম মধ্যবিত্তদের জন্য নতুন চাপ তৈরি করেছে। স্বাস্থ্যকর খাবার খেতে হলেও এখন আলাদা করে বাজেট করতে হচ্ছে।

তিনি বলেন, ব্যবসায়ীরা নানান অজুহাতে জিনসপত্রের দাম বাড়িয়ে দেয়। সরকারের উচিত নিয়মিত বাজারে মনটিরিং করা। বাজারে কার্যকর মনিটরিং নেই বলেই দাম হুটহাঁট বাড়ছে। বাজারে মনিটরিং জোরদার করলে দাম অবশ্যই কিছুটা হলেও কমবে।

খুচরা বিক্রেতারা বলছে, দাম বাড়ার জন্য তারা দায়ী নন। পাইকারি বাজার থেকেই বেশি দামে সবজি কিনতে হচ্ছে। পরিবহন ব্যয়, সরবরাহ কমে যাওয়া ও মৌসুমি প্রভাব মিলিয়েই দাম বেড়েছে।

রামপুরা বাজারের সবজি বিক্রেতা মো. আলমগীর বলেন, আমরা যে দামে কিনি, তার চেয়ে সামান্য লাভেই বিক্রি করি। ক্রেতারা মনে করেন আমরা ইচ্ছা করে দাম বাড়াই। কিন্তু পাইকারি বাজারেই সবকিছুর দাম বেশি। দাম বেশি হওয়ার কারণে আমাদেরও বিক্রি কমে গেছে। আগে যারা কেজি কেজি সবজি কিনতে, এখন তাদের অনেকেই আধাকেজি বা তারও কম কিনছেন।

মালিবাগ হাজিপাড়ার বিক্রেতা সাইফুল ইসলাম বলেন, বৃষ্টি ও বিভিন্ন এলাকা থেকে সরবরাহ কম থাকায় বাজারে পর্যাপ্ত সবজি আসছে না। কম সরবরাহের কারণে পাইকারি দাম বাড়ছে, তার প্রভাব খুচরা বাজারেও পড়ছে।

বনশ্রীর বিক্রেতা আবদুল জলিল বলেন, ক্রেতারা দাম নিয়ে প্রতিদিন অভিযোগ করেন। কিন্তু বিক্রি কমে যাওয়ায় আমরাও সমস্যায় আছি। দাম বেশি হলে মানুষ কম কেনেন, এতে আমাদের লাভও কমে যায়। বিক্রি কম হওয়ায় আমাদেরও কষ্ট করে সংসার চলাতে হচ্ছে।

সম্পর্কিত খবর