পোশাক খাতে কমেছে ৪০ হাজার চাকরি : বিজিএমইএ সভাপতি

দেশের তৈরি পোশাক খাতে গত দুই বছরে বিভিন্ন কারণে শতাধিক কারখানা বন্ধ হয়েছে। এর ফলে প্রায় ৪০ হাজার কর্মসংস্থান কমেছে বলে জানিয়েছেন বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতির (বিজিএমইএ) সভাপতি মাহমুদ হাসান খান।

মঙ্গলবার (৪ আগস্ট) রাজধানীর গুলশান ক্লাবে ‘বাংলাদেশ ইন্টারন্যাশনাল টেক্সটাইল অ্যান্ড অ্যাপারেল মেশিনারি এক্সিবিশন (বিটমা)’ আয়োজন উপলক্ষে বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস অ্যাসোসিয়েশন (বিটিএমএ) ও বিজিএমইএর মধ্যে অনুষ্ঠিত সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) সই অনুষ্ঠানে এ কথা জানান মাহমুদ হাসান খান।

মাহমুদ হাসান খান বলেন, শিল্পে নিয়মিত কিছু কারখানা বন্ধ হয়, আবার নতুন কারখানাও চালু হয়- এটি একটি স্বাভাবিক ও চলমান প্রক্রিয়া। তবে শিল্পের প্রকৃত অগ্রগতি মূল্যায়নে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো কর্মসংস্থান বাড়ছে নাকি কমছে।

বিজিএমইএ সভাপতি বলেন, সম্প্রতি প্রায় ১৩৯টি নতুন কারখানা শিল্পে যুক্ত হয়েছে। এটি কোনো ব্যতিক্রমী ঘটনা নয়। তবে গত দুই বছরে যেসব কারখানা বন্ধ হয়েছে, সেগুলোর কারণে প্রায় ৪০ হাজার কর্মসংস্থান কমে গেছে। স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক নানা চ্যালেঞ্জের কারণে এসব কারখানা বন্ধ হয়েছে।

তিনি বলেন, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ, যুক্তরাষ্ট্রের ট্যারিফ নীতি, দেশের নির্বাচনকে ঘিরে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অনিশ্চয়তা, বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব দক্ষতার ঘাটতি এবং ব্যাংকগুলোর হঠাৎ নীতিগত পরিবর্তন— সব মিলিয়েই কিছু কারখানা সংকটে পড়েছে।

ইতিবাচক দিক তুলে ধরে মাহমুদ হাসান খান বলেন, কিছু কারখানা বন্ধ হলেও নতুন কারখানা চালু হচ্ছে এবং সামগ্রিক রপ্তানি প্রবৃদ্ধিও মোটামুটি স্থিতিশীল রয়েছে। যেসব শ্রমিক চাকরি হারিয়েছেন, তাদের অধিকাংশই এরই মধ্যে অন্য কারখানায় যোগ দিয়েছেন। কেউ দেশের বাইরে চাকরি নিয়েছেন, আবার কেউ অন্য পেশায় চলে গেছেন।

বর্তমান গ্যাস সংকটকে তৈরি পোশাকশিল্পের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে উল্লেখ করে বিজিএমইএ সভাপতি বলেন, গত দুই সপ্তাহ ধরে চলমান জ্বালানি সংকটে উৎপাদন সক্ষমতা ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ কমে গেছে।

তিনি বলেন, সরকার জানিয়েছে, আগামী ৮ বা ৯ আগস্ট থেকে পরিস্থিতির উন্নতি শুরু হবে। এ সংকটে আর্থিক ক্ষতি তো হয়েছেই, তবে তার চেয়েও বড় উদ্বেগ হলো— আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের আস্থা যেন ক্ষুণ্ন না হয়। এ কারণে বাংলাদেশে কার্যরত আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের সংগঠন বায়ার্স ফোরামের সঙ্গে বৈঠক করা হচ্ছে। বর্তমান পরিস্থিতি তাদের জানানো, তাদের প্রত্যাশা বোঝা এবং কীভাবে ক্ষতি কাটিয়ে ওঠা যায়, তা নিয়ে আলোচনা হবে।

জুলাই মাসে রপ্তানি কিছুটা কমেছে বলে উদ্বিগ্ন হওয়ার কারণ নেই। কারণ চলতি বছরের জুলাইয়ের রপ্তানি তুলনা করা হচ্ছে ২০২৫ সালের জুলাইয়ের সঙ্গে, যা বাংলাদেশের পোশাকশিল্পের ইতিহাসে সর্বোচ্চ রপ্তানির মাস ছিল।

মাহমুদ হাসান খান বলেন, চলতি বছরের জুলাইয়ে ৩ দশমিক ৮৯ বিলিয়ন ডলারের রপ্তানি হয়েছে। এটিকে ১২ মাসের হিসাবে বিবেচনা করলে বার্ষিক রপ্তানি প্রবৃদ্ধি ২০ শতাংশের বেশি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। তবে পুরো বছর একই ধারা অব্যাহত থাকবে বলে মনে করছে না বিজিএমইএ। কারণ জ্বালানি সংকটসহ বিভিন্ন বাস্তব চ্যালেঞ্জ রয়েছে।

তিনি বলেন, গত বছরের তুলনায় অন্তত ১০ শতাংশ রপ্তানি প্রবৃদ্ধি অর্জনই বিজিএমইএর প্রাথমিক লক্ষ্য। অন্যদিকে, রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো (ইপিবি) ও বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ১৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। ১৫ শতাংশ অর্জিত হলে তা অবশ্যই ইতিবাচক হবে।

বিজিএমইএ সভাপতি বলেন, বর্তমান জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় আধুনিক ও জ্বালানি সাশ্রয়ী প্রযুক্তিতে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। বিটমার মূল উদ্দেশ্য হলো আধুনিক প্রযুক্তি ও জ্বালানি-সাশ্রয়ী যন্ত্রপাতি দেশে নিয়ে আসা।

তিনি বলেন, শুধু মেশিন বিক্রি করে চলে গেলে হবে না; প্রযুক্তি স্থানান্তরের পাশাপাশি বাংলাদেশেই স্পেয়ার পার্টস উৎপাদনের কারখানা স্থাপন করতে হবে।

মাহমুদ হাসান খান বলেন, দেশের অনেক শিল্পপ্রতিষ্ঠান ২০ থেকে ২৫ বছর ধরে চলছে। এসব কারখানায় বিএমআরইর (ব্যালান্সিং, মডার্নাইজেশন, রিহ্যাবিলিটেশন অ্যান্ড এক্সপানশন) মাধ্যমে পুরোনো যন্ত্রপাতি পরিবর্তন প্রয়োজন। নতুন মেশিন কেনা মানেই নতুন কারখানা নয়; অনেক ক্ষেত্রে পুরোনো যন্ত্রাংশ পরিবর্তন করেই উৎপাদন দক্ষতা বাড়ানো সম্ভব।

তিনি উদাহরণ দিয়ে বলেন, পুরোনো মোটরের পরিবর্তে আধুনিক জ্বালানি-সাশ্রয়ী মোটর ব্যবহার করলে বিনিয়োগের অর্থ ফেরত আসতে পারে মাত্র ১ দশমিক ৮ বছরে।

সম্পর্কিত খবর