টেকসই প্রবৃদ্ধিতে সহজ অর্থায়নের তাগিদ
দেশের বেসরকারি খাতের টেকসই প্রবৃদ্ধি নিশ্চিত করতে অর্থায়ন ব্যবস্থাকে আরও কার্যকর, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও ব্যবসাবান্ধব করার আহ্বান জানিয়েছেন নীতিনির্ধারক, ব্যাংকার ও ব্যবসায়ী নেতারা।
তাদের মতে, ব্যাংকঋণের ওপর অতিনির্ভরতা কমিয়ে দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়নের নতুন উৎস তৈরি, ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের (এসএমই) জন্য ঋণপ্রাপ্তি সহজ করা এবং আর্থিক খাতে প্রয়োজনীয় সংস্কার এখন সময়ের দাবি।
সোমবার (২৭ জুলাই) রাজধানীর গুলশানে মেট্রোপলিটন চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (এমসিসিআই) কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত এক গোলটেবিল বৈঠকে এসব মতামত উঠে আসে।
‘অ্যাকসেস টু ফাইন্যান্স ইন বাংলাদেশ: বিল্ডিং আ মোর কনডুসিভ ফাইন্যান্সিয়াল সিস্টেম ফর দ্য প্রাইভেট সেক্টর’ শীর্ষক এ আয়োজন যৌথভাবে করে পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশ ও এমসিসিআই। এতে সহযোগিতা করে অস্ট্রেলিয়া সরকারের ডিপার্টমেন্ট অব ফরেন অ্যাফেয়ার্স অ্যান্ড ট্রেড।
আলোচনায় বাংলাদেশ বিজনেস ইনডেক্স (বিবিএক্স) ২০২৪-২৫-এর ফলাফল তুলে ধরা হয়। এতে দেখা যায়, মূল্যায়িত ১১টি সূচকের মধ্যে ‘অর্থায়নে প্রবেশাধিকার’ সবচেয়ে কম স্কোর পেয়েছে। এ সূচকে স্কোর ১০০-এর মধ্যে ৪০.৭। যদিও আগের বছরের তুলনায় ১২ পয়েন্ট উন্নতি হয়েছে, তবুও এটি ব্যবসা পরিবেশের অন্যতম বড় প্রতিবন্ধক হিসেবে রয়ে গেছে।
অনুষ্ঠানের শুরুতে স্বাগত বক্তব্য দেন এমসিসিআইর সেক্রেটারি জেনারেল ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) ফারুক আহমেদ। মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন প্রাইসওয়াটারহাউসকুপারস (পিডব্লিউসি) বাংলাদেশের কান্ট্রি ম্যানেজিং পার্টনার শামস জামান।
তিনি বলেন, খেলাপি ঋণের কার্যকর নিষ্পত্তি এবং ব্যাংকিং খাতে আস্থা পুনর্গঠন জরুরি। একই সঙ্গে শুধু ব্যাংকনির্ভর অর্থায়নের বাইরে গিয়ে দীর্ঘমেয়াদি মূলধনের উৎস তৈরি এবং ক্রেডিট গ্যারান্টি ব্যবস্থাকে একটি স্বায়ত্তশাসিত ও পেশাদার প্রতিষ্ঠানে রূপ দেওয়ার প্রয়োজন রয়েছে।
পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশের চেয়ারম্যান ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) ড. এম মাসরুর রিয়াজের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠিত প্যানেল আলোচনায় অংশ নেন শাশা ডেনিমস লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক শামস মাহমুদ, আমেরিকান চেম্বার অব কমার্স ইন বাংলাদেশের (অ্যামচেম) সভাপতি সৈয়দ মোহাম্মদ কামাল, ব্র্যাক ব্যাংকের অতিরিক্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও এসএমই ব্যাংকিং বিভাগের প্রধান সৈয়দ আবদুল মোমেন এবং এইচএসবিসি বাংলাদেশের বহুজাতিক হোলসেল ব্যাংকিং বিভাগের প্রধান আন্দালিব মির্জা।
আলোচনায় শামস মাহমুদ বলেন, মহামারি-পরবর্তী পরিস্থিতি ও রাজনৈতিক অস্থিরতার প্রভাব এখনো পুরোপুরি কাটেনি। এর সঙ্গে গ্যাসের মূল্যবৃদ্ধির কারণে উৎপাদন খাতে অর্থায়ন ও নগদ প্রবাহের সংকট আরও বেড়েছে।
সৈয়দ মোহাম্মদ কামাল বলেন, বড় প্রতিষ্ঠানের তুলনায় এসএমই খাত এখনো প্রাতিষ্ঠানিক অর্থায়নে পিছিয়ে। এ সমস্যা সমাধানে বাংলাদেশ ব্যাংক, বিচার বিভাগসহ সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন।
সৈয়দ আবদুল মোমেন বলেন, এসএমই ঋণ সম্প্রসারণে শক্তিশালী ডিজিটাল অবকাঠামো গড়ে তোলা জরুরি। বর্তমানের অধিকাংশ ম্যানুয়াল পদ্ধতি অকার্যকর ও সময়সাপেক্ষ।
আন্দালিব মির্জা বলেন, বিশেষ করে তৈরি পোশাক খাতের বাইরে থাকা প্রতিষ্ঠানের জন্য পর্যাপ্ত ডিজিটাল তথ্য ও আর্থিক যাচাইয়ের সীমাবদ্ধতা অর্থায়নের বড় বাধা হয়ে রয়েছে।
গোলটেবিলে অংশ নেওয়া ব্যাংক, আর্থিক প্রতিষ্ঠান ও উন্নয়ন সহযোগীদের প্রতিনিধিরা বলেন, নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস ও জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত না হলে নতুন শিল্প প্রকল্পে ব্যাংকগুলো অর্থায়নে আগ্রহী হবে না। তাই গ্যাস ও এলএনজি অবকাঠামোর উন্নয়ন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একই সঙ্গে ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের ঋণ বিতরণে ইতিবাচক অগ্রগতি এবং তুলনামূলক কম খেলাপি ঋণের বিষয়টিও তুলে ধরা হয়।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ নুরুল আমিন বলেন, দেশের আঞ্চলিক, লিঙ্গভিত্তিক, আর্থিক ও মানসিক বৈষম্য বিবেচনায় নিয়ে ঋণগ্রহীতাদের জন্য প্রয়োজনভিত্তিক পৃথক নীতি প্রণয়ন করা উচিত।
সভাপতির বক্তব্যে এমসিসিআই সভাপতি কামরান টি রহমান বলেন, ঋণের সহজপ্রাপ্যতা বাড়াতে বাংলাদেশ ব্যাংক, আর্থিক প্রতিষ্ঠান, নীতিনির্ধারক এবং বেসরকারি খাতের মধ্যে কার্যকর সমন্বয় জোরদার করতে হবে।
আলোচনা শেষে অংশগ্রহণকারীরা বাস্তবভিত্তিক সংস্কার, অংশীজনদের মতামতকে গুরুত্ব দেওয়া এবং সরকারি-বেসরকারি সংলাপ অব্যাহত রাখার ওপর গুরুত্বারোপ করেন। তাদের মতে, এসব সুপারিশ বাস্তবায়িত হলে বাংলাদেশের বেসরকারি খাতের জন্য আরও অন্তর্ভুক্তিমূলক, কার্যকর ও প্রবৃদ্ধিবান্ধব আর্থিক ব্যবস্থা গড়ে তোলা সম্ভব হবে।


