২০২৫-২৬ অর্থবছরে মূল্যস্ফীতি
উচ্চ মূল্যস্ফীতি রেখেই শেষ হলো অর্থবছর
উচ্চ মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে কেন্দ্রীয় ব্যাংক চার বছর ধরে সংকোচনমুখী মুদ্রানীতি প্রণয়ন করলেও তা সফল হয়নি। গত কয়েক বছরের তুলনায় মূল্যস্ফীতি খানিকটা কমানো গেলেও এখনো দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর তুলনায় তা অনেক বেশি। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্যমতে, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে গড় মূল্যস্ফীতি ছিল ৮ দশমিক ৬৮ শতাংশ। গত জুনে পয়েন্ট টু পয়েন্ট ভিত্তিতে সার্বিক মূল্যস্ফীতি ছিল ৯ দশমিক ১৬ শতাংশ, যা ২০২৫ সালের জুনের তুলনায় দশমিক ৬৮ শতাংশ বেশি। ওই বছরের জুনে মূল্যস্ফীতি ছিল ৮ দশমিক ৪৮ শতাংশ।
২০২৪-এর গণ-অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নিয়ে মূল্যস্ফীতির লাগাম টানার উদ্যোগ নেয়। মূল্যস্ফীতি কমিয়ে আনতে নীতি সুদহার বাড়িয়ে ১০ শতাংশ করা হয়। ওই বছরের আগস্টে মূল্যস্ফীতি ছিল ১০ দশমিক ৪৯ শতাংশ। ওই বছরের পাঁচ মাসে মূল্যস্ফীতি ১০ শতাংশের ওপরে থাকলেও ২০২৫-এর জানুয়ারিতে নেমে আসে ৯ দশমিক ৯৪ শতাংশে। এরপর টানা কয়েক মাস মূল্যস্ফীতি নিম্নমুখী থাকলেও নভেম্বরে আবারো বাড়তে শুরু করে। সর্বশেষ গত ফেব্রুয়ারিতে আবারো ৯ শতাংশের ঘরে পৌঁছায়। চলতি বছরের জানুয়ারিতে মূল্যস্ফীতি ছিল ৮ দশমিক ৫৮ শতাংশ। ফেব্রুয়ারিতেএরপর » পৃষ্ঠা ৯ কলাম ৫
৯ দশমিক ১৩, মার্চে ৮ দশমিক ৭১, এপ্রিলে ৯ দশমিক শূন্য ৪ ও মে মাসে ছিল ৯ দশমিক ৪২ শতাংশ।
তবে অর্থনীতিবিদ ও ব্যাংকারদের মতে, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে বাংলাদেশ ব্যাংকের মুদ্রানীতি তেমন প্রভাব ফেলতে পারে না। তারা বলেন, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে ঘোষিত মুদ্রানীতি তেমন কোনো ভূমিকাই রাখতে পারছে না। মুদ্রানীতিতে যেসব লক্ষ্য নির্ধারণ করা হচ্ছে, সেগুলোও অর্জিত হচ্ছে না। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ ও বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ বাড়াতে সরকারকেই এখন মূল ভূমিকা রাখতে হবে।
গত ২০২৫-২৬ অর্থবছরের শেষ দিকে অর্থাৎ এপ্রিলে ইরান যুদ্ধের প্রভাব পড়ে জ্বালানিতে। যুদ্ধ ও বিশ্ববাজারে জ্বালানি পণ্যের মূল্যবৃদ্ধির ধাক্কা মোকাবেলায় এপ্রিল ও মে মাসে মাঝামাঝি দেশে জ্বালানির মূল্য সমন্বয় করতে গিয়ে দুই দফায় দাম বাড়ানো হয়। এতে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ে ১৮ শতাংশ। মে মাসের শেষ সপ্তাহে বিদ্যুতের দাম বাড়ানো হয়। ফলে মূল্যস্ফীতির চাপ বেড়েছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। তাদের মতে, সামগ্রিক বৈশ্বিক ও স্থানীয় জ্বালানি পরিস্থিতির প্রভাব পড়েছে দেশের মূল্যস্ফীতিতে। এপ্রিল ও মে মাসে জ্বালানি ও বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর ফলে পরিবহন খরচ বেড়েছে, যার প্রভাবে খাদ্য ও খাদ্যবর্হিভূত পণ্যের দাম বেড়েছে। বাজারে পণ্যের দাম বাড়লে সেটির প্রভাব নিম্ন ও মধ্যবিত্তের ওপর পড়ে।
বেসরকারি গবেষণা সংস্থা পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশের চেয়ারম্যান এম মাসরুর রিয়াজ বলেন, ‘মূল্যস্ফীতি এখনো উচ্চ পর্যায়ে রয়েছে। ডিসেম্বর থেকে সেটি আবারো ঊর্ধ্বমুখী, তিন বছর ধরে এটি বাড়ছে। এখন কিছুটা কমে এলেও উচ্চমাত্রায় রয়ে গেছে। যার কারণে মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমেছে, জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়েছে এবং ব্যবসার খরচ বেড়েছে। এটা চলতে থাকলে একসময় টাকার অবমূল্যায়ন শুরু হবে। সরকার নীতি সুদহার উচ্চ রেখেছে সেটা দরকার ছিল, কিন্তু একমাত্র সেটা দিয়ে হবে না। গত কয়েক মাসে মূল্যস্ফীতি আবার বাড়ার কারণ হচ্ছে বাজারের চাহিদার তুলনায় সরবরাহ ঘাটতি। সামনের দিনে মূল্যস্ফীতি কমাতে হলে আরো একটা পিরিয়ড সুদহার রাখতে হবে, মনিটরিং পলিসি শক্ত করতে হবে এবং বাজারে সরবরাহ বাড়াতে হবে।’
বিবিএসের তথ্য অনুসারে, দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি ও বাজার ব্যবস্থাপনার দুর্বলতায় ২০২২ সালের পরই দেশে মূল্যস্ফীতি বাড়তে শুরু করে। ওই সময় ডলার সংকট শুরু হলে টাকার অবমূল্যয়ন ঘটে। প্রতি ডলার ৮৪ থেকে বেড়ে মাত্র আড়াই বছরে ১২০ টাকা ছাড়িয়ে যায়, বর্তমানে যা ১২৩ টাকার বেশি। ওই বছরের পর দেশের মূল্যস্ফীতি আর নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হয়নি। পাঁচ বছরের মধ্যে ২০২১-২২ অর্থবছরে গড় মূল্যস্ফীতি ছিল ৬ দশমিক ১৫ শতাংশ। ২০২২-২৩ অর্থবছরে এক লাফে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৯ দশমিক শূন্য ৯ শতাংশে। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে মূল্যস্ফীতি ছিল ৯ দশমিক ৭৩ ও ২০২৪-২৫-এ সর্বোচ্চ ১০ দশমিক শূন্য ৩ শতাংশ। এ সময়ে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে বাংলাদেশ সফল না হলেও বিশ্বের বেশির ভাগ দেশ সফল হয়েছে। গত বছর মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে বিপুল সফল্য দেখিয়েছে দক্ষিণ এশিয়ার দেশ ভারত, শ্রীলংকা ও নেপাল।
তবে ইরান যুদ্ধের কারণে বৈশ্বিক পরিস্থিতি বিবেচনায় আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) দেয়া বাংলাদেশের মূল্যস্ফীতির পূর্বাভাস এবার কিছুটা হলেও এড়ানো গেছে। গেল এপ্রিলে আইএমএফ ৮ দশমিক ৭ শতাংশের পূর্বাভাস বাড়িয়ে ৯ দশমিক ২ শতাংশ হতে পারে বললেও কিছুটা কমাতে পেরেছে বাংলাদেশ। এর আগে বিশ্বব্যাংক ও এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক (এডিবি) গড় মূল্যস্ফীতি ৮ দশমিক ৫ শতাংশ থাকার পূর্বাভাস দিলেও বছর শেষে মূল্যস্ফীতি ছিল ৮ দশমিক ৬৮ শতাংশ।
মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে সরকারের পদক্ষেপ ব্যর্থ হয়েছে বলে মনে করেন ইনস্টিটিউট ফর ইনক্লুসিভ ফাইন্যান্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের (আইএনএম) নির্বাহী পরিচালক ড. মোস্তফা কে মুজেরী। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, ‘মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে বাংলাদেশ ব্যাংক গত কয়েক বছর নীতি সুদহার বাড়ালেও ফলাফল একেবারেই সন্তোষজনক নয়। তিন-চার বছর ধরে বাংলাদেশে এ নীতি ব্যর্থ হয়েছে। বিরাজমান পরিস্থিতিতে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ ও বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ বাড়াতে সরকারকেই এগিয়ে আসতে হবে। এক্ষেত্রে রাজস্ব নীতি, বাজার ও সরবরাহ ব্যবস্থার সংস্কার লাগবে। অন্যথায় চাহিদা নিয়ন্ত্রণের মুদ্রানীতি কোনো কাজে আসবে না। আর বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ বাড়াতে হলে সবার আগে জ্বালানি নিরাপত্তা ও আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি করতে হবে।’
বিশ্ববাজারে খাদ্যপণ্যের দাম কমলেও বাংলাদেশের বাজারে এখনো প্রায় সব পণ্যের দাম ঊর্ধ্বমুখী। বাজারসংশ্লিষ্টরা বলছেন, জ্বালানির দাম বাড়ার সঙ্গে প্রায় সব পণ্যের দাম বেড়েছে। পরিবহন খরচ বেড়ে যাওয়া তার প্রভাব পড়েছে পণ্যে। পণ্যের দামের সঙ্গে পরিবহন ব্যয় সমন্বয় করছেন ব্যবসায়ীরা। আবার সরকার দুই দফায় বিদ্যুৎ ও তেলের দাম বাড়ানোর কারণেও বাজারে এর প্রভাব পড়েছে।’
বিবিএসের তথ্যমতে, গত জুনে খাদ্য মূল্যস্ফীতি কমে হয়েছে ৮ দশমিক ৬০ শতাংশ। বাজারে খাদ্যপণ্যের দাম ঊর্ধ্বমুখী থাকলেও মূল্যস্ফীতি কমার তথ্য দেয় বিবিএস। মে মাসে খাদ্য মূল্যস্ফীতি ছিল ৯ দশমিক শূন্য ৬ শতাংশ। অন্যদিকে খাদ্যবহির্ভূত মূল্যস্ফীতিও কমেছে। জুনে এ খাতে মূল্যস্ফীতি ছিল ৯ দশমিক ৬১ ও মে মাসে ৯ দশমিক ৭১ শতাংশ।
এদিকে গ্রাম ও শহরেও মূল্যস্ফীতি কমেছে। গ্রামে জুনে মূল্যস্ফীতি ছিল ৯ দশমিক ২৩ ও শহরে ৯ দশমিক শূন্য ১ শতাংশ। শহর ও গ্রামে খাদ্য, খাদ্যবহির্ভূত খাতে মূল্যস্ফীতি কমেছে। দেশে কয়েক মাস ধরে মূল্যস্ফীতি বাড়লেও বাড়ছে না মজুরির হার। গত জুনে শ্রমের মজুরি মে মাসের তুলনায় কমেছে। জুনে মজুরির হার ছিল ৮ দশমিক ১৮ শতাংশ। মে মাসে এ হার ছিল ৮ দশমিক ২১ শতাংশ।
মূল্যস্ফীতি নিয়ে বিবিএস বরাবর অতিরঞ্জিত তথ্য দেয় এমন অভিযোগ থাকলেও আগের তুলনায় চাপমুক্ত তথ্য দিতে পারছে বলে দাবি বিবিএসের। সংস্থাটির অফিস ন্যাশনাল অ্যাকাউন্টিং উইংয়ের পরিচালক (ভারপ্রাপ্ত) মো. সাহাবুদ্দীন সরকার বলেন, ‘৬৪ জেলার ১৫৪টি হাটবাজারের তথ্য নিয়ে মূল্যস্ফীতির হিসাব তৈরি করা হয়। এখানে আগের মতো কোনো চাপ নেই। শতভাগ সত্য তথ্য দিতে পারছি। এসব তথ্যকে আরো সঠিক ও নির্ভরযোগ্য করতে সরকার নানামুখী উদ্যোগ নিচ্ছে। আশা করি আগামীতে এর সুফল দেখা যাবে।’
মূল্যস্ফীতির তথ্য বাস্তবসম্মত ও বিশ্বাসযোগ্য করতে সরকার কারিগরি কমিটি গঠন করছে বলে জানান পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী জোনায়েদ আবদুর রহিম সাকি। সম্প্রতি বিবিএসের এক অনুষ্ঠানে তিনি বলেন, ‘পরিসংখ্যান নিয়ে মানুষের মধ্যে আস্থার ঘাটতি তৈরি হয়েছে। সেই আস্থা ফিরিয়ে আনতে সঠিক ও বিশ্বাসযোগ্য তথ্য উপস্থাপন করতে হবে। মূল্যস্ফীতি পরিমাপের ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ও আধুনিক পদ্ধতি গ্রহণের পরিকল্পনা রয়েছে, যাতে সিপিআই (ভোক্তা মূল্য সূচক) সাধারণ ভোক্তাদের প্রকৃত ব্যয় কাঠামো আরো ভালোভাবে তুলে ধরতে পারে।’


