ইটভাটা গিলে ফেলেছে আবাদি জমি, হুমকিতে পরিবেশ
নীলফামারীর সৈয়দপুর উপজেলায় যেখানে সেখানে গড়ে উঠেছে ইটভাটা। ইটের জন্য আশপাশের মাটি কাটতে কাটতে আবাদি জমি দিনের পর দিন কমে যাচ্ছে। এমনটি চলতে থাকলে অচিরেই ফসল উৎপাদন বন্ধ হয়ে এলাকায় খাদ্য সংকট দেখা দেবে বলে আশঙ্কা স্থানীয় কৃষকদের।
কৃষিজমি গ্রাস করে গড়ে উঠছে অসংখ্য ইটভাটা। ভাটাগুলোর বিষাক্ত ধোঁয়া চারপাশ ছড়িয়ে পরিবেশ দূষণ করছে। এ ছাড়া অবৈধভাবে জমির উর্বর মাটি কেটে মিল-কারখানায় বিক্রি করা হচ্ছে। এতে কমছে আবাদি জমি ও ফসল। যার বিরূপ প্রভাব পড়ছে খাদ্যভাণ্ডার ও পরিবেশ-প্রকৃতিতে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, এ উপজেলায় ৩১টি ইটভাটা রয়েছে। যার অধিকাংশই অপরিকল্পিত। এসব ইটভাটার মাটির চাহিদা পূরণ করতে মাটি ব্যবসায়ীরা নিয়মনীতি উপেক্ষা করে উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় আবাদি জমির মাটি কেটে ভাটাগুলোতে সরবরাহ করছে।
অবৈধভাবে কৃষিজমির মাটি কেটে ইটভাটাসহ মিলকারখানায় দেওয়ার ফলে শত শত বিঘা জমির চাষাবাদ বন্ধ হয়ে গেছে। দায়িত্বশীল ব্যক্তিরা এবং প্রশাসনের চোখের সামনেই বছরের পর বছর ধরে ভাটার মাটির চাহিদা পূরণ করতে ফসলি জমি বিনষ্টের ধারা অব্যাহত রয়েছে।
সরেজমিন উপজেলার কামারপুকুর, বোতলাগাড়ী, কাশিরাম বেলপুকুর, খাতামধুপুর ও বাঙালিপুর ইউনিয়নের বিভিন্ন এলাকায় ফসলি জমি বিনষ্টের চিত্র চোখে পড়ে। বেশ কিছু কৃষকের সঙ্গে কথা হলে তারা জানান, দুই ফসলি জমির মাঠ রয়েছে এই এলাকায়। জমিগুলোতে প্রতিবছর সরিষা ও বোরো ধান আবাদ করা হয়। একশ্রেণির অসৎ ব্যবসায়ী জমির মালিক কৃষকদের ফুঁসলিয়ে জমির মাটি নিয়ে যাচ্ছে।
বোতলাগাড়ী ইউনিয়নের মতিয়ার রহমান নামে আরেক কৃষক বলেন, দুই বিঘা জমিতে সরিষার আবাদ করেছি। আমার পার্শ্ববর্তী জমিতে ভেকু দিয়ে গভীর গর্ত করে মাটি কেটে ট্রাকে ভর্তি করে নিয়ে যাচ্ছেন এক মাটি ব্যবসায়ী। এ মাটি তিনি বেশি মূল্য দিয়ে কিনেছেন। এতে আমার ফসলি জমিও বিনষ্টের পথে। অবৈধভাবে মাটি কর্তনকারীদের আইনগত ব্যবস্থাগ্রহণের দাবি জানান তিনি।
ইট প্রস্তত ও ভাটা স্থাপন নিয়ন্ত্রণ আইন ২০১৩-তে বলা আছে, আবাসিক এলাকা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, হাটবাজার ও ফসলি জমির এক কিলোমিটারের মধ্যে ইটভাটা স্থাপন করা যাবে না। কিন্তু কাগজের নিয়মনীতির সঙ্গে বাস্তবের চিত্রের মিল পাওয়া যায়নি।
স্থানীয় প্রশাসনের সূত্রমতে, সৈয়দপুর উপজেলায় ৩১টি ইটভাটা রয়েছে। এর মধ্যে কামারপুকুর ইউনিয়নে ১৬টি, বোতলাগাড়ী ইউনিয়নে ৬টি, খাতামধুপুর ইউনিয়নে ৫টি বাঙালিপুর ইউনিয়নে ৪টি ইটভাটা রয়েছে।
ইটভাটা মালিক মোস্তফা ফিরোজ জানান, আমরা সরকারি নিয়মনীতি মেনে ইটভাটা করেছি। অবৈধ ইটভাটা থাকলে প্রশাসন সে ব্যাপারে ব্যবস্থা নেবেন।
এ প্রসঙ্গে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা শামীম হুসাইন বলেন, সরকারি নিয়ম রয়েছে এক কিলোমিটার পর পর ইটভাটা স্থাপন করতে হবে; কিন্তু অত্র এলাকায় বেশিরভাগ ইটভাটাই কোনো নিয়মনীতি না মেনে তৈরি করেছে। খুব শিগগির এসব অবৈধ ইটভাটায় অভিযান পরিচালনা করা হবে।
সৈয়দপুর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ শাহিনা বেগম বলেন, ইটভাটার কারণে ফসলি জমির ব্যাপক ক্ষতি হচ্ছে। তাই কৃষিজমির মাটি কাটা ও অপরিকল্পিতভাবে ইটভাটার অনুমোদন বন্ধ হওয়া উচিত।
পরিবেশ অধিদপ্তর নীলফামারী জেলা কার্যালয়ের সহকারী পরিচালক কমল কুমার বর্মণ জানান, ভাটায় ইট পোড়াতে কাঠ পোড়ানো যাবে না। কোনো কৃষিজমি নষ্ট করে ইটভাটা করা যাবে না। আইনগতভাবে এটা নিষিদ্ধ। অবৈধ ইটভাটা থাকলে সেগুলো বন্ধ করে দেওয়া হবে। এ ছাড়া ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করা হবে বলে জানান তিনি।



