একান্ত সাক্ষাতকারে আমজাদ হোসেন খান চৌধুরী
‘সরকার পুন:বীমা কোম্পানী করলে উপকৃত হতো দেশ’

আদম মালেক : জীবন বীমা খাতের রাজস্ব রক্ষায় দেশে পুন:বীমা কোম্পানী খুবই জরুরী। কিন্তু পুন:বীমা কোম্পানী গঠনের জন্য অঢেল পুঁজির প্রয়োজন যা বেসরকারী বীমা কোম্পানীগুলোর জন্য দু:সাধ্য। সরকার যদি জীবন বীমাকে প্রতিযোগি না বানিয়ে পুন:বীমা কোম্পানী হিসেবে গড়ে তুলতে চায় তাহলে সহজেই বাস্তবায়ন সম্ভব। এতে জীবন বীমা খাত উপকৃত হবে এবং রাজস্ব হারাবে না বাংলাদেশ- এমন মন্তব্য করেছেন গোল্ডেন লাইফ ইন্স্যুরেন্স লিমিটেডের মূখ্য নির্বাহী কর্মকর্তা আমজাদ হোসেন খান চৌধুরী।

আমজাদ হোসেন খান চৌধুরী বলেন, জীবন বীমার জন্য বাংলাদেশে কোনো পুন:বীমা কোম্পানী নেই। তাই পুন:বীমার জন্য বাংলাদেশের জীবন বীমা কোম্পানীগুলোকে বিদেশী কোম্পানীগুলোর দ্বারস্থ হতে হয়। এজন্য বছরের পর বছর ধরে কোম্পানীগুলোর আয়ের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ বিদেশে চলে যায়। দেশী পুন:বীমা প্রতিষ্ঠান থাকলে এভাবে রাজস্ব হারাতে হতো না।

দেশে বীমা খাতের বর্তমান অবস্থা মূল্যায়ন করতে গিয়ে তিনি অর্থবাংলাডটকমকে বলেন, প্রাকৃতিক দুর্যোগ বীমা খাতের বড় চ্যালেঞ্জ। করোনায় জীবন বীমার মেরুদন্ড ভেঙ্গে গেছে। অল্প টাকায় জীবন বীমা কোম্পানীগুলো বড় ঝুঁকি নেয়। কোভিড চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করতে হয়েছে গোল্ডেন লাইফ ইন্স্যুরেন্স কোম্পানীকেও। একটি উদাহরণ টেনে তিনি দেখিয়ে দেন, একটি কারখানায় ৪ হাজার শ্রমিক কাজ করে। স্বাভাবিক সময়ে এই কারখানার জন্য মৃত্যু দাবী পরিশোধ করতে হয়েছে ৪/৬ লক্ষ টাকা। আর গত বছর কোভিড মহামারীতে মৃত্যু দাবী শোধ করতে হয়েছে ১৫ লক্ষ টাকা যা আগের বছরের চেয়ে দ্বিগুণেরও বেশী।

অতিতে বীমা খাতে সরকারের অবহেলায় অসন্তোষ প্রকাশ করেন গোল্ডেন লাইফের এই মূখ্য নির্বাহী কর্মকর্তা। তিনি বলেন, বীমা খাত ভ্যাট ও উৎসস্থল কর ছাড়াও মুনাফার ওপর সরকারকে ৩৭ দশমিক ৫০ শতাংশ কর দেয়। অথচ অন্যান্য খাত প্রণোদনা পেলেও বীমা খাত প্রণোদনা বঞ্চিত। প্রণোদনা পেলে খাতটির ঘুরে দাঁড়ানো সহজ হতো।

বীমা খাতে দক্ষ জনশক্তি বাড়াতে তাঁর পরামর্শ হলো, ভাড়াটিয়া প্রশিক্ষক দিয়ে দক্ষ জনশক্তির ঘাটতি পুরণ করা যায় না। এজন্য দরকার নিজ্স্ব প্রশিক্ষণ কেন্দ্র। সরকারের পাশাপাশি প্রত্যেক কোম্পানীকে প্রশিক্ষণ ইউনিট গড়ে তুলতে হবে। এজেন্ট হওয়ার আগেই অনেকে বড় বীমা কর্মকর্তা হতে চায়। এই প্রবণতা বীমা শিল্পের জন্য ক্ষতিকর। দক্ষ মূখ্য নির্বাহী কর্মকর্তা হওয়ার জন্য প্রথমে এজেন্ট হতে হবে। এই বীমা ব্যক্তিত্ব কথা বলেন, বীমা দিবস পালনের গুরুত্ব প্রসঙ্গে। তিনি বলেন, আমাদের দেশের মানুষ বীমা সম্পর্কে উঁচু ধারণা পোষণ করে না। তাদের অনেকের কাছে বীমা এনজিও বা এমএলএম কোম্পানীর মতোই। কিন্তু বীমা দিবস পালন মানুষের সে ধারণা পাল্টে দেয়। সরকার প্রধান এ দিবসে প্রধান অতিথি হওয়ায় মানুষ বীমা সম্পর্কে একটি সম্মানজক ধারণা পোষণ করতে শুরু করেছে। তবে একটি আশার বাণী শুনিয়েছেন আমজাদ হোসেন খান চৌধুরী। বলেন, গোল্ডেন লাইফ এখন দক্ষ জনশক্তি বিনির্মাণে কাজ করছে। বীমা খাতে শিক্ষিত তরুণ আসবে, তাদের প্রশিক্ষণের জন্য যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে, এটাই আমাদের মূলমন্ত্র।

আমজাদ হোসেন খান চৌধুরী গোল্ডেন লাইফ ইন্স্যুরেন্সের স্বচ্ছতা, পরিচালনা পর্ষদ ও ব্যবস্থাপনা কমিটির সম্পর্ক নিয়ে খোলামেলা কথা বলেন। তিনি বলেন, কোম্পানীর পরিচালনা পর্ষদ ও ব্যবস্থানা পর্ষদের চমৎকার সম্পর্ক বিরাজ করছে। বোর্ডের সহযোগিতার কারণে ব্যবস্থপনা কমিটি তৎপরতা আরও বেগবান হচ্ছে। ক্ষীণ হয়ে আসছে বীমা দাবি পরিশোধ না করার অভিযোগ।

গোল্ডেন লাইফ ইন্স্যুরেন্স লিমিটেড বীমা দাবি পরিশোধ করছে না- এমন অভিযোগ অস্বীকার করে এই বীমা ব্যক্তিত্ব বলেন, আমি গোল্ডেন লাইফ ইন্স্যুরেন্সে যোগদানের পর থেকে বিপুল অংকের বীমা দাবি পরিশোধ করেছি। ২০১৯ সালে বীমা দাবি বাবদ ২১ কোটি ৩৭ লাখ ৮৬ হাজার ৭২৮ টাকা পরিশোধ করে কোম্পানীটি। ২০২০ সালে পরিশোধিত বীমা দাবির পরিমাণ বেড়ে দাঁড়ায় ২৯ কোটি ৫৬ লাখ ৭২ হাজার ১৫৯ টাকায়। চলতি বছরের সেপ্টম্বর পর্যন্ত ১০ কোটি ৬০ লাখ ২৪ হাজার ৫৫১ টাকা পরিশোধ করা হয়।

এদিকে দাবি পরিশোধের ক্ষেত্রে গ্রাহকের অসচেতনতা বিশেষ করে অসাধু বীমা কর্মিদের গ্রাহকদের ভুল বুঝিয়ে সময়ের আগেই পলিসি সমর্পন করার ফলে গ্রাহক যে ক্ষতির সম্মুখিন হচ্ছেন তার দায় গোল্ডেন লাইফ ইন্স্যুরেন্স লিমিটেড নিবে না বলে জানিয়েছেন এই মূখ্য নির্বাহী কর্মকর্তা। তিনি বলেন, গ্রাহকের অসচতেনতা ও ব্যাংকের ভুলের কারণে অনেক সময় চেক ডিজঅনার হয়। এতে বীমা কোম্পানীর দুর্নাম হয়। এই সমস্যা মোকাবেলায় আমরা উপায় বের করেছি। আগামী বছরের শুরূ থেকে গ্রাহকের টাকা নির্বাহী রশিদ প্রাপ্তি সাপেক্ষে কোম্পানীর একাউন্ট থেকে অ্যাডভাইজের মাধ্যমে গ্রাহকের একাউন্টে প্রেরণ করা হবে। গোল্ডেন লাইফ ইন্স্যুরেন্স কোম্পানীতে আবার সোনালী সু-দিন ফিরবে এই আশাব্যক্ত করেন এই বীমা বিশেষজ্ঞ।

সম্পর্কিত খবর