আন্তর্জাতিক বাজারে তীব্র হচ্ছে জ্বালানি সরবরাহ সংকট
বিশ্বজুড়ে বিদ্যুৎ উৎপাদনে সবচেয়ে বেশি ব্যবহার হয় কয়লা। চলতি বছর জ্বালানি পণ্যটির চাহিদা রেকর্ড উচ্চতায় পৌঁছার পূর্বাভাস দিয়েছিল ইন্টারন্যাশনাল এনার্জি এজেন্সি। কিন্তু সম্প্রতি ইন্দোনেশিয়া কয়লা রফতানি বন্ধ ঘোষণা করায় আন্তর্জাতিক বাজারে পণ্যটির সরবরাহ সংকট আরো প্রকট আকার ধারণ করতে পারে। ফলে নতুন করে অস্থিতিশীল হয়ে উঠতে পারে বাজার।
ইন্দোনেশিয়া বিশ্বের শীর্ষ তাপীয় কয়লা রফতানিকারক। অভ্যন্তরীণ বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোয় কয়লা সরবরাহ আশঙ্কাজনক হারে কমে যাওয়ায় চলতি সপ্তাহে জানুয়ারির জন্য জ্বালানি পণ্যটির রফতানি বন্ধ ঘোষণা করে দেশটির সরকার। এতে বড় ধরনের ধাক্কা লাগে আন্তর্জাতিক জ্বালানি পণ্যের বাজারে।
ইন্দোনেশিয়ার জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের তথ্য বলছে, দেশটির মোট জ্বালানি চাহিদার ৬০ শতাংশই পূরণ করে কয়লা। চলতি বছরের শুরুতে রাষ্ট্রায়ত্ত বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্রে (পিএলএন) মাত্র ৩৫ হাজার টন কয়লা সরবরাহ করেছেন উত্তোলকরা। ৫ জানুয়ারি পর্যন্ত পিএলএন ১ কোটি ৩৯ লাখ টন কয়লা সরবরাহ নিশ্চিত করে। কিন্তু অন্তত ২০ দিন চলার জন্য দেশটিকে আরো ৬০ লাখ টন কয়লা সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে।
পিএলএনের প্রাক্কলন অনুযায়ী, চলতি বছর প্রতিষ্ঠানটির মোট ১১ কোটি ৯০ লাখ টন কয়লা প্রয়োজন হবে। রাষ্ট্র নিয়ন্ত্রিত ব্যবসা প্রতিষ্ঠানবিষয়ক মন্ত্রণালয় জানায়, এটি পিএলএনকে সরবরাহ ব্যবস্থাপনা আরো উন্নত করার জন্য জোর দিচ্ছে। পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি সরবরাহ চুক্তি বাস্তবায়নেও কোম্পানিটিকে চাপ দেয়া হচ্ছে। ইন্দোনেশিয়া কোল মাইনারস অ্যাসোসিয়েশন জানায়, সংস্থাটির শীর্ষ ১০ সদস্য চলমান সংকট কাটাতে স্বল্পমেয়াদে পিএলএনের কাছে অতিরিক্ত কয়লা সরবরাহ করবে।
ইন্দোনেশিয়ার কো-অর্ডিনেটিং মিনিস্ট্রি ফর মেরিটাইম অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট অ্যাফেয়ার্স জানায়, সম্প্রতি কয়লা উত্তোলক ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে। দেশে যে অস্থিরতা দেখা দিয়েছিল তা কেটে গেছে। চলমান ডমিস্টিক মার্কেট অবলিগেশন নীতি নিয়ে নতুন একটি ফর্মুলা দেয়া হবে বলেও নিশ্চিত করেছে মন্ত্রণালয়টি।
ডমিস্টিক মার্কেট অবলিগেশন নীতি অনুসারে, ইন্দোনেশিয়ার কয়লা উত্তোলকদের রাষ্ট্রায়ত্ত কোম্পানির কাছে মোট বার্ষিক উত্তোলনের ২৫ শতাংশ সরবরাহ করতে হয়। আন্তর্জাতিক বাজারদরের তুলনায় অনেক কমে এসব কয়লা কিনে নেয় সরকারি প্রতিষ্ঠানটি। এক্ষেত্রে প্রতি টন কয়লার দাম পড়ে ৭০ ডলার।
তথ্য বলছে, গত বছরের শুরু থেকেই সরকার নির্ধারিত বাজার আদর্শ কয়লার রফতানি মূল্য ঊর্ধ্বমুখী হতে থাকে। নভেম্বরে এসে এটির দাম ২১৫ ডলারের গণ্ডি স্পর্শ করে। মূলত এ সময় বিশ্বজুড়ে জ্বালানি সংকট তীব্র হয়ে ওঠায় পণ্যটির বাজারদরে উল্লম্ফন দেখা দেয়।
চলতি সপ্তাহে কয়লা উত্তোলক ও বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের মধ্যে অনুষ্ঠিত বৈঠকের তথ্য অনুযায়ী, গত বছর ৪১৮টি কয়লা উত্তোলন প্রতিষ্ঠান স্থানীয় নিয়ন্ত্রণ সংস্থাগুলোর কাছে কোনো কয়লাই বিক্রি করেনি। ডমিস্টিক মার্কেট অবলিগেশন নীতি অনুসরণে ব্যর্থ হওয়ায় আগস্টে জ্বালানি মন্ত্রণালয় কয়েক ডজন উত্তোলকের রফতানি অনুমোদন বাতিল করে।
বাহানা সিকিউরিটিজ রিসার্চ এক নোটে জানায়, যত দিন পর্যন্ত আন্তর্জাতিক বাজারদর ও ডমিস্টিক মার্কেট অবলিগেশন নীতির আওতায় দামের তারতম্য কমবে না, তত দিন সরকার ও দেশের ক্ষুদ্র কয়লা উত্তোলকদের মধ্যে নীরব যুদ্ধ চলতেই থাকবে।
পণ্যবাহী জাহাজের তথ্য সেবাদাতা প্রতিষ্ঠান কেপলার জানায়, চীন, ভারত ও দক্ষিণ কোরিয়া মূলত ইন্দোনেশীয় কয়লার প্রধান ক্রেতা। বিদায়ী বছর ইন্দোনেশিয়ার মোট রফতানীকৃত কয়লার ৭৩ শতাংশই ক্রয় করেছে এসব দেশ। এদিকে ফিলিপাইন ও ভিয়েতনামসহ পার্শ্ববর্তী দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোতেও ইন্দোনেশীয় কয়লার বড় বাজার রয়েছে।
ইন্দোনেশিয়া প্রতি মাসে কয়লা রফতানি থেকে ৩০০ কোটি ডলার আয় করে। গত বছর দেশটির মোট পণ্য রফতানি রেকর্ড সর্বোচ্চে পৌঁছনোর পেছনে কয়লাই প্রধান ভূমিকা পালন করেছে।
জাপান ইন্দোনেশীয় কয়লার বড় ক্রেতা দেশ। সম্প্রতি দেশটি হাই-ক্যালোরিক কয়লা রফতানি নিষেধাজ্ঞা উঠিয়ে নেয়ার আহ্বান জানিয়ে ইন্দোনেশিয়ার জ্বালানিবিষয়ক মন্ত্রীর দপ্তরে একটি চিঠি পাঠিয়েছে। এতে বলা হয়, ইন্দোনেশিয়া তাদের বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্রগুলোয় লো-ক্যালোরিক কয়লা ব্যবহার করে। ফলে হাই-ক্যালোরিক কয়লা রফতানি করলে দেশীয় সরবরাহে প্রভাব পড়বে না। এদিকে নিষেধাজ্ঞার কারণে ইন্দোনেশিয়ার বন্দরে আটকে পড়া পাঁচটি কয়লাবাহী জাহাজ ছেড়ে দিতে যথাযথ ব্যবস্থা নেয়া আহ্বানও জানিয়েছে জাপান।


