পেঁয়াজের উৎপাদন বেড়েছে, কমেছে আলু-গম
দেশে এক বছরে পেঁয়াজের উৎপাদন বেড়েছে প্রায় ৬ লাখ টন। একই সময়ে আমন ধানের উৎপাদনও বেড়েছে ৫ দশমিক ১ শতাংশ। তবে উৎপাদন কমেছে আলু ও গমের। এক বছরে আলুর উৎপাদন কমেছে প্রায় ৩ লাখ টন, গমের ১ দশমিক ২ শতাংশ। অন্যদিকে কৃষিশ্রমিকের মজুরি বাড়লেও নারী-পুরুষের বৈষম্য কমেনি। গত জুনে একজন পুরুষ কৃষিশ্রমিক দৈনিক গড়ে ৬৪৮ টাকা মজুরি পেলেও নারী শ্রমিক পেয়েছেন ৪৭৮ টাকা। দুই শ্রেণির শ্রমিকের মজুরির ব্যবধান ১৭০ টাকা।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) কৃষি উইংয়ের প্রকাশিত ‘ফসলের পরিসংখ্যান ও কৃষিশ্রমিকের মজুরিবিষয়ক ত্রৈমাসিক প্রতিবেদন (এপ্রিল-জুন ২০২৬)’-এ এসব তথ্য উঠে এসেছে। এতে ২০২৪-২৫ ও ২০২৫-২৬ অর্থবছরের ফসলের আবাদি জমি ও উৎপাদনের তুলনামূলক চিত্র তুলে ধরা হয়েছে।
বিবিএসের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে দেশে পেঁয়াজ উৎপাদিত হয়েছিল ৩২ লাখ ২১ হাজার টন। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩৮ লাখ ২০ হাজার টনে। এক বছরে উৎপাদন বেড়েছে ৫ লাখ ৯৮ হাজার টন বা ১৮ দশমিক ৬ শতাংশ।
এ সময়ে পেঁয়াজের আবাদি জমিও বেড়েছে। আগের অর্থবছরে ৫ লাখ ৩৫ হাজার ৫৯৯ একর জমিতে পেঁয়াজ আবাদ হয়েছিল। সর্বশেষ অর্থবছরে তা বেড়ে হয়েছে ৫ লাখ ৬৯ হাজার ৭৮৭ একর।
পেঁয়াজের পাশাপাশি রসুন ও শীতকালীন মরিচের উৎপাদনও বেড়েছে। রসুনের উৎপাদন ৫ লাখ ৬৫ হাজার ৬৮২ টন থেকে বেড়ে ৬ লাখ ৫ হাজার ৪৪৬ টনে দাঁড়িয়েছে। শীতকালীন মরিচের উৎপাদন ৫ লাখ ৬১ হাজার ৩৯৭ টন থেকে বেড়ে হয়েছে ৬ লাখ ১৬ হাজার ৩৪০ টন।
ধানের মধ্যে আমন উৎপাদনে ইতিবাচক প্রবৃদ্ধি হয়েছে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে আমন উৎপাদন ছিল ১ কোটি ৬৫ লাখ ১৪ হাজার টন। পরের অর্থবছরে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১ কোটি ৭৩ লাখ ৫৯ হাজার টনে। অর্থাৎ এক বছরে উৎপাদন বেড়েছে ৮ লাখ ৪৫ হাজার টন বা ৫ দশমিক ১ শতাংশ। আমনের আবাদি জমিও বেড়েছে প্রায় ২ দশমিক ২ শতাংশ।
তবে আলুর উৎপাদনে দেখা গেছে উল্টো চিত্র। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে দেশে ১ কোটি ১৫ লাখ ৭৩ হাজার টন আলু উৎপাদিত হয়েছিল। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে তা কমে দাঁড়িয়েছে ১ কোটি ১২ লাখ ৭২ হাজার টনে। অর্থাৎ, উৎপাদন কমেছে প্রায় ৩ লাখ টন বা ২ দশমিক ৬ শতাংশ। আলুর আবাদি জমিও কমেছে।
গমের উৎপাদনও কমেছে। আগের অর্থবছরে ১০ লাখ ৪১ হাজার টন গম উৎপাদিত হলেও সর্বশেষ অর্থবছরে তা কমে হয়েছে ১০ লাখ ২৮ হাজার টন। উৎপাদন কমেছে ১ দশমিক ২ শতাংশ। একই সময়ে গমের আবাদি জমি ৬ লাখ ৯৩ হাজার ৭২৪ একর থেকে কমে ৬ লাখ ৮৫ হাজার ১৫৬ একরে দাঁড়িয়েছে।
অন্যান্য ফসলের মধ্যে শীতকালীন ভুট্টার উৎপাদন ৪৮ লাখ ৭৩ হাজার টন থেকে বেড়ে ৫০ লাখ ৪৮ হাজার টন হয়েছে। সয়াবিনের উৎপাদনও ১ লাখ ৮ হাজার টন থেকে বেড়ে ১ লাখ ৩৬ হাজার টনে দাঁড়িয়েছে। তবে আখের উৎপাদন সামান্য কমেছে।
মজুরিতে নারী-পুরুষের ব্যবধান ১৭০ টাকা:
ফসলের উৎপাদনের পাশাপাশি কৃষিশ্রমিকের মজুরিতে বড় বৈষম্যের চিত্রও উঠে এসেছে বিবিএসের প্রতিবেদনে। গত জুনে খাদ্য ছাড়া একজন পুরুষ কৃষিশ্রমিকের দৈনিক গড় মজুরি ছিল ৬৪৮ টাকা। একই সময়ে নারী শ্রমিকের মজুরি ছিল ৪৭৮ টাকা। অর্থাৎ, পুরুষের তুলনায় নারী শ্রমিকের মজুরি ১৭০ টাকা বা প্রায় ২৬ শতাংশ কম।
মার্চ মাসে পুরুষ কৃষিশ্রমিকের দৈনিক মজুরি ছিল ৬২৮ টাকা এবং নারীর ৪৬১ টাকা। তিন মাসে পুরুষের মজুরি বেড়েছে ২০ টাকা, নারীর ১৭ টাকা। ফলে মজুরির ব্যবধান ১৬৭ টাকা থেকে বেড়ে ১৭০ টাকা হয়েছে।
খাবারসহ মজুরির হিসাবেও নারী-পুরুষের মধ্যে পার্থক্য রয়েছে। জুনে এক বেলা খাবারসহ পুরুষ শ্রমিকের দৈনিক মজুরি ছিল ৬২২ টাকা, নারীর ৪৩৭ টাকা। দুই বেলা খাবারসহ পুরুষের মজুরি ৬৩৯ টাকা এবং নারীর ৪৬০ টাকা। তিন বেলা খাবারসহ পুরুষ শ্রমিক পেয়েছেন ৬৬৪ টাকা, নারী শ্রমিক ৫১৫ টাকা।
বিবিএস জানিয়েছে, দেশের প্রতিটি উপজেলা থেকে নমুনাভিত্তিতে ১০ জন কৃষিশ্রমিকের সাক্ষাৎকার নিয়ে মজুরির তথ্য সংগ্রহ করা হয়। শ্রমিক পাওয়া না গেলে কৃষিকাজে দৈনিক শ্রমিক নিয়োগ করেছেন এমন কৃষকদের কাছ থেকেও তথ্য নেয়া হয়।
কৃষি অর্থনীতিবিদ ও বাংলাদেশ প্রাণিসম্পদ গবেষণা ইনস্টিটিউটের সাবেক মহাপরিচালক জাহাঙ্গীর আলম খান বলেন, কৃষিপণ্যের উৎপাদন বাড়লেও কৃষক ন্যায্যমূল্য না পেলে উৎপাদনে নিরুৎসাহিত হবেন।
আলুর উৎপাদন বেশি হওয়ার পরও কৃষকদের লোকসানের মুখে পড়ার প্রসঙ্গ তুলে তিনি সরকারি উদ্যোগে আলু সংগ্রহ ও সংরক্ষণের পরামর্শ দিয়েছেন। তার মতে, ধান-চালের মতো আলুও সরকারিভাবে সংগ্রহ করে সারা বছর বাজারে সরবরাহ করা গেলে কৃষক ন্যায্যমূল্য পাবেন। একই সঙ্গে বাজারে দাম অস্বাভাবিক বেড়ে গেলে সরকারি মজুত থেকে আলু ছাড়ার সুযোগ থাকবে।



