স্মারকলিপি, মানবন্ধন ও কঠোর আন্দোলনের ডাক
মামলার বাদী পেয়েছেন সানলাইফের টাকা!
জিনান মাহমুদ:
সানলাইফ ইন্স্যুরেন্সের বীমা দাবির টাকা পাওয়ার ক্ষেত্রে সাধারণ গ্রাহক কিংবা মাঠকর্মীরা বঞ্চিত হলেও সুবিধা পেয়েছেন কোম্পানির বিরুদ্ধে মামলা করা বাদী ও মালিকপক্ষের সুপারিশপ্রাপ্তরা। সম্প্রতি বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ (আইডিআরএ) থেকে প্রকাশিত সানলাইফের ২৪৩ জন গ্রাহকের তালিকা নিয়ে এমনই গুরুতর অভিযোগ তুলেছেন ভুক্তভোগীরা।
সানলাইফের সারাদেশের মাঠকর্মী ও বীমা গ্রাহকদের প্রায় ২০০ কোটি টাকা বকেয়া পরিশোধের দাবিতে আইডিআরএর চেয়ারম্যান বরাবর স্মারকলিপি, কোম্পানির প্রধান কার্যালয়ে বিক্ষোভ ও আইডিআরএর সামনে মানববন্ধন কর্মসূচি পালন করা হয়েছে। গত ১৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬ তারিখে প্রদত্ত স্মারকলিপিতে জানানো হয়, ২০০ কোটি টাকার মূল দাবির পাশাপাশি গ্রাহকদের হাতে বর্তমানে প্রায় ৬ কোটি টাকার মেয়াদউত্তীর্ণ চেক জমা হয়ে আছে। অথচ আইডিআরএর তালিকায় সাধারণ বীমা গ্রাহকদের টাকা মেটানোর পরিবর্তে মামলার বাদী ও প্রভাবশালীদের অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। শুধু তা-ই নয়, গ্রাহকদের পূর্বানুমতি ছাড়াই বীমা দাবি থেকে ৩০% থেকে ৫০% পর্যন্ত কেটে নিয়ে এফডিআর করা হলেও অবশিষ্টাংশের চেক প্রদান না করার মাধ্যমে আইন লঙ্ঘনের অভিযোগ করা হয়। এ বিষয়ে বারবার তারিখ দিয়েও সমাধান করতে না পারায় কোম্পানির অর্থ ও হিসাব বিভাগের প্রধান (সিএফও) রফিকুল ইসলামকে দায়ী করেন আন্দোলনকারীরা।
তারা বলছেন, সানলাইফের বিরুদ্ধে সারাদেশে অসংখ্য মামলা রয়েছে। এমনকি বেশ কয়েকটি মামলায় আদালত থেকে সানলাইফের চেয়ারম্যান, সিইও এবং সিএফওসহ অনেকের বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানাও জারি করা হয়েছে। মূলত আইনি ঝামেলা ও গ্রেফতার এড়াতেই সাধারণ গ্রাহকদের বঞ্চিত করে মামলার বাদীদের টাকা দিয়ে মামলা প্রত্যাহারের চেষ্টা করছে সানলাইফ কর্তৃপক্ষ।
তবে মামলা প্রত্যাহার করার পরও টাকা পাননি—এমন ভুক্তভোগীও রয়েছেন। তাদেরই একজন ভোলার লালমোহন উপজেলার উন্নয়নকর্মী মো. মফিজুল ইসলাম। শিক্ষকতার পাশাপাশি সানলাইফে বীমা পেশার সঙ্গে যুক্ত হন তিনি। অর্থবাংলাকে জানান, ১৪৬ জন সাধারণ গ্রাহকের প্রায় ২৭ লাখ টাকা সানলাইফে জমা করেন তিনি। দীর্ঘদিন ধরে এসব গ্রাহকের বীমা দাবি পরিশোধ না করায় ২০২১ সালে সানলাইফ কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে আদালতে মামলা দায়ের করেন তিনি।
পরবর্তীতে প্রতি মাসে ৫ লাখ টাকা করে পরিশোধের প্রতিশ্রুতি দিয়ে (মামলা নং ২০২৭/২১) আপস-রফা করে মামলাটি প্রত্যাহার করিয়ে নেয় কোম্পানি কর্তৃপক্ষ। কিন্তু মামলা প্রত্যাহারের পরও প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী একটি টাকাও পরিশোধ করেনি সানলাইফ। এই প্রতারণার বিষয়ে তিনি নিয়ন্ত্রক সংস্থা আইডিআরএকে লিখিতভাবে জানিয়েও কোনো প্রতিকার পাননি। বর্তমানে পাওনাদার সাধারণ গ্রাহকদের ভয়ে ও লোকলজ্জায় বছরের পর বছর ধরে ঘরছাড়া জীবনযাপন করছেন নিঃস্ব এই উন্নয়নকর্মী।
বারবার আশ্বাসের পরও দীর্ঘদিন অর্থ না পাওয়ায় সারাদেশে এমন অসংখ্য মাঠকর্মী ও গ্রাহকদের মাঝে তীব্র ক্ষোভ দেখা দিয়েছে। বকেয়া দিতে না পেরে মাঠকর্মীরা প্রতিনিয়ত অপমান ও গালিগালাজের শিকার হচ্ছেন এবং অনেকে সামাজিক ও আর্থিক সংকটে পরিবার নিয়ে চরম মানসিক কষ্টে দিন কাটাচ্ছেন। দ্রুত সমাধান না হলে জাতীয় প্রেসক্লাবে অবস্থান কর্মসূচি এবং অর্থ মন্ত্রণালয়ে স্মারকলিপিসহ আরও কঠোর আন্দোলনের হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়েছে।
এদিকে নিরীক্ষা রিপোর্টে সানলাইফের চরম আর্থিক ভঙ্গুরতা ধরা পড়েছে। শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত প্রতিষ্ঠানটির ২০২৬ সালের দ্বিতীয় প্রান্তিকের অনিরীক্ষিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, এর নিট অপারেটিং ক্যাশ ফ্লো ঋণাত্মক এবং লাইফ ফান্ড আশঙ্কাজনকভাবে কমে গেছে। ২০২৫ ও ২০২৬ সালের সাম্প্রতিক অডিট রিপোর্টে অ্যাসেট রেজিস্টারের ঘাটতি, আইএফআরএস নীতিমালা লঙ্ঘন করে আয়কর ও ডেফার্ড ট্যাক্স বাদ দেওয়া এবং শেয়ার বিনিয়োগ মূল্যায়নে গুরুতর অসংগতি চিহ্নিত করা হয়েছে।
এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে সানলাইফ ইন্স্যুরেন্সের ভারপ্রাপ্ত সিইও রফিকুল ইসলামের মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।
আইডিআরএ-র এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “সানলাইফ থেকে যে তালিকা দেওয়া হয়েছিল, মূলত সেই তালিকা অনুযায়ী গ্রাহকদের পাওনা পরিশোধ করা হয়েছে। সুবিধাভোগীদের মধ্যে কে মামলার বাদী, আর কে সাধারণ গ্রাহক—আলাদাভাবে এমন তথ্য যাচাই করা হয়নি। তবে এক্ষেত্রে কোনো ধরনের অনিয়ম বা প্রতারণার আশ্রয় নেওয়া হয়ে থাকলে তদন্ত সাপেক্ষে কঠোর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।”
তবে আইডিআরএ-র পরামর্শক (জনসংযোগ) সাদিক আরমান অর্থবাংলাকে জানান, গ্রাহকদের দাবি সময়মতো না পাওয়া বীমা খাতের অন্যতম বড় সমস্যা। আইডিআরএর অবস্থান পরিষ্কার—খাতের কল্যাণে প্রয়োজনে কোম্পানির সম্পদ বিক্রি করে হলেও গ্রাহকদের বীমা দাবি পরিশোধ করা হবে এবং এক্ষেত্রে নিয়ন্ত্রণ সংস্থা আরও কঠোর অবস্থান নেবে।



