মূসার অপসারণ, পদ্মা লাইফের আইন লঙ্ঘন
নুরুন্নাহার চৌধুরী কলি:
পদ্মা ইসলামী লাইফ ইন্স্যুরেন্স লিমিটেডের মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) মোহাম্মদ আবু মূসা সিদ্দিকীকে বিধিবহির্ভূতভাবে চাকরি থেকে অব্যাহতি দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। বীমা আইন ও সংশ্লিষ্ট প্রবিধান অনুসরণ না করে এ সিদ্ধান্ত নেওয়ায় কোম্পানির চেয়ারম্যান ও পরিচালনা পর্ষদের কাছে ব্যাখ্যা চেয়েছে বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ (আইডিআরএ)।
আইডিআরএর পরিচালক (লাইফ) ও উপসচিব দেবপ্রসাদ পাল স্বাক্ষরিত এক চিঠিতে গত ২২ জুন এ নির্দেশনা দেওয়া হয়।
আইডিআরএ সূত্রে জানা গেছে, চলতি বছরের ১৮ জানুয়ারি কর্তৃপক্ষের অনুমোদন নিয়ে পদ্মা ইসলামী লাইফ ইন্স্যুরেন্স লিমিটেডের মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। কিন্তু চলতি বছরের ১ জুন কোম্পানির পরিচালনা পর্ষদের এক সভায় তাকে সিইও পদ থেকে অব্যাহতি দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। পরে এ বিষয়ে চিঠির মাধ্যমে নিয়ন্ত্রক সংস্থাকে অবহিত করা হয়।
তবে আইডিআরএর পর্যালোচনায় দেখা গেছে, সিইওকে অব্যাহতি দেওয়ার ক্ষেত্রে বিদ্যমান আইন, প্রবিধান ও নিয়োগপত্রের শর্ত যথাযথভাবে অনুসরণ করা হয়নি।
কর্তৃপক্ষের চিঠিতে বলা হয়েছে, বীমা আইন, ২০১০-এর ৮০(২) ধারায় মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তাকে অপসারণের ক্ষেত্রে যে আইনি বাধ্যবাধকতা রয়েছে, তা মানা হয়নি। এছাড়া বীমা কোম্পানি (মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তা নিয়োগ ও অপসারণ) প্রবিধানমালা, ২০১২-এর প্রবিধি-৭ অনুযায়ী অপসারণের আগে নির্ধারিত প্রক্রিয়া অনুসরণ এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাকে আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ দেওয়ার বিধান থাকলেও তা অনুসরণ করা হয়নি। একই সঙ্গে মূসা সিদ্দিকীর নিয়োগপত্রের শর্ত ও নিয়মাবলী উপেক্ষা করা হয়েছে।
চিঠিতে আরও বলা হয়, প্রযোজ্য আইন ও বিধি অনুসরণ না করে কেন তাকে সিইও পদ থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে- সে বিষয়ে সুনির্দিষ্ট বক্তব্য ও ব্যাখ্যা অনতিবিলম্বে আইডিআরএর কাছে দাখিল করতে হবে।
তবে পদ্মা লাইফের সূত্রে জানা গেছে, ২০২৫ সালের নভেম্বরে ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) হিসেবে আবু মূসা সিদ্দিকীকে নিয়োগ দেয় কোম্পানিটি। পরে আইডিআরএর অনুমোদন দেয়। পূর্বের কোনো নোটিশ ছাড়াই চলতি বছরের ২১ এপ্রিল তাকে অপসারণ করে পদ্মা লাইফ।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে পদ্মা লাইফের একাধিক কর্মকর্তা অর্থবাংলাকে জানান, একের পর এক অনিয়ম, দূর্নীতি আর অর্থ আত্মসাতে এমনিতেই বিতর্কিত প্রতিষ্ঠানে রূপ নিয়েছে পদ্মা লাইফ। এছাড়াও বীমা দাবী না দিয়ে গ্রাহকদের সাথে প্রতারণাতো আছেই। এখন সিইওদেরও নতুন করে প্রতারণা জাল গ্রাস করছে। এভাবে কোন সিইওকে অপসারণ করার সুযোগ নেই। এতে করে বীমার প্রতি মানুষ আরও আগ্রহ হারাবে।
বীমা খাত সংশ্লিষ্টদের মতে, নিয়ন্ত্রক সংস্থার অনুমোদিত একজন মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তাকে নির্ধারিত প্রক্রিয়া অনুসরণ না করে অপসারণ করা করপোরেট সুশাসনের পরিপন্থী। এতে কোম্পানিটি আইনি জটিলতা ও সম্ভাব্য জরিমানার মুখে পড়তে পারে। পাশাপাশি এ ধরনের ঘটনা বীমা গ্রাহকদের আস্থার ওপরও নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে।
এবিষয়ে পদ্মা ইসলামী লাইফ ইন্স্যুরেন্স লিমিটেডের সাবেক মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) মোহাম্মদ আবু মূসা সিদ্দিকী অর্থবাংলাকে বলেন, পদ্মা লাইফ ছেড়ে দিয়েছি এর বেশি কিছুই বলতে চাইনা। আমি খুব অসুস্থ হাসপাতালে ভর্তি হতে যাচ্ছি।
আবু মূসা সিদ্দিকীর অপসারণের বিষয়ে জানতে পদ্মা ইসলামী লাইফের প্রধান কার্যালয়ে যোগাযোগ করা হলে দায়িত্বশীল কোনো কর্মকর্তা আনুষ্ঠানিক মন্তব্য করতে রাজি হননি। জানা গেছে, আবু মূসা সিদ্দিকীকে অপসারণ করার পর শুধু চাকরির চুক্তিতে উল্লিখিত মূল আয় (বেসিক) দেওয়া হয়েছে।
এ বিষয়ে পদ্মা লাইফ ইন্স্যুরেন্সের ভারপ্রাপ্ত প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (চিফ এক্সিকিউটিভ অফিসার-অ্যাক্টিং) হিসেবে মো. মোস্তাফিদুজ্জামানের সাথে যোগাযোগ করা হলে কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক আইডিআরএ-এর এক কর্মকর্তা অর্থবাংলাকে বলেন, বীমা খাতে অনিয়ম ও অব্যবস্থাপনার কোনো স্থান নেই। ভবিষ্যতে এ ধরনের কোনো কর্মকাণ্ড বরদাশত করা হবে না। সুশাসন প্রতিষ্ঠা এবং পলিসিধারীদের স্বার্থ সুরক্ষায় সব ধরনের অনিয়মের বিরুদ্ধে কঠোর ও কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
দীর্ঘদিন ধরে গ্রাহকের বীমা দাবি পরিশোধে ব্যর্থ পদ্মা ইসলামী লাইফ এখন অবসায়নের ঝুঁকিতে রয়েছে। দেশের জীবন বীমা খাতে আর্থিক শৃঙ্খলা ও গ্রাহক সুরক্ষায় নিয়ন্ত্রক সংস্থা এখন পদ্মা ইসলামী লাইফ ইন্স্যুরেন্সকে অবসায়নের কথা ভাবছে।
নিয়ন্ত্রক সংস্থা আইডিআরএর তথ্য অনুযায়ী, পদ্মা ইসলামী লাইফ ইন্স্যুরেন্সের কাছে মোট বীমা দাবির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ২৬৪ কোটি ৫৪ লাখ টাকা। এর বিপরীতে কোম্পানিটি পরিশোধ করেছে মাত্র ৩ কোটি ৬৩ লাখ টাকা। ফলে এখনো গ্রাহকদের পাওনা হিসেবে প্রায় ২৬০ কোটি ৯০ লাখ টাকা।
তথ্য পর্যালোচনায় দেখা যায়, কোম্পানিটির মোট সম্পদের পরিমাণ ২৩৮ কোটি ৫০ লাখ টাকা। এর মধ্যে বিভিন্ন খাতে বিনিয়োগ রয়েছে ১৭৫ কোটি ৩৬ লাখ টাকার। তবে বিপুল পরিমাণ বকেয়া দাবির তুলনায় এসব আর্থিক সক্ষমতা নিয়ে সংশ্লিষ্ট মহলে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের তথ্যমতে, (চলতি বছরের ৩০ মে পর্যন্ত) পদ্মা ইসলামী লাইফ ইন্স্যুরেন্সে গ্রাহকের বিনিয়োগ রয়েছে মোট বিনিয়োগের ৬৮ দশমিক ৪৪ শতাংশ। এছাড়া উদ্যোক্তা বিনিয়োগকারীদের শেয়ার রয়েছে ৩১ দশমিক ৫৬ শতাংশ। বর্তমানে কোম্পানিটির পুজিবাজারের শেয়ার রয়েছে ৩ কোটি ৮৮ লাখ ৮০ হাজার।
বীমা আইন লঙ্ঘন, পদে পদে অনিয়ম-দুর্নীতি, লুটপাট আর পদ্মা লাইফের অসংখ্য অভিযোগ নিয়ে ধারাবাহিক প্রতিবেদনের দ্বিতীয় পর্বে থাকছে পরিচালনা পর্ষদ ও সিইও সংক্রান্ত ইস্যু নিয়ে বিশেষ আয়োজন…..


