বীমা আইন লঙ্ঘন
ফারইস্ট লাইফে অবৈধ সিইও কামরুলের প্রতারণা!

জিনান মাহমুদ:

বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের (আইডিআরএ) দুর্নীতিগ্রস্ত সাবেক কর্মকর্তা ও ফারইস্ট লাইফের বর্তমান ভারপ্রাপ্ত সিইও কামরুল হাসানের নানা বিতর্কিত কার্যক্রম নিয়ে বীমা খাতে তীব্র সমালোচনা শুরু হয়েছে।

অভিযোগ উঠেছে— আইডিআরএ কোনো অনুমোদন ছাড়াই তিনি প্রতারণার মাধ্যমে নিজেকে কোম্পানির মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) হিসেবে উপস্থাপন করে বিভিন্ন অনিয়ম ও প্রতারণা চালিয়ে যাচ্ছেন।

সূত্র জানায়, কামরুল হাসান অবসরের পর আইডিআরএর প্রভাব ও পুরোনো যোগাযোগ কাজে লাগিয়ে ফারইস্ট লাইফে প্রবেশ করেন। আইডিআরএ’র অনুমোদন ছাড়া কোনো ব্যক্তি সিইও হিসেবে দায়িত্ব পালন করতে পারেন না— বীমা আইন ২০১০ এর ধারা ১৪(২)-এ তা স্পষ্টভাবে উল্লেখ আছে। অথচ এই আইনকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে তিনি প্রতিষ্ঠানের অফিসিয়াল চিঠিপত্র ও অভ্যন্তরীণ নথিপত্রে সিইও হিসেবে স্বাক্ষর করছেন নিয়মিত।

প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরীণ সূত্রে জানা যায়, কামরুল হাসান ফারইস্ট লাইফে প্রবেশের পর থেকেই একটি প্রভাবশালী সিন্ডিকেট তৈরি করেন। এই সিন্ডিকেটের সদস্যদের মাধ্যমে তিনি নীতিনির্ধারণী বোর্ডে প্রভাব বিস্তার করছেন।

ফারইস্ট লাইফের একজন কর্মকর্তা বলেন, “কামরুল হাসান ফারইস্ট লাইফকে ব্যবহার করছেন নিজের আর্থিক ও প্রশাসনিক স্বার্থে। আইডিআরএর সাবেক কর্মকর্তা হওয়ার সুবাদে তিনি প্রতিষ্ঠানটিকে ‘প্রটেকশন সেল’ মনে করে অপব্যবহার করছেন।”

 

বীমা আইন অনুযায়ী, কোনো কোম্পানির সিইও নিয়োগের আগে আইডিআরএর অনুমোদন বাধ্যতামূলক। এছাড়া ধারা ১৪(৫)-এ বলা হয়েছে, অনুমোদন ছাড়া কেউ দায়িত্ব নিলে তা শাস্তিযোগ্য অপরাধ। কিন্তু আইডিআরএর সংশ্লিষ্ট বিভাগ এখনো কোনো ব্যবস্থা নেয়নি।

আইডিআরএর এক সিনিয়র কর্মকর্তা বলেন, “যদি তিনি সত্যিই অনুমোদন ছাড়া সিইও হিসেবে দায়িত্ব পালন করে থাকেন, তাহলে এটি ফৌজদারি অপরাধের আওতায় পড়বে। আইডিআরএ চাইলে তাঁকে অবিলম্বে দায়িত্ব থেকে অপসারণ এবং আর্থিক লেনদেন স্থগিত করতে পারে।”

কামরুল হাসানের বিরুদ্ধে ঘুস, ক্ষমতার অপব্যবহার ও ফাইল বিকৃতির একাধিক অভিযোগ ওঠে তাঁর আইডিআরএ- থাকাকালীন সময়ে। সে সময়ও তিনি প্রভাব খাটিয়ে তদন্ত এড়িয়ে যান। এখন অবসরোত্তর জীবনে আবারও বীমা খাতের একটি প্রতিষ্ঠানে জালিয়াতির মাধ্যমে প্রবেশ করে একই ধাঁচের দুর্নীতি চালিয়ে যাচ্ছেন বলে অভিযোগ উঠেছে।

দীর্ঘ দুই দশকের বেশি সময় ধরে জীবন বীমা খাতে যুক্ত কামরুল হাসান এর আগে মেটলাইফ, ন্যাশনাল লাইফ, প্রগতি লাইফ, চার্টার্ড লাইফ, প্রোটেক্টিভ লাইফ, বায়রা লাইফ ও পদ্মা ইসলামী লাইফে বিভিন্ন পদে দায়িত্ব পালন করেছেন। তবে তার চাকরি জীবনে অনিয়ম, ঘন ঘন বিদেশযাত্রা ও ঋণখেলাপি হওয়াসহ নানা বিতর্ক ছিল। পদ্মা ইসলামী লাইফে সিইও পদে তার নিয়োগ বাতিল করে আইডিআরএ, কারণ বাংলাদেশ ব্যাংকের সিআইবি প্রতিবেদনে তার নাম ঋণখেলাপি হিসেবে উঠে আসে।

২০২২ সালের ২৩ জুন আইডিআরএ’র সদস্য (লাইফ) পদে নিয়োগ পাওয়ার পর থেকেই তার বিরুদ্ধে দুর্নীতির নানা অভিযোগ উঠতে থাকে। এর মধ্যে রয়েছে—বীমা কোম্পানিগুলোর কাছ থেকে অবৈধ আর্থিক সুবিধা গ্রহণ, বিদেশ ভ্রমণের ব্যয় কোম্পানির ওপর চাপানো, অযোগ্য সিইওদের টিকিয়ে রাখার সুপারিশ, যোগ্যদের ফাইল আটকে রাখা, এমনকি ভুয়া সনদধারীদের পক্ষে বিশেষ ব্যবস্থার প্রভাব খাটান তিনি।

প্রগ্রেসিভ লাইফ ইন্স্যুরেন্স কোম্পানি লিমিটেডের ভারপ্রাপ্ত সিইও মো. জহির উদ্দিনের কাছ থেকে মাসে ৫০ হাজার টাকা ও প্রতি দাবী পরিশোধ সভায় দুই লাখ টাকা করে ‘সম্মানী’ দাবি করার অভিযোগও ওঠে তার বিরুদ্ধে। অভিযোগ অনুযায়ী, নিজেকে অর্থকষ্টে আছেন বলে দাবি করে কামরুল হাসান এই অর্থ দাবি করেন এবং হুমকি দেন যে মন্ত্রণালয় থেকে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হতে পারে। তখন বিষয়টি বীমা খাতে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়।

কামরুল বির্তকে ফারইস্ট লাইফের সাধারণ শেয়ারহোল্ডার ও গ্রাহকরা বর্তমানে পরিস্থিতিতে চরম উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। এক শেয়ারহোল্ডার বলেন, “কোম্পানির সিইও যদি বেআইনি হন- তাহলে পুরো প্রশাসনিক কাঠামোই প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে উঠে। এখন আমরা জানি না আমাদের বিনিয়োগের টাকা কোথায় যাচ্ছে।”

বীমা খাতের বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ফারইস্ট লাইফের এই ঘটনা শুধু একটি প্রতিষ্ঠানের নয়—পুরো বীমা খাতের জন্য উদ্‌বেগজনক দৃষ্টান্ত। নিয়ন্ত্রক সংস্থার সাবেক কর্মকর্তা যদি এমন অবৈধভাবে সিইও হয়ে বসে থাকতে পারেন, তাহলে নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার বিশ্বাসযোগ্যতা কোথায়?

 

সংশ্লিষ্টরা বলছেন , “এটি নৈতিক ও প্রশাসনিক ব্যর্থতার বড়ো উদাহরণ। বীমা খাতের এহেন অরাজকতার বিরুদ্ধে আইডিআরএ যদি দ্রুত ব্যবস্থা না নেয়, তাহলে ফারইস্ট লাইফের পতন এখন ধ্বংসের শেষ সীমানায় পৌঁছে দিবে।”

এ ব্যাপারে ফারইস্ট লাইফের অতিরিক্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক শহিদুল ইসলাম বলেন, চলতি বছরের ১৪ আগস্ট কামরুল হাসান আমাদের প্রতিষ্ঠানে যোগদান করেন। তার সিইও অনুমোদনের ফাইল আইডিআরএ’র কাছে পাঠানো হয়েছে, শীঘ্রই তার ফাইল হয়তো অনুমোদন হবে। তবে অনুমোদনের আগেই কীভাবে তিনি সিইও পদবি ব্যবহার করে বিভিন্ন নথিপত্রে স্বাক্ষর করছেন, এটা আমার জানা নেই!

এসব অভিযোগের ব্যাপারে বক্তব্য জানার জন্য ফারইস্ট লাইফের বর্তমান ভারপ্রাপ্ত সিইও কামরুল হাসানের মুঠোফোনে একাধিকবার ফোন করা হলেও তিনি তা রিসিভ করেনি।

এ বিষয়ে আইডিআরএ’র এক সদস্য বলেন, নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ’র অনুমোদন ছাড়া কারো সরাসরি মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) হওয়ার সুযোগ নেই। কোম্পানী নিয়োগ দিলেও সে ভারপ্রাপ্ত সিইও হিসেবে দায়িত্ব পালন করবে। অনুমোদনের আগেই সরাসরি সিইও পদবী ব্যবহার, কোথাও স্বাক্ষর বা কোনো কার্যক্রমের প্রমাণ পেলে বীমা আইনে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

কামরুল ইস্যুতে এখন সবার চোখ আইডিআরএর দিকে—তারা কি অবৈধ সিইও কামরুল হাসানের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেবে, নাকি এই অনিয়মও অন্যান্য অনিয়ম-দুর্নীতির মতো ধামাচাপা পড়বে?

সম্পর্কিত খবর