down of head

দরিদ্র দেশগুলোর শস্য আমদানি মারাত্মক ব্যাহতের শঙ্কা

পূর্ব ইউরোপে চলমান যুদ্ধের কারণে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে উত্তর আফ্রিকা, এশিয়া ও মধ্যপ্রাচ্যের দরিদ্র দেশগুলো। খাদ্যাভ্যাসের কারণে এসব দেশ প্রয়োজনীয় চাহিদা মেটাতে গমের ওপর অনেকটাই নির্ভরশীল। ফলে ইউক্রেনে রাশিয়ার সামরিক অভিযানের ফলে চরম খাদ্য অনিরাপত্তায় ভুগবে দেশগুলো। এরই মধ্যে এ উত্তেজনার ফলে সরবরাহ শৃঙ্খল ব্যাহত হওয়ার দরুন খাদ্যপণ্যের দাম বেড়েছে অনেকটা। সম্প্রতি এমন সতর্কবার্তা দিয়েছে জাতিসংঘের খাদ্যবিষয়ক সংস্থা ফুড অ্যান্ড এগ্রিকালচার অরগানাইজেশন অব দি ইউনাটেড ন্যাশন (এফএও)।

খাদ্যপণ্যের বৈশ্বিক সরবরাহের এক-তৃতীয়াংশের জোগান দিয়ে থাকে ইউক্রেন ও রাশিয়া। এর মধ্যে ইউরোপের রুটির ঝুড়ি হিসেবে বেশ পরিচিত ইউক্রেন। এছাড়া উল্লেখযোগ্য পরিমাণ শস্যের জোগান দেয় রাশিয়া। ইউক্রেনে সামরিক অভিযানের প্রতিক্রিয়ায় পশ্চিমা দেশগুলোসহ তাদের মিত্রদের বেশ ভালো রকমের অর্থনৈতিক ও ব্যবসায়িক নিষেধাজ্ঞা এবং অবরোধের মধ্যে রয়েছে দেশটি। ফলে রাশিয়ার সঙ্গে কোনো ধরনের ব্যবসা অনেকটা দুরূহ হয়ে পড়ছে অন্যান্য দেশের জন্য। পণ্যক্রয়ের পর তার মূল্য পরিশোধসংক্রান্ত ভোগান্তিও রাশিয়ার রফতানিকে বিপাকে ফেলেছে।

রোমভিত্তিক খাদ্য ও কৃষিবিষয়ক জাতিসংঘের এ সংস্থার মহাপরিচালক কু ডংইউ বলেন, পূর্ব ইউরোপে সংঘাতের তীব্রতা ও অনিশ্চিত স্থায়িত্ব পরিস্থিতিকে আরো কঠিন করে তুলছে। খাদ্যশস্যের প্রধান দুই জোগানদাতার এমন সংঘাতপূর্ণ পরিস্থিতি কৃষিকাজকে মারাত্মকভাবে ব্যাহত করবে। এর দরুন বিশ্বব্যাপী খাদ্যনিরাপত্তা চরম হুমকির মুখে পড়বে। এমন এক সময়ে এটি ঘটছে যখন আন্তর্জাতিক বাজারে খাদ্য ও খাদ্য উৎপাদনসংক্রান্ত বিভিন্ন পণ্যের দাম এমনিতেই অনেকটা চড়া ও অস্থিতিশীল।

এ সময় এফএও জানায়, বৈশ্বিক বাজারে সারের অন্যতম উৎপাদক হিসেবে অবস্থান রয়েছে রাশিয়ার। গত এক বছরে অন্যতম সার পণ্য ইউরিয়ার দাম অন্তত তিন গুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। অন্যদিকে ইউক্রেনে জুনে পরিপক্ব হওয়া গম কৃষিখেত থেকে সংগ্রহ করা যাবে কিনা তা নিয়ে অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে। যুদ্ধের কারণে জনসংখ্যার একটি বড় অংশ স্থানচ্যুত হওয়ায় কৃষিশ্রমিক ও অন্য শ্রমিকদের সংখ্যা কমিয়ে এনেছে। ফলে দেশটির কৃষিজমি একটি বড় ধরনের বিপর্যয়ের সম্মুখীন হতে পারে বলে মনে করেন কু ডংইউ।

যুদ্ধের কারণে কৃষ্ণ সাগরে ইউক্রেনের বন্দরগুলো বন্ধ রয়েছে। অন্যদিকে দেশটির সরকার চলতি সপ্তাহে গম, ওটস, মিলেট, বাকউট, চিনি, লবণসহ বেশকিছু খাদ্যপণ্য রফতানির ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে। যুদ্ধকালীন দেশের অভ্যন্তরে পণ্যের দাম ও সরবরাহ স্থিতিশীল রাখতে এমন সিদ্ধান্ত নেয় দেশটি।

প্রধান রফতানিপণ্য ভুট্টা ও সূর্যমুখী তেল রফতানির ওপর কোনো ধরনের নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেনি ইউক্রেন। রাশিয়া ও ইউক্রেন যৌথভাবে বৈশ্বিক বাজারে সরবরাহকৃত সূর্যমুখী তেলের ৫২ শতাংশের জোগান দিয়ে থাকে। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক বাজারে বাণিজ্যকৃত ১৯ শতাংশ যব, ১৪ শতাংশ গম ও ৪ শতাংশ ভুট্টার সরবরাহও করে থাকে দেশ দুটি।

এফএওর মহাপরিচালক আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেন, যুদ্ধের কারণে তৈরি হওয়া এ ঘাটতি পূরণে অন্যান্য রফতানিকারক দেশগুলো সমর্থ হবে কি না তা জানা নেই। এরই মধ্যে কানাডায় গমের মজুদ কমতে শুরু করেছে। তিনি জানান যুক্তরাষ্ট্র, আর্জেন্টিনা ও অন্যান্য গম উৎপাদনকারী দেশগুলো তাদের রফতানি পরিমাণ সীমাবদ্ধ করার পদক্ষেপ নিয়েছে। অভ্যন্তরীণ সরবরাহ নিশ্চিতে এমন পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে বলে জানা যায়।

রাশিয়া ও ইউক্রেনের গমের ওপর নির্ভরশীল দেশগুলো তাদের আমদানি বাড়াতে চাইছে। দেশ দুটি থেকে গম আমদানি করা দেশগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো মিসর, তুরস্ক, বাংলাদেশ ও ইরান। এসব দেশ তাদের মোট চাহিদার ৬০ শতাংশ গম সংগ্রহ করে থাকে রাশিয়া ও ইউক্রেন থেকে। এছাড়া লেবানন, তিউনিসিয়া, ইয়েমেন, লিবিয়া ও পাকিস্তান ইউক্রেন এবং রাশিয়ার গমের ওপর অনেকটাই নির্ভরশীল।

এফএও এক সতর্কবার্তা দিয়ে জানায়, ইউক্রেন ও রাশিয়ার সূর্যমুখী বীজ ও শস্য রফতানি কমে আসায় বৈশ্বিক সরবরাহ সংকটের দরুন আন্তর্জাতিক বাজারে খাদ্যের দাম আরো বাড়বে। এ পরিস্থিতি খাদ্য ও খাদ্যশস্যের দামকে বর্তমান স্তরের তুলনায় ৮-২২ শতাংশ পর্যন্ত বাড়তে প্রভাবিত করবে। এরই মধ্যে ফেব্রুয়ারিতে খাদ্যপণ্যের বৈশ্বিক মূল্যসূচক যেকোনো সময়ের তুলনায় সর্বোচ্চে অবস্থান করছে।

কভিড-১৯ মহামারী বৈশ্বিক খাদ্যনিরাপত্তার একটি উল্লেখযোগ্য প্রভাব রেখেছে। গত বছর গম ও যবের দাম আন্তর্জাতিক বাজারে ৩১ শতাংশ বেড়েছে। র্যাপসিড ও সূর্যমুখী তেলের দাম বেড়েছে ৬০ শতাংশেরও বেশি। ইউক্রেনের রুশ সামরিক অভিযানের এক সপ্তাহ আগে গমের দাম বেড়েছে আরো ৫০ শতাংশের বেশি।

লিবিয়ায় কয়েক বছর ধরে চলমান গৃহযুদ্ধের কারণে খাদ্যপণ্যের দাম নিয়ে ভোগান্তিতে রয়েছে দেশটির জনগণ। দেশটিতে রুটি ও ময়দার দাম প্রায় ৪০ শতাংশের মতো বেড়েছে। সূর্যমুখী তেলের দাম বেড়েছে ২৫ শতাংশের বেশি। এমন পরিস্থিতি পরিবারগুলোয় তাদের ন্যূনতম খরচ আরো কমিয়ে আনতে বাধ্য করছে।

এফএও জানায়, ২০২২-২৩ সালে বিশ্বজুড়ে অপুষ্টির শিকার মানুষের সংখ্যা ৮০ লাখ বেড়ে ১ কোটি ৩০ লাখ দাঁড়াবে। বিশেষ করে এশিয়া, সাব-সাহারান আফ্রিকা, মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর আফ্রিকায় অপুষ্টির শিকার বেশি হবে। খাদ্যপণ্যের দাম বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এ হার আরো বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

সম্পর্কিত খবর