ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের জন্য দুই থেকে চার গুণ ফি বাড়ানোর প্রস্তাব

মহামারীতে জনজীবন ও ব্যবসা-বাণিজ্যে নেতিবাচক প্রভাব চলছে প্রায় তিন বছরে ধরে। সিএসএমই খাতের অবস্থা আরো খারাপ। এরই মধ্যে সব ধরনের ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের পরিবেশগত ছাড়পত্র ইস্যু ফি বাড়ছে অন্তত দ্বিগুণ, আর নবায়ন ফি বাড়ছে চার গুণ। আবার কোনো কোনো ক্ষেত্রে নতুন করে ফি আরোপ করা হচ্ছে। সম্প্রতি এসব ফি বা মাশুল বৃদ্ধির বিষয়টি চূড়ান্ত করেছে পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়, যা চলতি অর্থবছরেই কার্যকর করা হবে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. মোস্তফা কামালের সভাপতিত্বে সম্প্রতি অনুষ্ঠিত আন্তঃমন্ত্রণালয় সভায় পরিবেশগত ছাড়পত্র ইস্যু ও নবায়ন ফি বাড়ানোসহ নতুন নতুন ক্ষেত্রে ফি আরোপের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়েছে। ব্যবসায়ীরা বলছেন, বিভিন্ন কারণে পণ্য উৎপাদন ও পরিবহনে খরচ অনেক বেড়ে গেছে। ফলে এসব ফি এ ধাপে দুই থেকে চার গুণ বাড়লে ব্যবসায়ীদের ঠিক থাকাই কঠিন হয়ে যাবে।

সভায় পরিবেশ অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে জানানো হয়, চলতি অর্থবছরের রাজস্ব আয়ের লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের জন্য কর ব্যতীত রাজস্ব আয়ের হার বৃদ্ধির উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে। এদিকে রাজস্ব আয়ের কয়েকটি নতুন ক্ষেত্রও সংযোজন করা হয়েছে। পরিবেশ সংরক্ষণ আইন, ১৯৯৫ এবং পরিবেশ সংরক্ষণ বিধিমালা ১৯৯৭ অনুযায়ী রাজস্ব আয়ের ক্ষেত্রগুলো চিহ্নিত করে আয় বৃদ্ধির প্রস্তাব করা হয়েছে। এছাড়া নতুন ক্ষেত্রগুলো পরিবেশ সংরক্ষণ বিধিমালার তফসিলে অন্তর্ভুক্ত না থাকলে নতুনভাবে অন্তর্ভুক্ত করা প্রয়োজন।

এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব মো. মনিরুজ্জামান বণিক বার্তাকে বলেন, ফি বাড়ানোর প্রস্তাবগুলো এরই মধ্যে চূড়ান্ত করা হয়েছে, যা কার্যকরের সম্মতির জন্য শিগগির অর্থ মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হবে। এরপর আইন মন্ত্রণালয়ের ভেটিং নিয়ে তা বাস্তবায়ন করা হবে।

জানা গেছে, বর্তমানে ১ লাখ হতে ৫ লাখ টাকা পর্যন্ত বিনিয়োগকরী প্রতিষ্ঠানের পরিবেশগত ছাড়পত্র ইস্যু ফি ১ হাজার ৫০০ টাকা এবং বার্ষিক নবায়ন ফি ৩৭৫ টাকা। আন্তঃমন্ত্রণালয় বৈঠকের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ইস্যু ফি দ্বিগুণ বাড়িয়ে ৩ হাজার এবং নবায়ন ফি চার গুণ বাড়িয়ে করা হচ্ছে ১ হাজার ৫০০ টাকা। একইভাবে ৫ লাখ ১ টাকা থেকে ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত বিনিয়োগকারী প্রতিষ্ঠানের ছাড়পত্র ইস্যু ফি এখন ৩ হাজার এবং নবায়ন ফি ৭৫০ টাকা। এটি বাড়িয়ে করা হচ্ছে যথাক্রমে ৬ হাজার এবং ৩ হাজার টাকা। ১০ লাখ ১ টাকা থেকে ৫০ লাখ টাকা পর্যন্ত বিনিয়োগকারী প্রতিষ্ঠানের ছাড়পত্র ইস্যু ফি এখন ৫ হাজার এবং নবায়ন ফি ১ হাজার ২৫০ টাকা, যা বাড়িয়ে করা হচ্ছে যথাক্রমে ১০ হাজার ও ৫ হাজার টাকা।

এছাড়া ৫০ লাখ ১ টাকা থেকে ১ কোটি পর্যন্ত বিনিয়োগকরী প্রতিষ্ঠানের পরিবেশগত ছাড়পত্র ইস্যু ফি বর্তমানে ১০ হাজার এবং নবায়ন ফি ২ হাজার ৫০০ টাকা, যা বাড়িয়ে করা হচ্ছে যথাক্রমে ২০ হাজার ও ১০ হাজার টাকা। ১ কোটি ১ টাকা থেকে ৫ কোটি পর্যন্ত বিনিয়োগকারী প্রতিষ্ঠানের ছাড়পত্র ইস্যু ফি এখন ২০ হাজার এবং নবায়ন ফি ৫ হাজার টাকা, যা বাড়িয়ে করা হচ্ছে যথাক্রমে ৪০ হাজার ও ২০ হাজার টাকা। ৫ কোটি ১ টাকা থেকে ২০ কোটি টাকা পর্যন্ত বিনিয়োগকারী প্রতিষ্ঠানের পরিবেশগত ছাড়পত্র ইস্যু ফি এখন ৪০ হাজার এবং নবায়ন ফি ১০ হাজার টাকা, যা বাড়িয়ে করা হচ্ছে যথাক্রমে ৮০ হাজার ও ৪০ হাজার টাকা।

একইভাবে বর্তমানে ২০ কোটি ১ টাকা থেকে ৫০ কোটি টাকা পর্যন্ত বিনিয়োগকারী প্রতিষ্ঠানের পরিবেশগত ছাড়পত্র ইস্যু ফি ৮০ হাজার এবং নবায়ন ফি ২০ হাজার টাকা, যা বাড়িয়ে করা হচ্ছে যথাক্রমে ১ লাখ ৬০ হাজার ও ৮০ হাজার টাকা। ৫০ কোটি ১ টাকা থেকে ১০০ কোটি টাকা পর্যন্ত বিনিয়োগকারী প্রতিষ্ঠানের ছাড়পত্র ইস্যু ফি বর্তমানে ১ লাখ ২০ হাজার এবং নবায়ন ফি ৩০ হাজার টাকা, যা বাড়িয়ে করা হচ্ছে যথাক্রমে ২ লাখ ৪০ হাজার এবং ১ লাখ ২০ হাজার টাকা। ১০০ কোটি ১ টাকা থেকে ২০০ কোটি টাকা পর্যন্ত বিনিয়োগকারী প্রতিষ্ঠানের ছাড়পত্র ইস্যু ফি বর্তমানে ২ লাখ এবং নবায়ন ফি ৫০ হাজার টাকা, যা বাড়িয়ে করা হচ্ছে যথাক্রমে ৪ লাখ এবং ২ লাখ টাকা।

এছাড়া ২০০ কোটি ১ টাকা থেকে ৫০০ কোটি টাকা পর্যন্ত বিনিয়োগকারী প্রতিষ্ঠানের পরিবেশগত ছাড়পত্র ইস্যু ফি বর্তমানে ৩ লাখ এবং নবায়ন ফি ৭৫ হাজার টাকা, যা বাড়িয়ে করা হচ্ছে যথাক্রমে ৬ লাখ এবং ৩ লাখ টাকা। ৫০০ কোটি ১ টাকা থেকে ১ হাজার কোটি টাকা পর্যন্ত বিনিয়োগকারী প্রতিষ্ঠানের ছাড়পত্র ইস্যু ফি বর্তমানে ৪ লাখ এবং নবায়ন ফি ১ লাখ টাকা, যা বাড়িয়ে করা হচ্ছে যথাক্রমে ৮ লাখ এবং ৪ লাখ টাকা। ১ হাজার কোটি ১ টাকা থেকে ২০ হাজার কোটি টাকা পর্যন্ত বিনিয়োগকারী প্রতিষ্ঠানের ছাড়পত্র ইস্যু ফি বর্তমানে ৫ লাখ এবং নবায়ন ফি ১ লাখ ২৫ হাজার টাকা, যা বাড়িয়ে করা হচ্ছে যথাক্রমে ১০ লাখ এবং ৫ লাখ টাকা। তাছাড়া ২০ হাজার কোটি ১ টাকা বা তদূর্ধ্ব বিনিয়োগকারী প্রতিষ্ঠানের জন্য পরিবেশগত ছাড়পত্র ইস্যু এবং নবায়ন ফি নতুন করে সংযোজন করা হচ্ছে। এক্ষেত্রে প্রস্তাব করা হয়েছে যথাক্রমে ১৫ লাখ এবং সাড়ে ৭ লাখ টাকা।

এতদিন ছাড়পত্রের আবেদন প্রক্রিয়াকরণে কোনো ধরনের ফি দেয়া লাগত না। তবে আগামীতে এক্ষেত্রেও ফি আরোপ করা হচ্ছে। এক্ষেত্রে শিল্প প্রতিষ্ঠানের শ্রেণী অনুযায়ী তিন ধরনের ফি আরোপ করা হচ্ছে। হলুদ শ্রেণীর শিল্প প্রতিষ্ঠান বা প্রকল্পের জন্য আবেদন প্রক্রিয়াকরণ ফি বাবদ দেয়া লাগবে ২ হাজার টাকা। এছাড়া কমলা ও লাল শ্রেণীর প্রতিষ্ঠানের জন্য দেয়া লাগবে যথাক্রমে ৫ ও ১০ হাজার টাকা।

এ ধরনের ফি বাড়ানো কোনো অবস্থাতেই উচিত হবে না বলে জানিয়ে এফবিসিসিআই সভাপতি মো. জসিম উদ্দিন বলেন, মহমারীকালে ব্যবসায়ীরা সংগ্রাম করে টিকে রয়েছেন। ১, ২ কিংবা ৫ শতাংশ সমন্বয় করা হলেও এতটা প্রভাব পড়ত না। কিন্তু এ ধাপে দুই থেকে চার গুণ বাড়ানো হলে ব্যবসায় টিকে থাকাই কঠিন হয়ে যাবে। এ ধরনের আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত গ্রহণ করলে তা সঠিক হবে না বলেও জানান তিনি।

বিজিএমইএর সভাপতি ফারুক হাসান বলেন, করোনাকালে স্বাস্থ্যবিধি চলতে গিয়ে উৎপাদন খরচ বেড়ে গেছে। তাই আমি মনে করি এ সময় সরকারের কোনো ধরনের ফি বাড়ানো উচিত হবে না। দ্বিগুণ-চার গুণ ফি বাড়ানো হলে আমাদের উৎপাদন খরচ আরো বেড়ে যাবে। এতে আমরা প্রতিযোগী দেশগুলোর সঙ্গে প্রতিযোগিতায় ঠিকতে পারব না। এছাড়া দেশের অভ্যন্তরেও পণ্যের দাম আরো বেড়ে যাবে।

সম্পর্কিত খবর