রিজার্ভ সংকটে বন্ধ শ্রীলংকার জ্বালানি তেল পরিশোধনাগার
শ্রীলংকার অর্থনৈতিক সংকট দিন দিন আরো মারাত্মক আকার ধারণ করেছে। দেশটির কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভও নিঃশেষপ্রায়। আন্তর্জাতিক বাজার থেকে উচ্চমূল্যে জ্বালানি সংগ্রহ করতে পারছে না দেশটি। এ অবস্থায় দেশটির একমাত্র জ্বালানি তেল পরিশোধনাগার সাময়িকভাবে বন্ধ রাখার ঘোষণা দিয়েছে শ্রীলংকা সরকার।
রাজধানী কলম্বোয় ৫১ বছর আগে স্থাপিত জ্বালানি তেল পরিশোধনাগার সাপুগাসকান্ডা অয়েল রিফাইনারি বন্ধ রয়েছে গত সোমবার থেকে। দেশটির জ্বালানিমন্ত্রী উদায়া গাম্মানপিলা গতকাল শ্রীলংকার সাপ্তাহিক মন্ত্রিসভা বৈঠকে এ কথা নিশ্চিত করেন। তিনি বলেন, পরিশোধনাগারটি প্রায় ৫০ দিন বন্ধ রাখা হবে। এ মুহূর্তে শ্রীলংকার হাতে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ খুবই সীমিত। যেটুকু আছে, সেটুকু আমাদের খাদ্য ও ওষুধের মতো অপরিহার্য পণ্য আমদানির জন্য প্রয়োজন।
সাপুগাসকান্ডা অয়েল রিফাইনারির জ্বালানি তেল পরিশোধন সক্ষমতা দিনে ৫০ হাজার ব্যারেল। পরিশোধনাগারটি বন্ধের খবরে এরই মধ্যে শ্রীলংকাজুড়ে পেট্রল স্টেশনগুলোয় ক্রেতাদের দীর্ঘ লাইন দেখা দিয়েছে। এ বিষয়ে উদায়া গাম্মানপিলার মন্তব্য হলো, পেট্রল স্টেশনগুলোর দীর্ঘ লাইন কিছুদিন পরই আর দেখা যাবে না। ওই সময়ের মধ্যেই জনসাধারণ বুঝে যাবে, এখানে আতঙ্কিত হওয়ার কিছু নেই। সরকার প্রয়োজনীয় পরিমাণে ডলার সংগ্রহ করতে পারলেই আবারো জ্বালানি আমদানি শুরু হবে।
শ্রীলংকার অর্থনৈতিক সংকট এ মুহূর্তে স্মরণকালের ভয়াবহতম রূপ ধারণ করেছে। দেশটিতে খাদ্যসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম এখন ক্রমেই বেড়ে চলেছে। এ সমস্যাকে আরো গভীর করে তুলেছে বৈদেশিক মুদ্রার সংকট। প্রয়োজনীয় বৈদেশিক মুদ্রা না থাকায় সরকারকে আমদানি নিয়ন্ত্রণের মতো পদক্ষেপও নিতে হয়েছে। চলমান এ অর্থনৈতিক সংকট ক্ষমতাসীন রাজাপাকসে পরিবারকে রাজনৈতিকভাবে বড় এক চ্যালেঞ্জের মুখে ঠেলে দিয়েছে। অর্থনীতি পরিচালনায় সরকারের দুর্বলতার প্রতিবাদে গতকাল রাজধানী কলম্বোয় কয়েক লাখ মানুষ বিক্ষোভে রাস্তায় নেমে আসে। প্রেসিডেন্ট গোতাবায়া রাজপাকসের কার্যালয় অভিমুখে চালানো এ বিক্ষোভ পুলিশ মাঝপথে থামিয়ে দিতে সক্ষম হয়।
আপাতদৃষ্টিতে এ বিক্ষোভ রাজাপাকসে সরকারকে বড় সমস্যায় ফেলতে না পারলেও ভবিষ্যতে রাজনৈতিকভাবে বিপাকে ফেলে দিতে পারে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। বিশেষ করে দেশটির কৃষকদের মধ্যে এ মুহূর্তে ক্ষোভ চরম আকার ধারণ করেছে বলে স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলোয় উঠে এসেছে।
শ্রীলংকার সরকারি দল ও বিরোধী দলের প্রধান ভোটব্যাংকগুলো দেশটির কৃষকদের ঘিরেই গড়ে উঠেছে। বাণিজ্য নিয়ন্ত্রণ করতে গিয়ে রাজাপাকসে সরকার দেশটিতে রাসায়নিক সার আমদানি বন্ধ করে দিয়েছে। এতে চা, ধানসহ দেশটির প্রধান ফসলগুলো উৎপাদন করতে গিয়ে বিপাকে পড়েছেন কৃষকরা। সর্বশেষ একমাত্র পরিশোধনাগারটি বন্ধ করে দেয়ায় দেশটির কৃষি খাতকে জ্বালানি তেলের সংকট নতুন করে চাপে ফেলবে বলে মনে করা হচ্ছে।
লংকান মন্ত্রিসভার মুখপাত্র ও গণমাধ্যমবিষয়ক মন্ত্রী ডুলাস আল্লাহাপেরুমা জানিয়েছেন, ক্রমবর্ধমান মূল্যস্ফীতি ও রিজার্ভ সংকটের মুখে দেশটির সরকার এখন অর্থনীতিতে বেইল আউটের সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা করছে। স্থানীয় সাংবাদিকদের তিনি বলেন, সোমবারের বৈঠকে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) এ নিয়ে সহায়তা চাওয়ার ইতিবাচক ও নেতিবাচক দিকগুলো আলোচনা হয়েছে, কিন্তু এ বিষয়ে কোনো ধরনের সিদ্ধান্তে আসা যায়নি।
বার্তা সংস্থা রয়টার্স জানিয়েছে, রিজার্ভ বৃদ্ধি ও জ্বালানি ক্রয়ের জন্য ভারতের কাছ থেকে ৫০ কোটি ডলারের ক্রেডিট লাইন নিয়ে আলোচনার প্রয়াস চালিয়ে যাচ্ছে শ্রীলংকা। গত মাসের শেষে দেশটির রিজার্ভ নেমে এসেছিল ২২৭ কোটি ডলারে। চলতি বছরের প্রথম নয় মাসে (জানুয়ারি-সেপ্টেম্বর) দেশটি জ্বালানি পণ্য আমদানিতেই অর্থ ব্যয় করেছে সবচেয়ে বেশি। ওই সময় পর্যন্ত শ্রীলংকায় জ্বালানি পণ্য আমদানি হয়েছে ৬৯ কোটি ২০ লাখ ডলারের।
শ্রীলংকার বাজারে কয়েক মাস ধরেই খাদ্যদ্রব্য সরবরাহ হচ্ছে চাহিদার তুলনায় অপ্রতুল। ফলে দেশটিতে খাদ্যপণ্যের দামও ক্রমেই বেড়েছে। রিজার্ভ সংকটসহ এ সমস্যা মোকাবেলায় প্রেসিডেন্ট গোতাবায়া রাজাপাকসে গত আগস্টে দেশটিতে খাদ্যপণ্যের জরুরি অবস্থা ঘোষণা করেন। এর পরও দেশটিতে খাদ্যপণ্য মূল্যের ঊর্ধ্বগতি থামানো যায়নি। সর্বশেষ গত অক্টোবরে দেশটিতে খাদ্য মূল্যস্ফীতি হয়েছে ১২ দশমিক ৮ শতাংশ।


