ফ্লোর প্রাইস প্রত্যাহার
বিনিয়োগকারীদের করণীয়
দীর্ঘ দেড় বছর পর তালিকাভুক্ত কোম্পানির শেয়ারদরের ওপর আরোপিত ফ্লোর প্রাইস বা সর্বনিম্ন দরসীমা প্রত্যাহার হয়েছে। এর ফলে শেয়ারের দরে যে ‘শিকল’ পরা ছিল, তা খুলেছে। শিকল খুলতেই গত দুই সপ্তাহে তালিকাভুক্ত বহু কোম্পানির শেয়ারদর ব্যাপক হারে কমছে। দরপতনের কবলে পড়ে ফ্লোর প্রাইসে আটকে থাকা শেয়ারগুলোর দর যেমন কমছে, তেমনি ফ্লোর প্রাইসের ওপরে থাকা শেয়ারও দর হারাচ্ছে। তবে এর মধ্যেও কিছু শেয়ারের দর হুহু করে বাড়ছে। এ অবস্থায় যারা শেয়ারবাজারে বিনিয়োগে নতুন বা কম অভিজ্ঞ, তারা করণীয় নির্ধারণ করতে গিয়ে হিমশিম খাচ্ছেন।
গেল দুই সপ্তাহের লেনদেন পর্যালোচনায় দেখা গেছে, অন্তত ৮০ কোম্পানির শেয়ারদর কমপক্ষে ২০ শতাংশ থেকে সর্বোচ্চ ৫০ শতাংশ পতন হয়েছে। ১০ থেকে ২০ শতাংশের কাছাকাছি দরপতন হয়েছে আরও ৬৬ কোম্পানির। বলার অপেক্ষা রাখে না, এ শেয়ারগুলোর প্রায় সবই ফ্লোর প্রাইসে আটকে ছিল।
ফ্লোর প্রাইস প্রত্যাহারের আগে থেকে যাদের কাছে দরপতনের কবলে পড়া শেয়ারগুলো আছে, তাদের অনেকেই ফ্লোর প্রাইস প্রত্যাহার করার জন্য নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিএসইসি এবং ফ্লোর প্রাইস প্রত্যাহারের পক্ষে যারা তদবির বা কথা বলেছিলেন তাদের সমালোচনা করছেন।
আবার বিপরীত চিত্রও আছে। ফ্লোর প্রাইসে পড়ে থাকা ১০-১২টি শেয়ার এরই মধ্যে প্রত্যাহার করা ফ্লোর প্রাইসকে ছাড়িয়েছে বা দর বেড়েছে। অর্থাৎ শুরুতে দরপতন হলেও ক্রেতা চাহিদায় অচিরেই ঘুরে দাঁড়িয়েছে শেয়ারগুলোর দর। সুযোগসন্ধানী বা ‘স্মার্ট’ বিনিয়োগকারীরা এমন একটা সুযোগের অপেক্ষায় ছিলেন বহুদিন। তারা দরপতন হওয়া শেয়ারগুলো এখন কিনছেন।
বিনিয়োগকারীদের করণীয় : হঠাৎ করে সব শেয়ারের দর একবারে সমন্বয় হওয়ার কারণে বাজারে এখন অস্থিরতা বেশি হবে। শেয়ারদর অনেক বাড়বে বা কমবে। এ ক্ষেত্রে যাদের আগেই শেয়ার ছিল এবং লোকসান বাড়ছে তাদের যা করণীয় তার সঙ্গে ফ্লোর প্রাইস ওঠার পর যারা শেয়ার কিনে লোকসানে আছেন, তাদের করণীয় এক নয়।
প্রথমে আসা যাক যাদের আগে থেকে শেয়ার ছিল এবং এরই মধ্যে বড় লোকসানে পড়েছেন তাদের কথায়। প্রথমত বোঝা উচিত বাজার কী অবস্থায় আছে। দেখা যাচ্ছে, ফ্লোর প্রাইস প্রত্যাহারের পর এরই মধ্যে দুই সপ্তাহ কেটেছে। এ সময়ে তালিকাভুক্ত ৩৫৬ কোম্পানি এবং ৩৭টি মিউচুয়াল ফান্ডের মধ্যে ১০ কার্যদিবসে ৫০ শতাংশ বা অর্ধেকে নেমেছে মাত্র দুই কোম্পানির শেয়ারদর। ৪০ শতাংশের ওপর দরপতন হয়েছে ১৫-২০টি শেয়ারের। যদি প্রায় প্রতিদিনই সার্কিট ব্রেকারের নিয়মে সর্বোচ্চ দরপতন হতো, তাহলে ফ্লোর প্রাইস প্রত্যাহারের সময় যে শেয়ারটির দর ১০০ টাকা ছিল, আজ তার দর ৩৫-৪০ টাকায় নামত। তেমনটি হয়নি। এর অর্থ গত দুই সপ্তাহের ১০ কার্যদিবসে অনেক শেয়ার তার তলানি পেয়েছে।
এ অবস্থায় এখনও ওই শেয়ার ধরে থাকলে শেয়ারটির দর ওঠানামা ভালোভাবে পর্যবেক্ষণ করতে হবে। যদি দেখা যায়, শেয়ারটির দর কিছুটা বেড়েছে তাহলে আরও বাড়ার সম্ভাবনা আছে কিনা তা বুঝে নিয়ে তার কাছাকাছিতে বিক্রি করে দেওয়া ভালো। সব শেয়ারের দর সহসাই যেখান থেকে পতন শুরু হয়েছিল সেখানে ফিরে যাবে, এমনটা ভাবনায় রাখা ঠিক হবে না। অর্থাৎ লোকসান মেনে নিয়ে শেয়ার বিক্রি করা উচিত। লোকসান যতটা কমিয়ে নেওয়া যায়– এমন ভাবনা থেকে বের হওয়া উচিত।
আবার যদি দেখা যায়, ক্রমাগত দরপতনের পর শেয়ারদর একটা গণ্ডির মধ্যে আটকে গেছে, তাহলে এমন হতে পারে শেয়ারটির বিক্রির চাপ এখনও কমেনি আবার এমন দরে ক্রেতাও আছে। এ অবস্থায় শেয়ারটির দর কিছুটা বাড়তেও পারে আবার কমতেও পারে। তবে এমন ক্ষেত্রে খুব বেশি দর বাড়বে এমনটা নাও হতে পারে। কী হবে সে বিষয়ে আপনি যদি ধারণা করতে না পারেন, সে ক্ষেত্রে শেয়ারটি বিক্রি করে দিতে পারেন। সিদ্ধান্ত নিতে না পারা বা সিদ্ধান্তহীনতাও বিনিয়োগে মন্দ দিক। এ অবস্থা থেকে বের হওয়া উচিত।
এখন যদি এমন অন্য কোনো শেয়ারের সন্ধান আপনার কাছে থাকে, যেটির দর বাড়তে পারে, তাহলে আগেরটি বিক্রি করে এটি কিনতে পারেন। তবে এ ক্ষেত্রেও সতর্ক থাকতে হবে। ঠিক শেয়ার পছন্দ না করতে পেরে অনেকে বারবার শেয়ার কেনাবেচা করে পুঁজি শেষ করে ফেলেন। আপনার যদি মনে হয়, বাজারের এ অস্থিরতায় শেয়ারদর ওঠানামার ধরনটা ধরতে পারছেন না, তবে আপাতত দীর্ঘ বা মধ্যমেয়াদি বিনিয়োগ করার চিন্তা করতে পারেন। বাজারে ব্যাংকসহ এমন কিছু খাতের শেয়ার রয়েছে, যেগুলোর বাজারদর খুবই কম। আরও কিছুদিন ‘ট্রেন্ডি’ শেয়ারে বাজার ঘুরপাক খেলেও কিছুটা স্থির হতে এসব শেয়ারের দর একটু হলেও বাড়বে। এতে আপনার লাভ দুটি। এক. অস্থির বাজারে লোকসানের শঙ্কা কমানো। দুই. সময় একটু বেশি লাগলেও কিছু মুনাফা নেওয়া।
এখন ফ্লোর প্রাইস প্রত্যাহারের পর যদি শেয়ার কিনে লোকসান থেকে থাকে, তবে একেবারেই ভুল শেয়ার কিনেছেন কিনা তা যাচাই করুন। যে শেয়ারগুলো ফ্লোর প্রাইস আরোপের আগে কারসাজি বা অন্য কারণে অনেকটা বেড়েছিল, সেগুলোর দরপতন হচ্ছে বেশি। এমন শেয়ার কিনে থাকলে দ্রুত তা বেচে দিয়ে আরও লোকসান কমানোই ভালো। অন্যথায় কিছুটা দর কমলেও ধৈর্য ধরে থাকুন। শেয়ারদর কিছুটা বাড়লে মুনাফা নিয়ে নিন। আপনার কাছে যদি নতুন করে বিনিয়োগ করার মতো অর্থ থাকে তবে লোকসানে থাকা শেয়ার কিনে কিছুটা গড় মূল্য কমিয়ে লোকসান কমিয়ে নিতে পারেন। অথবা ভালো শেয়ারে বিনিয়োগ করে মুনাফা করতে পারলে সাকল্যে লোকসান কমে যাবে। মনে রাখবেন এখন দু-তিনটি শেয়ারের দর অস্বাভাবিকভাবে বাড়লেও সবগুলো একইভাবে বাড়বে না। ফলে এমন মিথ্যা মরীচিকার পেছনে ছুটবেন না। এ বাজারে অনেক শেয়ারের দর ৫-১০ গুণ পর্যন্ত বাড়ে। কিন্তু খুবই অল্প কিছু মানুষ এতটা দরবৃদ্ধির সুবিধা নিতে পারেন। ৫০ শতাংশ বাড়লে কেউ দ্বিগুণ লাভ নিয়ে বিক্রি করেন।
এ ধরনের বাজার থেকে শেষ পর্যন্ত খুব কম লোকই মুনাফা নিয়ে বাড়ি ফিরতে পারেন। বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত বা কৌশল প্রত্যেকের আলাদা। কারও সঙ্গে মিলে যেতে পারে, নাও মিলতে পারে। সিদ্ধান্ত গ্রহণে অন্যের মতামত শোনা যেতে পারে। তবে শেষ সিদ্ধান্ত নিজেরই নিতে হয়। অন্যের কথায় অন্ধ অনুসরণ কখনোই করা উচিত নয়।



