বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রজ্ঞাপন নিয়ে হাইকোর্টের রুল
রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংক ছাড়া দেশের অন্য ব্যাংকগুলোর কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য বাংলাদেশ ব্যাংকের বেঁধে দেয়া সর্বনিম্ন বেতন কাঠামো-সংক্রান্ত দুটি প্রজ্ঞাপন কেন অবৈধ ঘোষণা করা হবে না, তা জানতে চেয়েছেন হাইকোর্ট। আগামী এক সপ্তাহের মধ্যে অর্থ সচিব ও বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরকে এ রুলের জবাব দিতে বলা হয়েছে। গতকাল এ-সংক্রান্ত একটি রিট আবেদনের প্রাথমিক শুনানি নিয়ে বিচারপতি মামনুন রহমান ও বিচারপতি খোন্দকার দিলীরুজ্জামানের বেঞ্চ এ রুল জারি করেছে।
বাংলাদেশ ব্যাংক এ ধরনের প্রজ্ঞাপন জারি করতে পারে কি না, সে বিষয়ে মতামত দিতে চারজন অ্যামিকাস কিউরিও নিয়োগ দিয়েছেন উচ্চ আদালত। তারা হলেন অ্যাটর্নি জেনারেল এএম আমিন উদ্দিন, জ্যেষ্ঠ আইনজীবী আজমালুল হোসেন কিউসি, রোকন উদ্দিন মাহমুদ ও প্রবীর নিয়োগী।
ব্যাংকের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সর্বনিম্ন বেতন-ভাতা নির্ধারণ করে দিয়ে চলতি বছরের ২০ জানুয়ারি প্রজ্ঞাপন করে বাংলাদেশ ব্যাংক। পরবর্তী সময়ে বেসরকারি ব্যাংক উদ্যোক্তাদের সংগঠন বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকস (বিএবি) ও ব্যাংক নির্বাহীদের সংগঠন অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স বাংলাদেশের (এবিবি) দাবির পরিপ্রেক্ষিতে বেতন কাঠামোতে সংশোধনী আনা হয়। এ নিয়ে ১ ফেব্রুয়ারি আরেকটি প্রজ্ঞাপন জারি করে বাংলাদেশ ব্যাংক।
বাংলাদেশ ব্যাংকের এ দুটি প্রজ্ঞাপন চ্যালেঞ্জ করে হাইকোর্টের সংশ্লিষ্ট শাখায় রিট আবেদন করেন পুঁজিবাজারের ব্যাংক খাতে বিনিয়োগকারী ফরহাদ বিন হোসেন। তিনি সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবীও। আদালতে তার পক্ষে শুনানি করেন আইনজীবী এএম মাসুম ও সাইফুর রহমান রাহী। রাষ্ট্রপক্ষে ছিলেন ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল বিপুল বাগমার।
শুনানির সময় রিটকারীর আইনজীবীরা আদালতকে বলেন, বাংলাদেশ ব্যাংক হলো বেসরকারি ব্যাংকের নিয়ন্ত্রক সংস্থা। তারা ব্যবস্থাপনার রীতিনীতিতে হস্তক্ষেপ করতে পারে কিন্তু বেতন নির্ধারণ করে দিতে পারে না। একেকটা প্রতিষ্ঠানে ভিন্ন ভিন্ন বেতন কাঠামো রয়েছে। এখানে তারা হস্তক্ষেপ করতে পারে না। এখন যদি ব্যাংক খাতে বাংলাদেশ ব্যাংক বেতন নির্ধারণে হস্তক্ষেপ করে তাহলে গার্মেন্টস প্রতিষ্ঠান, রিয়েল এস্টেট প্রতিষ্ঠান ছাড়াও অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের ওপর এর প্রভাব পড়বে।
প্রসঙ্গত, গত ২০ জানুয়ারি জারীকৃত এক প্রজ্ঞাপনে কেন্দ্রীয় ব্যাংক বলেছে, ব্যাংকের এন্ট্রি পর্যায়ে একজন কর্মকর্তাকে সর্বনিম্ন ২৮ হাজার টাকা বেতন দিতে হবে। শিক্ষানবিশকাল শেষে ওই কর্মকর্তার সর্বনিম্ন বেতন হতে হবে ৩৯ হাজার টাকা। ব্যাংকের নিরাপত্তা কিংবা পরিচ্ছন্নতা কর্মীদেরও সর্বনিম্ন বেতন ২৪ হাজার টাকা দিতে নির্দেশ দেয় বাংলাদেশ ব্যাংক। প্রজ্ঞাপনে কর্মী ছাঁটাই ও পদোন্নতি বিষয়েও বেশকিছু নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। চলতি বছরের ৩১ মার্চের মধ্যেই নতুন বেতন কাঠামো বাস্তবায়নের সময়সীমা বেঁধে দেয়া হয়।
প্রজ্ঞাপনটি জারির পর বেসরকারি ব্যাংকের চেয়ারম্যান ও শীর্ষ নির্বাহীরা ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া দেখান। এ নিয়ে মঙ্গলবার ভার্চুয়াল মাধ্যমে নিজেদের মধ্যে আলোচনাও করেন বেসরকারি ব্যাংক উদ্যোক্তাদের সংগঠন বিএবি ও ব্যাংক নির্বাহীদের সংগঠন এবিবি। পরে ২৬ জানুয়ারি দুই সংগঠনের প্রতিনিধিরা গভর্নর ফজলে কবিরের সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে যান। ওই সময় তারা বেতন কাঠামোর প্রজ্ঞাপনটি সংশোধনের পাশাপাশি বাস্তবায়নের সময়সীমা বাড়ানোর দাবি জানান।
দাবির মুখে ১ ফেব্রুয়ারি আগের প্রজ্ঞাপনে সংশোধনী এনে নতুন বেতন-ভাতার নতুন কাঠামো ঘোষণা করে বাংলাদেশ ব্যাংক। নতুন নির্দেশনায় বলা হয়, ব্যাংকের এন্ট্রি পর্যায়ে জেনারেল সাইডের কর্মকর্তারা শিক্ষানবিশ সময়ে ন্যূনতম বেতন-ভাতা পাবেন ২৮ হাজার টাকা। আর ক্যাশ সাইডে কর্মরতরা ন্যূনতম ২৬ হাজার টাকা বেতন-ভাতা পাবেন। এ দুই শ্রেণীর কর্মরত কর্মকর্তারা শিক্ষানবিশ কাল শেষে যথাক্রমে ৩৯ ও ৩৬ হাজার টাকা বেতন-ভাতা প্রাপ্য হবেন।
২০১৩ সালে লাইসেন্সপ্রাপ্ত চতুর্থ প্রজন্মের ব্যাংকগুলোর পাশাপাশি পরবর্তী পর্যায়ে স্থাপিত ব্যাংক এবং বাংলাদেশ কমার্স ব্যাংক ও আইসিবি ইসলামিক ব্যাংকের এন্ট্রি পর্যায়ের স্থানীয় কর্মকর্তারা নতুন বেতন-ভাতার মূল বেতন ২০২২ সালের এপ্রিল থেকে পাবেন। আর অবশিষ্ট বেতন-ভাতা পাবেন ২০২৩ সালের এপ্রিল থেকে। তবে ব্যাংক চাইলে ২০২২ সালের এপ্রিল থেকেই সব বেতন-ভাতা পরিশোধ করতে পারবে। এ ব্যাংকগুলো ছাড়া দেশে কার্যরত সব বেসরকারি ও বিদেশী ব্যাংকের কর্মকর্তাদের বেতন-ভাতার নির্দেশনা চলতি বছরের মার্চের পরিবর্তে এপ্রিলের মধ্যে কার্যকর হবে।
এন্ট্রি লেভেলের কর্মকর্তাদের পাশাপাশি ব্যাংকে কর্মরত মেসেঞ্জার, পরিচ্ছন্নতাকর্মী, নিরাপত্তাকর্মী ও অফিস সহায়কদের বেতন-ভাতার কাঠামো পুনর্বিন্যাস করেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। নতুন নির্দেশনা অনুযায়ী, ঢাকাসহ সব বিভাগীয় শহর এবং নারায়ণগঞ্জ ও গাজীপুর শহর এলাকার কর্মচারীরা ন্যূনতম ২৪ হাজার টাকা বেতন-ভাতা পাবেন। আর জেলা শহরে কর্মরত কর্মচারীদের ন্যূনতম বেতন-ভাতা হবে ২১ হাজার টাকা। এছাড়া দেশের উপজেলা ও অন্যান্য অঞ্চলে কর্মরত কর্মচারীরা ন্যূনতম ১৮ হাজার টাকা বেতন-ভাতা প্রাপ্য হবেন। আগের নির্দেশনায় সব এলাকার কর্মচারীদের ন্যূনতম বেতন-ভাতা ২৪ হাজার টাকা নির্ধারণ করা হয়েছিল।
প্রজ্ঞাপনে বাংলাদেশ ব্যাংক বলেছে, নতুন ব্যাংকগুলোর পাশাপাশি বাংলাদেশ কমার্স ব্যাংক ও আইসিবি ইসলামিক ব্যাংকের কর্মচারীদের নতুন বেতন এবং বর্তমানে প্রাপ্ত বেতনের মধ্যকার যে পার্থক্য সেটির ন্যূনতম ৫০ শতাংশ চলতি বছরের এপ্রিল থেকে পরিশোধ করতে হবে। আর অবশিষ্ট বেতনের অংশ পরিশোধ করতে হবে ২০২৩ সালের এপ্রিল থেকে। তবে দেশের অন্য ব্যাংকগুলোর কর্মচারীদের নতুন বেতন-ভাতা আগামী এপ্রিল থেকেই দিতে হবে।



