‘পড়ে আছে ১১২টি বিলাসবহুল গাড়ি’
বিদেশ থেকে আনা পাঁচ বছরের বেশি পুরনো গাড়ি নিলামে বিক্রয়ের আগে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় থেকে অনাপত্তি পত্র (সিপি) নেয়ার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) এক আদেশ অনুসারে এ সিপি সংগ্রহ করতে হয়। উল্লিখিত এ সিপি সংগ্রহ না করলে নিলামে ক্রয়কৃত গাড়ি খালাসে বাধার সম্মুখীন হতে হয় ক্রেতাদের। এমন অনিশ্চয়তা নিয়েই আজ ও আগামীকাল চট্টগ্রাম বন্দরে অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে পর্যটক সুবিধায় আনা ১১২টি বিলাসবহুল গাড়ির নিলাম প্রক্রিয়া।
চট্টগ্রাম কাস্টমসের তথ্যমতে, নিলামের অপেক্ষায় থাকা ১১২টি গাড়ির মধ্যে ৮৬টিই পাঁচ বছরের অধিক পুরনো। এ ৮৬টি গাড়ি বন্দর থেকে খালাস করে নিতে হলে ক্রেতাকে সিপি পেতে হবে। এমন পরিস্থিতিতে বিলাসবহুল এসব গাড়ির অনুকূলে সিপি প্রদানের অনুরোধ জানিয়ে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে চিঠি দিয়েছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। চিঠিতে উল্লেখ করা হয়, নিলামের অপেক্ষায় থাকা ৮৬টি গাড়ির অনুকূলে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় কর্তৃক সিপি ইস্যু করা না হলে গাড়িগুলো বিক্রি করা সম্ভব হবে না। এ ৮৬টি গাড়ি ২০০৫ সাল ও পরবর্তী সময় থেকে জব্দ করা হয়েছে। এসব গাড়ি বিক্রি করতে না পারলে সরকারি রাজস্ব পাওয়া অনিশ্চিত হয়ে পড়বে।
এর আগে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে এনবিআরকে পত্রের মাধ্যমে জানানো হয়েছিল কার্নেট ডি প্যাসেজ সুবিধার আওতায় বাণিজ্যিকভাবে আমদানীকৃত এবং নিলামকৃত গাড়ি আমদানি নীতি আদেশ পরিপন্থী হওয়ায় ছাড়করণের সুযোগ নেই। ইতোপূর্বে দেশের অন্যান্য বন্দর ব্যবহার করে একই সুবিধায় আমদানি করা গাড়ি নিলামে ক্রয়ের পর বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সিপি না পাওয়ায় তা খালাসে বাধার সম্মুখীন হয়েছিল ক্রেতারা।
চট্টগ্রাম কাস্টম হাউজের কমিশনার মোহাম্মদ ফখরুল আলম বলেন, পর্যটক সুবিধায় আসা বিলাসবহুল গাড়ি বিক্রয়ে এবার সব ধরনের প্রচেষ্টা চালানো হয়েছে। এবারই প্রথমবারের মতো ১১২ গাড়ির নিলামের জন্য গাড়ির বিস্তারিত বিবরণ ক্যাটালগে দেয়া হয়েছে। ম্যানুয়াল নিলামের পাশাপাশি সারা দেশ থেকে ব্যাপক হারে অংশগ্রহণকারীদের যুক্ত করে ন্যায্যমূল্যে এসব গাড়ি বিক্রির জন্য ই-অকশন (অনলাইন নিলাম) আয়োজন করা হয়েছে। রাষ্ট্রীয় সম্পদ যাতে নষ্ট না হয়, যৌক্তিক মূল্য যেখানে পাওয়া যাবে, আমরা সেগুলো বিশেষ বিবেচনায় নেব। এখন পাঁচ বছরের অধিক পুরনো গাড়ির ক্ষেত্রে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় থেকে সিপি ইস্যু হলে অন্য কোনো জটিলতা থাকবে না। সরকারের রাজস্ব সুরক্ষায় সিপি পাওয়ার ব্যাপারে দ্রুত সাড়া পাব বলে আমরা আশাবাদী।
বাংলাদেশী বংশোদ্ভূত ব্রিটিশ নাগরিকরা ২০১১ সালে কার্নেট ডি প্যাসেজের আওতায় বাংলাদেশে ল্যান্ড রোভার, বিএমডব্লিউ, মার্সিডিস বেঞ্জ, ল্যান্ড ক্রুজার, জাগুয়ার, লেক্সাসসহ বিভিন্ন ব্র্যান্ডের গাড়ি নিয়ে আসে। শর্ত ছিল—পর্যটক হিসেবে ছয় মাস পর্যন্ত এগুলো বাংলাদেশে ব্যবহার করতে পারবে। আবার তারা যখন বাংলাদেশ ত্যাগ করবে তখন এ গাড়িগুলো ফেরত নিয়ে যাবে। এ-সংক্রান্ত অঙ্গীকারনামা দিয়ে এ ধরনের বহু গাড়ি বন্দর থেকে খালাস নিলেও পরবর্তী সময়ে দেখা যায় এদের অধিকাংশই আর ফেরত নিচ্ছেন না; বরং স্থানীয় বাজারে অবৈধভাবে এসব গাড়ি বিক্রি করে দেয়া হচ্ছে। এমনকি শুল্কমুক্ত সুবিধায় আনা এসব গাড়ি অবৈধভাবে ভুয়া দলিল দাখিল করে রেজিস্ট্রেশনও নেয়া হয়েছে বিআরটিএ থেকে।
চট্টগ্রাম বন্দরে সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে দীর্ঘ সময় পড়ে থাকার কারণে বেশকিছু গাড়ির চাবি না থাকা, গাড়ির চাকা ও ব্যাটারি নষ্ট হয়ে যাওয়া, ইঞ্জিনে জং, গাড়ির পেছনের কাচ ভাঙা, চাকা ফেটে দেবে যাওয়া, যন্ত্রাংশে মরিচা ধরা, ডেকোরেশন নোংরা হওয়া ও গাড়ির তলদেশে জং পড়ার মতো কিছু সমস্যা রয়েছে।
গাড়ি আমদানির সঙ্গে সম্পৃক্ত ব্যবসায়ীরা বলছেন, গাড়ি বেশিদিন বসিয়ে রাখায় আর্থিক মূল্য কমে আসে। ফলে নিলাম প্রক্রিয়ায় বিক্রি করতে যত দেরি হবে ততই মূল্য হারাবে এসব গাড়ি। গাড়ি ব্যবসায়ীদের সংগঠন বারভিডার সাবেক মহাসচিব মাহবুবুল হক চৌধুরী বাবর বণিক বার্তাকে বলেন, গাড়ি বন্দরে দীর্ঘ সময় ফেলে রেখে এগুলোর আয়ুষ্কাল ফুরিয়ে যাচ্ছে। নিলামে পাওয়ার পর নিজ উদ্যোগে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় থেকে সিপি নেয়ার যে বিধান আছে, সেটি সহজ করে দিতে হবে। তাহলেই এ কারনেট গাড়ি ও সাধারণ নিলাম দ্রুত হবে।
জানা গেছে, পর্যটকদের জন্য ‘দ্য কাস্টমস কনভেনশন অন দ্য টেম্পোরারি ইমপোর্টেশন অব প্রাইভেট ভেহিকলস (১৯৫৪) অ্যান্ড কমার্শিয়াল রোড ভেহিকলস (১৯৫৬)’ নামে একটি আন্তর্জাতিক আইন আছে; সারা বিশ্বে যা ‘কারনেট দ্য প্যাসেজ’ নামে পরিচিত। এ সুবিধার আওতায় কোনো পর্যটক চাইলে বিনা শুল্কে তার গাড়ি নিয়ে যেকোনো দেশে প্রবেশ করতে পারেন। তবে শর্ত হচ্ছে, ফিরে যাওয়ার সময় গাড়িটিও সঙ্গে নিয়ে যেতে হবে। সাধারণত এক বছরের জন্য এ সুবিধা বহাল থাকে। এ সুবিধাটাই এতদিন দিয়ে আসছিল বাংলাদেশ সরকার। কিন্তু কারনেটের বিষয়ে জাতিসংঘের কোনো কনভেনশনেই স্বাক্ষর না করায় এ সুবিধা দিতে বাংলাদেশ বাধ্য নয়। বিষয়টি জানাই ছিল না সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের।
চট্টগ্রাম কাস্টমসের ডেপুটি কমিশনার মো. আল আমিন বলেন, এর আগে নিলামে বিলাসবহুল এসব গাড়ির দাম ভিত্তিমূল্যের চেয়েও অনেক কম উঠেছিল। এবার নিলাম প্রক্রিয়া অধিকতর স্বচ্ছ ও যুগোপযোগী করতে প্রচলিত পদ্ধতির পাশাপাশি ই-অকশনের ব্যবস্থা করা হয়েছে। যুক্তিসংগত দাম পেলেই গাড়ি বিক্রি করে সরকারি কোষাগারে রাজস্ব জমা দিতে প্রস্তুত কাস্টমস কর্তৃপক্ষ।



