প্রকৃতি পুনরুদ্ধারে ২৯৬ বিলিয়ন ডলার অর্থায়নের তাগিদ
প্রকৃতি পুনরুদ্ধারে বিশ্বজুড়ে উদ্যোগ বাড়লেও ২০৩০ সালের লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে প্রয়োজনীয় গতিতে এগোচ্ছে না কার্যক্রম। লক্ষ্য পূরণে বছরে প্রকৃতি পুনরুদ্ধারের অর্থায়ন বর্তমানের ৬৪ বিলিয়ন ডলার থেকে বাড়িয়ে ২৯৬ বিলিয়ন ডলারে নিতে হবে। অর্থাৎ আগামী চার বছরের মধ্যে বার্ষিক বিনিয়োগ বাড়াতে হবে চার গুণেরও বেশি।
বৃহস্পতিবার (২৯ অক্টোবর) প্রকাশিত ‘নেচারস কামব্যাক—স্কেলিং ইকোসিস্টেম রেস্টোরেশন ফর পিপল অ্যান্ড প্ল্যানেট’ শীর্ষক প্রতিবেদনটি যৌথভাবে প্রকাশ করেছে জাতিসংঘের পরিবেশবিষয়ক সংস্থা ইউএনইপি, খাদ্য ও কৃষি সংস্থা এফএও এবং জীববৈচিত্র্যবিষয়ক কনভেনশনের সচিবালয়।
জাতিসংঘের নতুন এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিশ্বের ১৪৯টি দেশে বর্তমানে ২৫ কোটি ২০ লাখ হেক্টর এলাকায় প্রকৃতি পুনরুদ্ধারের কাজ চলছে। এসব উদ্যোগের সঙ্গে যুক্ত হয়ে এরই মধ্যে ১০ লাখের বেশি পরিবেশবান্ধব কর্মসংস্থান তৈরি হয়েছে। তবে মিঠাপানির জলাভূমি, সামুদ্রিক ও উপকূলীয় বাস্তুতন্ত্র পুনরুদ্ধারে আরও বেশি মনোযোগ প্রয়োজন।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, এশিয়ায় প্রকৃতি পুনরুদ্ধারের আওতায় থাকা নথিভুক্ত এলাকার পরিমাণ ১৯ কোটি ২২ লাখ হেক্টর। অঞ্চলভিত্তিক হিসাবে এটি সবচেয়ে বড় এলাকা। তবে শুধু এই পরিসংখ্যানের ভিত্তিতে এশিয়াকে পুনরুদ্ধার কার্যক্রমে সবচেয়ে সফল বলা যাবে না। কারণ, অঞ্চলগুলোর আয়তন, পুনরুদ্ধার উদ্যোগের বিস্তার এবং তথ্য সংগ্রহ ও প্রতিবেদন তৈরির সক্ষমতায় পার্থক্য রয়েছে।
এশিয়ায় বড় উদ্যোগ, জলজ বাস্তুতন্ত্রে ঘাটতি
জাতিসংঘের প্রতিবেদন অনুযায়ী, বিশ্বে প্রকৃতি পুনরুদ্ধারের আওতায় থাকা নথিভুক্ত এলাকার মধ্যে এশিয়ার পরিমাণ সবচেয়ে বেশি। এরপর রয়েছে আফ্রিকা, যেখানে পুনরুদ্ধার কার্যক্রম চলছে ৩ কোটি ৬৩ লাখ হেক্টর এলাকায়। ইউরোপে এ পরিমাণ ৯১ লাখ হেক্টর, উত্তর ও মধ্য আমেরিকায় ৫৮ লাখ, দক্ষিণ আমেরিকায় ৫৪ লাখ এবং ওশেনিয়ায় ৩২ লাখ হেক্টর। স্থলভিত্তিক বাস্তুতন্ত্র পুনরুদ্ধারে অগ্রগতি তুলনামূলক বেশি হলেও মিঠাপানির জলাশয়, সামুদ্রিক ও উপকূলীয় বাস্তুতন্ত্রে অগ্রগতি অনেক কম।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিশ্বের ৬২টি দেশে ১ কোটি ১০ লাখ হেক্টর মিঠাপানির বাস্তুতন্ত্র এবং ৪৬টি দেশে ৫৭ লাখ হেক্টর সামুদ্রিক ও উপকূলীয় এলাকা পুনরুদ্ধারের আওতায় রয়েছে। বিশেষ উদ্বেগের বিষয়, এসব জলজ বাস্তুতন্ত্র দ্রুত অবক্ষয়ের শিকার হলেও পুনরুদ্ধারের অগ্রগতি সম্পর্কে তথ্য তুলনামূলকভাবে সীমিত। ফলে বাস্তবে চলমান উদ্যোগের পরিমাণ প্রতিবেদনে উঠে আসা হিসাবের চেয়েও বেশি হতে পারে।
জাতিসংঘের বৈশ্বিক লক্ষ্য অনুযায়ী, ২০৩০ সালের মধ্যে অবক্ষয়িত স্থলভাগ, মিঠাপানির জলাভূমি, সামুদ্রিক ও উপকূলীয় বাস্তুতন্ত্রের অন্তত ৩০ শতাংশকে কার্যকর পুনরুদ্ধারের আওতায় আনতে হবে। এ লক্ষ্য অর্জনে শুধু গাছ লাগানো নয়, বরং ক্ষতিগ্রস্ত বাস্তুতন্ত্রের কার্যকারিতা ফিরিয়ে আনা এবং দীর্ঘমেয়াদে তা সংরক্ষণ করা জরুরি।
নদী, হাওর, জলাভূমি, বন ও উপকূলীয় এলাকার ওপর বাংলাদেশের মানুষের জীবিকা, কৃষি, মৎস্যসম্পদ এবং প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলার সক্ষমতা অনেকাংশে নির্ভরশীল। এসব এলাকার বাস্তুতন্ত্র ক্ষতিগ্রস্ত হলে তার প্রভাব পড়ে খাদ্য উৎপাদন, জীববৈচিত্র্য, পানি ব্যবস্থাপনা ও স্থানীয় মানুষের আয়ের ওপর। এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলে বন ও ভূদৃশ্য পুনরুদ্ধারেও বাংলাদেশের অংশগ্রহণ রয়েছে।
এফএওর তথ্য অনুযায়ী, সংস্থাটি বাংলাদেশসহ ছয়টি দেশে বন ও ভূদৃশ্য পুনরুদ্ধার কার্যক্রম সম্প্রসারণে কারিগরি সহায়তা দিচ্ছে। একই অঞ্চলের ২২টি দেশ ২০৩০ সালের মধ্যে সম্মিলিতভাবে অন্তত ১০ কোটি হেক্টর অবক্ষয়িত ভূদৃশ্য পুনরুদ্ধারের উদ্যোগে যুক্ত হয়েছে। বাংলাদেশে এ ধরনের উদ্যোগের গুরুত্ব বোঝাতে উত্তরাঞ্চলের খরাপ্রবণ বরেন্দ্র অঞ্চল, হাওরাঞ্চলের জলাভূমি এবং দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের উপকূলীয় বনভূমির কথা উল্লেখ করা যায়।
ইউএনইপির তথ্য অনুযায়ী, ২০২০ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত বাস্তবায়িত একটি প্রকল্পে বরেন্দ্র ও হাওর এলাকায় ১৮০ হেক্টর অবক্ষয়িত শুষ্কভূমি, উঁচু ভূমি ও জলাভূমির বন পুনর্বাসনের কাজ করা হয়। প্রকল্পটির আওতায় প্রায় ছয় হাজার মানুষ উপকৃত হওয়ার কথা জানানো হয়েছে। এছাড়া বাংলাদেশের উপকূলে ম্যানগ্রোভ বা লবণসহিষ্ণু উপকূলীয় বন পুনরুদ্ধার নিয়ে নতুন উদ্যোগের প্রয়োজনীয়তা সামনে এসেছে। ২০২৬ সালের আগস্টে ঢাকায় অনুষ্ঠিত এক জাতীয় পরামর্শ সভায় উপকূলীয় এলাকার কোন কোন স্থানে ম্যানগ্রোভ পুনরুদ্ধার সবচেয়ে বেশি সুফল দিতে পারে, তা চিহ্নিত করার বিষয়ে আলোচনা হয়। উদ্যোগটির লক্ষ্য জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ, জলবায়ু সহনশীলতা বৃদ্ধি এবং স্থানীয় মানুষের জীবিকার উন্নয়ন।
তবে বাংলাদেশের জন্য কত হেক্টর এলাকা পুনরুদ্ধার করা হয়েছে, কতটুকু অবক্ষয়িত বাস্তুতন্ত্র কার্যকরভাবে পুনরুদ্ধারের আওতায় এসেছে এবং ২০৩০ সালের লক্ষ্য অর্জনে কত অর্থ প্রয়োজন। জাতিসংঘের নতুন প্রতিবেদনে বাংলাদেশের জন্য আলাদা করে এসব পরিসংখ্যান দেওয়া হয়নি।
জাতিসংঘের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রকৃতি পুনরুদ্ধারে বছরে বৈশ্বিক অর্থায়ন ৬৪ বিলিয়ন ডলার থেকে বাড়িয়ে ২০৩০ সালের মধ্যে ২৯৬ বিলিয়ন ডলারে নিতে হবে। এ বিনিয়োগের বড় অংশ প্রয়োজন কৃষিবনায়ন, পুনরুদ্ধারভিত্তিক বনায়ন, পিটল্যান্ড বা পিটসমৃদ্ধ জলাভূমি এবং সিগ্রাস বা সামুদ্রিক ঘাস পুনরুদ্ধারে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, কৃষিবনায়নে বছরে আনুমানিক ৮৭ বিলিয়ন ডলার, পুনরুদ্ধারভিত্তিক বনায়নে ৫২ বিলিয়ন ডলার, পিটল্যান্ড পুনরুদ্ধারে ৪৪ বিলিয়ন ডলার এবং সামুদ্রিক ঘাস পুনরুদ্ধারে ২৮ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ প্রয়োজন।
প্রকৃতি পুনরুদ্ধারকে শুধু পরিবেশগত ব্যয় হিসেবে দেখার পরিবর্তে কর্মসংস্থান, খাদ্য ও পানির নিরাপত্তা এবং জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতি মোকাবিলার বিনিয়োগ হিসেবে বিবেচনার আহ্বান জানিয়েছে জাতিসংঘ। প্রতিবেদনটির পূর্বাভাস অনুযায়ী, প্রয়োজনীয় বিনিয়োগ নিশ্চিত করা গেলে ২০৩০ সালের মধ্যে বিশ্বজুড়ে আরও প্রায় ৩ কোটি ২০ লাখ কর্মসংস্থান তৈরি হতে পারে।
বাংলাদেশের ক্ষেত্রে এ লক্ষ্য অর্জনে সরকারি বরাদ্দ, উন্নয়ন সহযোগীদের অর্থায়ন, বেসরকারি খাতের অংশগ্রহণ এবং স্থানীয় জনগোষ্ঠীর সম্পৃক্ততা গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। তবে কোন খাতে কত অর্থ প্রয়োজন, কোন প্রকল্পে কতটুকু অগ্রগতি হয়েছে এবং বিনিয়োগের সুফল কীভাবে পরিমাপ করা হবে—তা নির্ধারণে স্বচ্ছ তথ্য ও নিয়মিত পর্যবেক্ষণ প্রয়োজন।



