বাদ পড়ছেন সিইও রাশেদ বিন আমান, বোর্ড ভেঙ্গে দেয়ার দাবি
‘পারিবারিক দ্বন্দ্বে জ্বলছে সোনালী লাইফ’

 

জিনান মাহমুদ :

উষ্ণ শীতের দিনগুলোও পুড়ছে প্রতিক্ষণ। মূলত, দ্বন্দ্ব স্বামী-স্ত্রীর। সমস্যাটা পারিবারিক। যোগ হয়েছেন শ্বশুড়সহ অন্যান্য সদস্যরা। আর পারিবারিক দ্বন্দ্বের আঁচ লেগেছে বীমা প্রতিষ্ঠানে। উত্তাপে জ্বলছে সোনালী লাইফ। একে একে ফাঁস হচ্ছে, নানা অপকর্ম। অনৈতিক সম্পর্ক আর অশ্লিল কর্মকান্ড থেকে শুরু করে অনিয়ম, দুনীর্তি ও অর্থ লোপাট- সব কিছু এখন প্রকাশ্যে। দেশব্যাপী এখন তুমুল আলোচনা-সমালোচনায়, শীর্ষে থাকা এই জীবন বীমা প্রতিষ্ঠানটি।

সোনালী লাইফ ইন্স্যুরেন্স কোম্পানীতে পরিচালক হচ্ছেন ২০ জন। এরা প্রায় সবাই চেয়ারম্যান মোস্তফা গোলাম কুদ্দুস পরিবারের সদস্য। বড় মেয়ে প্রতিষ্ঠানের ভাইস চেয়ারপার্সন ফৌজিয়া কামরুন তানিয়া। তাঁর স্বামী হলেন সিইও মীর রাশেদ বিন আমান। মোস্তফা গোলাম কুদ্দুসের স্ত্রী ফজলেতুন নেছা, বড় ছেলে মোস্তফা কামরুস সোবহানের স্ত্রী সাফিয়া সোবহান চৌধুরী এবং ছোট মেয়ে তাসনিয়া কামরুন আনিকার স্বামী শেখ মোহাম্মদ পরিচালক হন। অভিনব জালিয়াতিতে আশ্রয় নিয়ে কুদ্দুস পরিবারের অন্য সদস্যরাও পরিচালক ও শেয়ারহোল্ডার হয়েছেন। পারিবারিকভাবে গিলে খাওয়া অগ্রসমান এই বীমা প্রতিষ্ঠানটি ধীরে ধীরে অনিয়ম, দূনীর্তি ও লুটপাটের আখড়ায় পরিণত হয়।

কোনো রকমের বিনিয়োগ ছাড়াই চেয়ারম্যান হওয়া, পারিবারিক কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা, নিয়মহীন পরিচালক বানানো, মূলধন লোপাট, ফ্লোর ক্রয়ের নামে অর্থ লোপাট, অতিরিক্ত লভ্যাংশ গ্রহণ- কোটি কোটি টাকার ভাগবাটোয়ারা এবং প্রতিষ্ঠান পরিচালনা নিয়ে ধীরে ধীরে পরিচালক হিসেবে নিযুক্ত স্বজনদের মাঝে মতবিরোধ ও কোন্দল ছড়িয়ে পড়ে।

আপদমস্তক জাল-জালিয়াতিতে গ্রাস করা কোম্পানির চেয়ারম্যান-পরিচালকরা অবৈধভাবে বেতনভাতা গ্রহণ হতে শুরু করে, অবৈধ সকল সুযোগ-সুবিধা ভোগে মেতে উঠেন। আইডিআরএ’র প্রজ্ঞাপন অমান্য করে বিলাসবহুল গাড়ি ক্রয় ও রক্ষণাবেক্ষণ বিল, বিদেশে চিকিৎসার যাবতীয় খরচ, নিয়মহীন পরিবারের সদস্যদের ভ্রমণ ও শপিং খরচ, কোম্পানির তহবিল থেকে বিদেশে পড়ালেখার খরচ- নানা উপায়ে বিভিন্নভাবে কোম্পানির কোটি কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগ উঠে।

কোরবানির গরু ক্রয়, পারিবারিক অনুষ্ঠান, বিবাহের উপহার, দুপুরের খাবার-সন্ধ্যার নাস্তার বিল কিংবা ব্যক্তিগত খরচ- কোটি কোটি টাকা সব নেয়া হয়েছে সোনালী লাইফ থেকে।  লুটের টাকার হিসেব এবং ভাগবাটোয়ারা থেকেই আত্মীয়-স্বজনদের মাঝে মতবিরোধ ও দ্বন্দ্ব প্রকাশ্যে রুপ নেয়। অস্থিরতা ছড়িয়ে পরে প্রতিষ্ঠান জুড়ে। সবশেষ, সিইও রাশেদ বীন আমানের বির্তকিত কর্মকান্ড ও অশ্লিল ছবি সামনে আসলে পারিবারিক সমস্যা আরো তীব্র হয়। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সিইওর ব্যক্তিগত জীবনের আপত্তিকর ছবি ভাইরাল হলে সিইও-ভাইস চেয়ারম্যান সম্পর্কর অবনতি হয়ে বিচ্ছেদে রুপ নেয়। যার ধারাবাহিকতায় বিশেষ একটি পক্ষ গণমাধ্যমের কাছে কুদ্দুস পরিবারের অপরাধ-অপকর্ম ও লুটপাটের সকল তথ্য ফাঁস করেন।

একের পর এক সংবাদ প্রকাশ হলে বীমা খাতে সারাদেশে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠে সোনালী লাইফ। ঘুম ভাঙ্গে বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ’র। অনিয়ম তদন্তে নড়ে-চড়ে বসে আইডিআরএ। গত ৩১ ডিসেম্বর অডিট ফার্ম হুদাভাসী চৌধুরী এন্ড কোং-কে নিরীক্ষক নিয়োগ দিয়েছে ৩০ দিনের মধ্যে তদন্ত কার্যক্রম সম্পন্নের। নিরীক্ষা প্রতিষ্ঠান সোনালী লাইফের ১৭টি অনিয়ম খতিয়ে দেখতে তদন্ত করবে।

তবে এই তদন্ত নিয়ে- একাধিক বীমা প্রতিষ্ঠানের সিইওদের দাবী, সোনালী লাইফে পরিচালনা পর্ষদ ভেঙ্গে দেয়ার। তাদের মতে, সঠিক ও স্বচ্ছ তদন্ত করতে হলে বোর্ড ভাঙ্গা জরুরী। আর তাহলেই সকল অনিয়ম-কুকীর্তি বেড়িয়ে আসবে। বীমা খাতে লুটপাট রুখতে হলে সঠিক তদন্ত রির্পোট এবং যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণের কোন বিকল্প নেই।

পারিবারিক সমস্যার রেশ- পুরো প্রতিষ্ঠানকে চ্যালেঞ্জের মুখে দাঁড় করিয়েছে। দিন দিন জটিল হচ্ছে আভ্যন্তরীণ পরিস্থিতি। সূত্র জানিয়েছে, সড়িয়ে দেয়া হচ্ছে সিইও রাশেদ বিন আমানকে। এখন তিনি কয়েকদিন অফিসে অনুপস্থিত। কোম্পানির চেয়ারম্যান বরাবর ছুটি চেয়ে আবেদনপত্র পাঠিয়েছেন। এমনকি, ২ জানুয়ারি থেকে সিইও (ভারপ্রাপ্ত) হিসেবে সহকারী এজেন্সী পরিচালক মো. রফিকুল ইসলাম দায়িত্ব পালন করছেন। কোম্পানীর সিগনেটরিও নেই মীর রাশেদ বিন আমানের। অফিসে প্রবেশ করতেও তাকে বাধা দেওয়া হয়। ভবনের লিফট বন্ধের পাশাপাশি সিইওর অফিস কক্ষও তালাবদ্ধ রাখা হয়। সোনালী লাইফের ই-মেইল ও ইআরপিতে লগইন করতে দেওয়া হচ্ছে না রাশেদকে। টাকা উত্তোলনে যুক্ত করা হয়েছে নতুন সিগনেটরি। সোনালী লাইফের তহবিল থেকে বিল-ভাতার চেক সই করছেন চেয়ারম্যানের মেয়ে ও পরিচালক ফৌজিয়া কামরুন তানিয়া ও অপর মেয়ে জামাই শেখ মোহাম্মদ ড্যানিয়েল। এমনিতেই বীমা খাতে সুশাসনের অভাব স্পষ্ট।  সে ক্ষেত্রে এখন কোন পথে আইন ভঙ্গ করা প্রতিষ্ঠান সোনালী লাইফ- এমন প্রশ্ন সবার।

এ বিষয় বক্তব্য নেয়ার চেষ্টা করা হলে চেয়ারম্যান, ভাইস চেয়ারম্যান এবং সিইও কাউকে মুঠো ফোনে পাওয়া যায়নি।

সম্পর্কিত খবর