জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে হুমকিতে তেল-গ্যাসের মজুদ

জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে বিশ্বের বেশির ভাগ অপরিশোধিত জ্বালানি তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাসের ভূগর্ভস্থ মজুদ হুমকির মধ্যে রয়েছে। ক্রমাগত জলোচ্ছ্বাস, ঘূর্ণিঝড়, বন্যা এবং চরম তাপমাত্রা বৃদ্ধি জীবাশ্ম জ্বালানি খাতকে অনিশ্চয়তার দিকে ঠেলে দিচ্ছে। ঝুঁকি পরামর্শক প্রতিষ্ঠান ভেরিস্ক মেপ্লেক্রফটের সাম্প্রতিক এক গবেষণায় এ তথ্য উঠে এসেছে।

যুক্তরাজ্যভিত্তিক প্রতিষ্ঠানটি গবেষণা নোটে জানায়, বৈরী আবহাওয়ার কারণে ৬০ হাজার কোটি ব্যারেলের সমপরিমাণ অপরিশোধিত জ্বালানি তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাস মারাত্মক ক্ষতির মুখে পড়তে পারে। অর্থাৎ জলবায়ু পরিবর্তন ঠেকাতে না পারলে বৈশ্বিক উত্তোলনযোগ্য মজুদের ৪০ শতাংশই নষ্ট হয়ে যেতে পারে। এর মধ্যে শীর্ষ উত্তোলক দেশ সৌদি আরব, ইরাক ও নাইজেরিয়া সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে। ঝুঁকিতে থাকা বাণিজ্যিক উত্তোলনযোগ্য মজুদের ১৯ শতাংশই রয়েছে এ তিন দেশে।

জলবায়ু পরিবর্তনজনিত জ্বালানি তেল ও গ্যাস সরবরাহ হুমকি এরই মধ্যে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। চলতি বছর প্রচণ্ড ঠাণ্ডা আবহাওয়ার কারণে যুক্তরাষ্ট্রের জ্বালানি তেল উত্তোলন কমে তিন বছরের সর্বনিম্নে নেমেছে। তার ওপর আগস্টে মেক্সিকো উপসাগরে ঘূর্ণিঝড় আইডার আঘাতে নজিরবিহীন বিপর্যয় দেখা দেয় দেশটির জ্বালানি তেল ও গ্যাস শিল্পে। অন্যদিকে রাশিয়ায় অতিরিক্ত গরম আবহাওয়া দেশটির উত্তরাঞ্চলের তেল ও গ্যাস উৎপাদনে ব্যাপক নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।

আবহাওয়ায় ভারসাম্যহীন অবস্থা ধারাবাহিক রূপ নিতে শুরু করেছে এবং চরম আকার ধারণ করছে। এমন পরিস্থিতি জ্বালানি শিল্পের জন্য অশনিসংকেত বয়ে আনছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। ভেরিস্ক মেপ্লেক্রফটের গবেষণার তথ্য বলছে, মূল ভূখণ্ডের অভ্যন্তরে থাকা (অনশোর) জ্বালানি তেল ও গ্যাস উত্তোলন কার্যক্রমে পুরোপুরিভাবে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব পড়ছে। এর মধ্যে রয়েছে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, ঝড়, দাবদাহ, বন্যা এবং অন্যান্য ভয়াবহ প্রাকৃতিক দুর্যোগের প্রভাব। অন্যদিকে ট্রপিক্যাল সাইক্লোন এবং চরম মাত্রায় সামুদ্রিক ঢেউয়ের উচ্চতা বৃদ্ধি সাগরে (অফশোর) জ্বালানি তেল ও গ্যাস উত্তোলন কার্যক্রমকে ব্যাহত করছে।

গবেষণার তথ্যমতে, বৈশ্বিক বাণিজ্যিক উত্তোলনযোগ্য মজুদের ১০ দশমিক ৫ শতাংশই চরম পর্যায়ের ঝুঁকিতে রয়েছে। ২৯ দশমিক ৫ শতাংশ মজুদ রয়েছে উচ্চ পর্যায়ের ঝুঁকিতে।

মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর আফ্রিকা অঞ্চলে বিশ্বের সবচেয়ে বড় ভূগর্ভস্থ জ্বালানি তেল ও গ্যাসের মজুদ রয়েছে। কিন্তু এ অঞ্চলই জলবায়ু পরিবর্তনের সবচেয়ে বড় ঝুঁকিতে রয়েছে। এ অঞ্চলের নেতৃস্থানীয় দেশ সৌদি আরব দাবদাহ, মরুঝড়, পানিস্বল্পতাসহ নানা প্রতিবন্ধকতার মধ্যে রয়েছে।

দ্বিতীয় শীর্ষ ঝুঁকিতে রয়েছে আফ্রিকা। যদিও এখানকার উত্তোলনযোগ্য মজুদ অঞ্চল বিশ্বের অন্যান্য অঞ্চলের তুলনায় ছোট। এ অঞ্চলের ৭২ শতাংশ মজুদই নাইজেরিয়ায়। জলবায়ু পরিবর্তনের উচ্চ মাত্রার ঝুঁকিতে রয়েছে দেশটি।

অন্যদিকে প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে বিপাকে পড়েছে ভূগর্ভস্থ মজুদের মালিকানায় থাকা কোম্পানিগুলো। জ্বালানি উত্তোলনে বাড়ছে ব্যয়। প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে প্রায়ই ক্ষতির মুখে পড়ছে তেল ও গ্যাসক্ষেত্র এবং সংশ্লিষ্ট অবকাঠামো। বাড়ছে দুর্ঘটনার ঝুঁকি।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ না করলে জলবায়ু পরিবর্তনের মারাত্মক প্রভাব থেকে মুক্তি পাওয়া সম্ভব নয়। এক্ষেত্রে বিশ্বের উন্নত দেশগুলো কার্বন নিঃসরণ শূন্যে নামিয়ে আনার যে পরিকল্পনা নিয়েছে তা যথাযথভাবে বাস্তবায়ন হওয়া জরুরি। এজন্য প্রয়োজন নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে ঊর্ধ্বমুখী বিনিয়োগ।

 

সম্পর্কিত খবর