ছুটির দিনেও চট্টগ্রাম বন্দরে পণ্য খালাসে ধীরগতি
রাজস্ব আদায় ও পণ্য খালাসে গতি বাড়াতে শুক্র ও শনিবারও চালু রাখা হয়েছে চট্টগ্রাম বন্দর ও কাস্টমস হাউস। তবে সংশ্লিষ্ট সব সংস্থা পূর্ণাঙ্গভাবে কার্যক্রম পরিচালনা না করায় ছুটির দিনে পণ্য খালাস স্বাভাবিক কর্মদিবসের তুলনায় কম হচ্ছে বলে জানিয়েছেন ব্যবসায়ী ও সিঅ্যান্ডএফ এজেন্টরা।
কাস্টমস কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, সাপ্তাহিক ছুটির দুই দিনে চট্টগ্রাম কাস্টমস হাউসে ১ হাজার ৩২৮টি বিল অব এন্ট্রি নোটিং হয়েছে। এর মধ্যে ৩১টি চালানের শুল্কায়ন থেকে রাজস্ব আদায় হয়েছে ৫ কোটি ১৫ লাখ টাকা।
চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের তথ্য বলছে, শুক্রবার (১৮ সেপ্টেম্বর) সকাল ৮টা থেকে শনিবার সকাল ৮টা পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টায় বন্দর থেকে ২ হাজার ৪২৩ একক পণ্য সরবরাহ হয়েছে। অথচ স্বাভাবিক কর্মদিবসে এ সংখ্যা থাকে প্রায় সাড়ে ৩ হাজার থেকে সাড়ে ৪ হাজার একক। একই সময়ে বন্দর ৬ হাজার ৯২ একক কনটেইনার হ্যান্ডলিং করেছে। স্বাভাবিক সময়ে দৈনিক হ্যান্ডলিং হয় গড়ে প্রায় ৭ হাজার ৫০০ একক।
কাস্টমস কর্মকর্তা শরীফ আল আমিন জানান, চলতি অর্থবছরে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) ১ লাখ ৩২ হাজার কোটি টাকা রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে। গত অর্থবছরে আদায় হয়েছিল প্রায় ৮২ হাজার কোটি টাকা। লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের অংশ হিসেবে শুক্র ও শনিবারও শুল্কায়ন কার্যক্রম চালু রাখা হয়েছে।
তিনি বলেন, শুধু শনিবার ১ হাজার ৩২২টি বিল অব এন্ট্রি নোটিং হয়েছে। স্বাভাবিক কর্মদিবসে এ সংখ্যা গড়ে ২ হাজার থেকে ২ হাজার ২০০টি।
তবে বিল অব এন্ট্রি নোটিংয়ের পর শুল্কায়ন, শুল্ক-কর পরিশোধ, শিপিং এজেন্টের কাছ থেকে ডেলিভারি অর্ডার সংগ্রহ এবং বন্দর থেকে পণ্য সরবরাহসহ বেশ কয়েকটি ধাপ সম্পন্ন করতে হয়। ফলে কাস্টমস ও বন্দর খোলা থাকলেও সংশ্লিষ্ট অন্য সংস্থাগুলো সক্রিয় না থাকলে পুরো প্রক্রিয়ায় গতি আসে না।
চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের সচিব সৈয়দ রেফায়েত হামিম বলেন, বন্দর ২৪ ঘণ্টা ও বছরের ৩৬৫ দিনই চালু থাকে। ছুটির দিনে পণ্য সরবরাহ কম হওয়ার জন্য বন্দর এককভাবে দায়ী নয়। পণ্য সরবরাহ অনেকাংশে আমদানিকারকের ওপর নির্ভর করে।
তিনি জানান, কোনো আমদানিকারক শুক্রবার এলেও সেদিন পণ্য নিতে পারবেন। তবে অনেক সময় ট্রাকের সংকটের কারণে পণ্য নিতে দেরি হয়। পণ্য খালাসের সঙ্গে একাধিক পক্ষ জড়িত থাকায় সবাই কর্মদিবসের মতো সক্রিয় থাকলে সরবরাহ কম হওয়ার কারণ থাকার কথা নয়।
ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, কাস্টমস ও বন্দর খোলা থাকলেও ব্যাংক, শিপিং এজেন্ট, ফ্রেইট ফরওয়ার্ডার, সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট ও আমদানিকারকদের কার্যক্রম সীমিত থাকলে পণ্য খালাসের পুরো প্রক্রিয়ায় কাঙ্ক্ষিত গতি আসবে না। আমদানি-রপ্তানি কার্যক্রমের সঙ্গে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে অন্তত ২৬টি সংস্থা জড়িত।
ব্যবসায়ী সৈয়দ মোহাম্মদ আরিফ বলেন, সাত দিন কাস্টমস খোলা রাখলে স্বাভাবিক কর্মদিবসের মতো জনবল ও প্রয়োজনীয় সুবিধা নিশ্চিত করতে হবে। বিশেষ করে ব্যাংকিং সেবা চালু থাকা জরুরি, কারণ শুল্ক-কর পরিশোধের সঙ্গে ব্যাংক সরাসরি যুক্ত।
চট্টগ্রাম সিঅ্যান্ডএফ অ্যাসোসিয়েশনের সাবেক সাধারণ সম্পাদক কাজী মাহমুদ ইমাম বলেন, রাজস্ব আদায় ও সেবা বাড়ানোর উদ্যোগ ইতিবাচক হলেও বাস্তবায়নে কিছু সীমাবদ্ধতা রয়েছে। প্রতিটি কাস্টমস সেকশনের নিজস্ব মূল্যায়ন পদ্ধতি, এসআরও ও বিধিবিধান রয়েছে। এক সেকশনের কর্মকর্তাকে অন্য সেকশনে দায়িত্ব দিলে সংশ্লিষ্ট নিয়মকানুন সম্পর্কে পর্যাপ্ত অভিজ্ঞতার ঘাটতি থাকতে পারে।
ছুটির দিনে সীমিত জনবল এবং এক সেকশনের কর্মকর্তাকে অন্য সেকশনে দায়িত্ব দেওয়ার বিষয়েও আপত্তি জানিয়েছেন সিঅ্যান্ডএফ এজেন্টরা।
এদিকে, চলতি অর্থবছরের প্রথম দুই মাসেই রাজস্ব আদায়ে বড় ঘাটতি তৈরি হয়েছে। এ সময়ে লক্ষ্যমাত্রা ছিল ২১ হাজার ৫৩০ কোটি টাকা। বিপরীতে আদায় হয়েছে ১৪ হাজার ১৭ কোটি ৩৪ লাখ টাকা। ফলে ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ৭ হাজার ৫১২ কোটি ৬৬ লাখ টাকা।
কাস্টমস কর্তৃপক্ষের আশা, ছুটির দিনেও কার্যক্রম চালু রাখার ফলে আগামী মাসগুলোতে রাজস্ব আদায় বাড়বে। তবে ব্যবসায়ীদের মতে, শুধু বন্দর ও কাস্টমস খোলা রাখলেই কাঙ্ক্ষিত সুফল মিলবে না। পণ্য খালাসের সঙ্গে যুক্ত সব সংস্থাকে সমন্বিতভাবে সেবা নিশ্চিত করতে হবে।



