কর আহরণ প্রক্রিয়া সহজ করতে অটোমেশন জরুরি
করহার কিংবা কর প্রদান নয়; বরং কর আহরণ প্রক্রিয়া নিয়ে সমস্যার সম্মুখীন হতে হচ্ছে ব্যবসায়ীদের। প্রক্রিয়াগত জটিলতার কারণে সময় ও আর্থিক দিক থেকে হয়রানি ও ক্ষতির মুখে পড়ছেন তারা। তাই বিড়ম্বনা এড়াতে কর আহরণ প্রক্রিয়ার সহজীকরণে বড় আকারের অটোমেশন জরুরি হয়ে পড়েছে।
গতকাল জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) এক প্রাক-বাজেট আলোচনায় মেট্রোপলিটন চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজের (এমসিসিআই) পক্ষ থেকে বিষয়টি তুলে ধরা হয়। রাজধানীর সেগুনবাগিচায় এনবিআরের সম্মেলন কক্ষে আগামী বাজেট সামনে রেখে এ আলোচনার আয়োজন করা হয়।
অনুষ্ঠানে এমসিসিআই সভাপতি সাইফুল ইসলাম বলেন, এমসিসিআই সবসময়ই একটি উন্নত রাজস্ব ব্যবস্থাপনা পদ্ধতি চালুকরণে গুরুত্ব আরোপ করে আসছে। বাজেট প্রস্তাবের মধ্যে সবসময়ই বাজেট ব্যবস্থাপনা অধিকতর গতিশীল করার দিকে জোর দিয়ে থাকে। এমসিসিআই বিশ্বাস করে যে বাজেট ব্যবস্থাপনা গতিশীল ও স্বচ্ছ হলে ব্যবসায়ীরা স্বপ্রণোদিত হয়ে রাজস্ব দেবেন। এমসিসিআই তাদের বাজেট প্রস্তাবে সামগ্রিক কল্যাণ তথা দেশের কল্যাণ ও ব্যবসায়ীদের কল্যাণ চিন্তা করে।
প্রস্তাবে তিনি আরো বলেন, বিগত অর্থবছরে প্রায় সব ক্ষেত্রে করপোরেট করহার গত দুই বছর আড়াই শতাংশ করে ৫ শতাংশ পর্যন্ত কমানো হয়েছে। সেজন্য আমরা সরকারের নীতিনির্ধারক ও এনবিআরের সংশ্লিষ্ট সবাইকে ধন্যবাদ জানাচ্ছি। আশা রাখি, ভবিষ্যতে এ করহার পার্শ্ববর্তী দেশগুলোর সমপর্যায়ে উন্নীত হবে। কিন্তু আমাদের দেশে কার্যকরী করপোরেট করহার অনেক বেশি। এখানে অননুমোদিত ব্যয় এবং উৎসেকর এত বেশি যে আমরা ব্যবসায়ীরা এ করপোরেট করহারের ৫ শতাংশ কমানোর সুবিধা ভোগ করতে পারছি না। বাস্তবে এ করপোরেট করহার পাবলিক লিমিটেড কোম্পানি ও প্রাইভেট লিমিটেড কোম্পানির ক্ষেত্রে আর নির্দিষ্ট থাকে না, তা ক্ষেত্রবিশেষে ৪০ শতাংশ থেকে ৫০ শতাংশ পর্যন্ত হয়ে যায়। সুতরাং বিষয়টি আবারো ভেবে দেখার জন্য চেয়ারম্যান মহোদয়কে অনুরোধ জানাচ্ছি।
আলোচনায় অংশ নিয়ে এমসিসিআইয়ের সাবেক সভাপতি ব্যারিস্টার নিহাদ কবির বলেন, প্রতিবেশী দেশের তুলনায় বাংলাদেশে করপোরেট করহার এখনো বেশি। শিল্প খাতকে প্রতিযোগিতা করতে হলে এ হার কমাতে হবে। স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উত্তরণের পর দেশের করকাঠামো কেমন হবে, তা নিয়ে এখন থেকে কাজ শুরু করতে হবে। যারা ট্যাক্স ফাঁকি দেয় তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে। সৎ ব্যবসায়ীরা যাতে হয়রানির শিকার না হন, সেজন্য এনবিআরের চেয়ারম্যানকে বিশেষ অনুরোধ করেন তিনি।
এমসিসিআই নির্বাহী কমিটির সদস্য সৈয়দ নাসিম মঞ্জুর বলেন, পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতে উৎপাদনমুখী যেসব শিল্প খাত কর্মসংস্থান সৃষ্টি করে, তাদের জন্য কম হারে কর নির্ধারণ করা আছে।
এমসিসিআই সদস্য হাবিবুল্লাহ করিম বলেন, করদাতা ও গ্রহীতার মধ্যে দূরত্ব আছে। এ দূরত্ব কমাতে হবে। উভয়ের মধ্যে এক ধরনের অবিশ্বাস কাজ করে। কর্মকর্তাদের আচরণ এমন যেন সব ব্যবসায়ী ট্যাক্স ফাঁকি দেন। এ মানসিকতা দূর করতে হবে।
অটোমেশনের প্রস্তাবের পরিপ্রেক্ষিতে এনবিআর চেয়ারম্যান আবু হেনা মো. রহমাতুল মুনিম বলেন, অটোমেশনের বিষয়টি দ্বিপক্ষীয়। কর সংগ্রহকারী ও কর প্রদানকারী—উভয় পক্ষকে অটোমেশন প্রক্রিয়ায় আনতে হবে। এ বিষয়ে এরই মধ্যে বিভিন্ন উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। ক্রমান্বয়ে সমগ্র প্রক্রিয়ায় আনা হবে।
কর কমানো বিষয়ে তিনি বলেন, পরপর দুই অর্থবছর করপোরেট কর কমানো হয়েছে। বর্তমানে করপোরেট কর ৩০ শতাংশ। আমি মনে করি, করপোরেট কর আরো কমানোর যৌক্তিকতা আছে, কিন্তু একটা ঝুঁকি আছে। রাজস্ব কমে যেতে পারে। কর আরো কমালে যে অভিঘাত আসবে, তা সইবার মতো ক্ষমতা আছে কিনা, ভেবে দেখতে হবে। করহার আস্তে আস্তে কমিয়ে আনার চেষ্টা করা হবে জানিয়ে তিনি বলেন, দেশীয় শিল্পকে সুরক্ষা ও শক্তিশালী করার জন্য যা যা করা দরকার, তাই করা হবে।
এনবিআর চেয়ারম্যান আরো জানান, রাজস্ব আদায় করবে যন্ত্র। আর কর্মকর্তারা গবেষণা কাজ করবেন। এনবিআরের নতুন সম্প্রসারণের প্রস্তাবে গবেষণা বিভাগকে শক্তিশালী করার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। এলডিসি থেকে উত্তরণের পর আমাদের সামনে চ্যালেঞ্জ আসবে। এ চ্যালেঞ্জ মোকাবেলার জন্য এখন থেকে প্রস্তুতি নিতে হবে। এর জন্য কর নেট বাড়াতে হবে। কারণ নেট যত বাড়বে, রেট তত কমবে।
আলোচনায় অন্যদের মধ্যে বক্তব্য দেন এনবিআরের কাস্টমস সদস্য (শুল্ক নীতি) মাসুদ সাদিক, সদস্য (ভ্যাট নীতি) জাকিয়া সুলতানা ও সদস্য (আয়কর নীতি) সামসুদ্দিন আহমেদ।



