পহেলা জানুয়ারি থেকে শিল্প খাতে সিঙ্গেল ডিজিট সুদ

আগামী পহেলা জানুয়ারি থেকে শিল্প খাতের জন্য ব্যাংক ঋণের সুদের হার সিঙ্গেল ডিজিট কার্যকর হবে। এ সংক্রান্ত প্রজ্ঞাপন জারি করা হবে চলতি মাসের দ্বিতীয় সপ্তাহে। কিভাবে সিঙ্গেল ডিজিট সুদ হার বাস্তবায়ন হবে সেখানে বিস্তারিত থাকবে। রোববার অর্থমন্ত্রীর সঙ্গে রাষ্ট্রায়ত্ত এবং বেসরকারি ব্যাংকের চেয়ারম্যান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালকদের (এমডি) বৈঠকে এসব সিদ্ধান্ত হয়। বৈঠক শেষে এক ব্রিফিংয়ে সাংবাদিকদের কাছে সিদ্ধান্তগুলো তুলে ধরেন অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল। তিনি বলেন, এক অঙ্কের সুদ হার কার্যকর করতে একটি কমিটি গঠন করা হবে। কমিটি গঠন করার দায়িত্ব দেয়া হয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরকে। ওই কমিটি আগামী সাত দিনের মধ্যে সুনির্দিষ্ট সুপারিশ করবে।

রাজধানীর আগারগাঁও পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের এনইসি সম্মেলন কক্ষে ব্যাংকারদের নিয়ে টানা চার ঘণ্টা বৈঠক করেন অর্থমন্ত্রী। এরপর তিনি ব্রিফিংয়ে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হন। এক প্রশ্নের জবাবে অর্থমন্ত্রী বলেন, বাস্তবতা আপনাদের বুঝতে হবে। দেশে শিল্প প্রতিষ্ঠান না হলে চাকরি-কর্মসংস্থান হবে কিভাবে। অনেক বেকার রাস্তায় রাস্তায় ঘুরছে। এটি মাথায় রাখতে হবে। বর্তমানে এত বেশি ঋণের সুদ দিয়ে শিল্পই কিভাবে হবে। এ বিষয়টি নিয়েই আজকের বৈঠক। সেখানে সবাই একমত হয়েছেন যে, দেশে ব্যাংক ঋণের সুদের হার অনেক বেশি। এটি সিঙ্গেল ডিজিটে নামিয়ে আনতে হবে। এটি বাস্তবায়ন করা গেলে খেলাপি ঋণের পরিমাণও কমবে, শিল্পের প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশ সৃষ্টি হবে ও আর্থিক খাত সুন্দর হবে। পাশাপাশি বিদেশে ব্যবসা করতে গেলেও কোনো ধরনের প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হবে না। কারণ এখন কোনো ব্যাংকে খেলাপি ঋণের পরিমাণ বেশি থাকলে বিদেশি ব্যাংকগুলো এলসি নিতে আগ্রহ প্রকাশ করে না। এসব বাধাও কেটে যাবে। প্রস্তাবিত কমিটি ঋণের সুদের হার সিঙ্গেল ডিজিটে আনার ব্যাপারে চূড়ান্ত রিপোর্ট এ মাসে দিতে পারবে কিনা এমন প্রশ্নের জবাবে অর্থমন্ত্রী বলেন, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে রিপোর্ট দিতে হবে। কারণ এটি পহেলা জানুয়ারি থেকে কার্যকর করা হবে।

ব্রিফিংয়ে উপস্থিত বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ফজলে করিম এক প্রশ্নের জবাবে বলেন, আজকের বৈঠকে সিদ্ধান্ত অনুযায়ী একটি কমিটি গঠন করা হবে। কমিটির প্রধান হবেন বাংলাদেশ ব্যাংকের ডেপুটি গভর্নর। সেখানে প্রতিনিধি হিসেবে অর্থ মন্ত্রণালয়, সরকারি ও বেসরকারি ব্যাংকের একাধিক চেয়ারম্যান ও এমডি থাকবেন। কমিটি হবে সাত সদস্যের। রোববার রাত বা সোমবারের মধ্যেই গঠন করা হবে।

এর আগেও নানা সুবিধা দেয়ার পর ঋণের সুদের হার সিঙ্গেল ডিজিট বাস্তবায়ন করেনি ব্যাংকগুলো। এবারও তা না করলে কোনো ব্যবস্থা নেয়া হবে কিনা জানতে চাইলে অর্থমন্ত্রী বলেন, সরকার সিদ্ধান্ত নিলে বাস্তবায়ন করবে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর। কারণ ব্যাংকগুলোর পরিচালনা কর্তৃপক্ষ হচ্ছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। ব্যাংকগুলো সরকারের সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করছে কিনা এটি কেন্দ্রীয় ব্যাংক দেখবে।

ব্রিফিংয়ে অর্থমন্ত্রী বলেন, শুরু থেকে আমরা খেলাপি ঋণ কমানোর ক্ষেত্রে শক্তিশালী ভূমিকা রাখতে পারিনি। এটা বৃদ্ধির একটি প্রধান কারণ হচ্ছে আমাদের সুদের হার অনেক বেশি। পৃথিবীর কোনো দেশে এত বেশি নেই। এ অবস্থায় দেশের শিল্প খাতকে অন্য দেশের সঙ্গে প্রতিযোগী করে গড়ে তুলতে চাইলেও উচ্চ সুদের কারণে তা সম্ভব হচ্ছে না। শিল্প খাতে একটি প্রতিযোগী পরিবেশ তৈরি করতে হলে এর একটি বড় ক্ষেত্র হচ্ছে সুদ হার। এটি মাথায় রাখতে হবে এত বেশি ঋণের সুদ দিয়ে শিল্পায়ন করা সম্ভব হবে না।

অর্থমন্ত্রী বলেন, এটি স্বচ্ছ ও সত্য সুদের হার আগামীতে কমবে। ফলে খেলাপি ঋণও আর বাড়বে না, এটি দিন দিন কমবে। আমি দায়িত্ব নেয়ার পর থেকে বলে আসছি। খেলাপি ঋণ বাড়লে কার অ্যাকাউন্ট থেকে বাড়বে। এটি দেশের সব নাগরিকের কষ্টের অর্জিত টাকা থেকে যাবে।

খেলাপি ঋণ বৃদ্ধি প্রসঙ্গে ব্যাখ্যা দিয়ে অর্থমন্ত্রী বলেন, আমি দায়িত্ব নেয়ার পর প্রথমে বলেছিলাম, খেলাপি ঋণ বাড়বে না। এখন বাড়ছে এটি সত্য। কিন্তু কেন বাড়ছে, সেটিও দেখতে হবে। খেলাপি ঋণ কমানোর জন্য একটি দীর্ঘমেয়াদি একটি পরিকল্পনা গ্রহণ করেছিলাম। যারা ভালো তাদের সুদ হার হবে সিঙ্গেল ডিজিট এবং মন্দ গ্রাহকদের (ইচ্ছাকৃত খেলাপি বাদে) তারাও একক অঙ্কের সুদের সুবিধা পাবে। পাশাপাশি তাদের ঋণ রিসিডিউল করতে দীর্ঘ সময় দেয়া হবে। এরপর আদালতে মামলার কারণে সেটি আটকে যায়। বিষয়টি বিচারাধীন থাকা অবস্থায় অনেক ভালো ঋণ গ্রহীতারাও ঋণের কিস্তির টাকা দেয়া বন্ধ করে দেয়। পাশাপাশি খারাপ ঋণ গ্রহীতারাও একই কাজ করে। ফলে ব্যাংকে ঋণের কিস্তির টাকা পরিশোধ একদম বন্ধ হয়ে গেলে খেলাপি ঋণের পরিমাণ বেড়ে যায়। এখন আদালতের রায় আমাদের পক্ষে আসছে। আমি বিশ্বাস করি আগামী ৩০ ডিসেম্বরের মধ্যে খেলাপি ঋণের পরিমাণ বাড়বে না বরং কমে আসবে।

কিছু ভালো ও মন্দ গ্রাহক কিস্তি না দেয়ায় খেলাপি ঋণের পরিমাণ বেড়েছে এমন অভিযোগ করেছেন, তাহলে কি খেলাপি কমাতে আপনার পলিসি ঠিকমতো কাজ করেনি। এ প্রশ্নের জবাবে মন্ত্রী বলেন, কোনো কিছু করতে হলে আগে ম্যাক্রোলেভেলে আইন করতে হবে। আমি পলিসি করেছিলাম ভালো ও মন্দ উভয় ঋণ গ্রহীতার সুবিধার জন্য। কিন্তু কাউকে টাকা মাফ করে দেয়ার কথা বলা হয়নি। কারও ঋণ রাইট অফ করা হবে সেটি বলিনি। শুধু ঋণ পরিশোধের সময় দেয়া হয়েছে। এমনিতে অনেকে ঋণের টাকা দিচ্ছে না। যদি আইন করে সময় দেয়া হয় তাহলে অপরাধ কোথায় পাল্টা প্রশ্ন রাখেন অর্থমন্ত্রী। তিনি আরও বলেন, এখন সুবিধা হচ্ছে ঋণের সুদ আগের মতো বাড়বে না। এটি এমন এক স্থানে চলে আসবে, যেখানে গ্রাহকদের আয় ও ঋণের সুদসহ কিস্তির পরিমাণের মধ্যে পার্থক্য কাছাকাছি স্থানে আসবে। কিন্তু বর্তমানে গ্রাহকের আয় যা হচ্ছে ঋণের কিস্তির টাকা দিয়ে কুলাতে পারছে না। কারণ সুদের হার অনেক বেশি। সেজন্য এ পরিকল্পনা গ্রহণ করেছিলাম। এটি অন্যায় বা অনৈতিক কাজ কিংবা একজন ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর জন্য করা হয়নি। পুরো জাতির জন্য করা হয়েছিল।

ব্যাংকগুলোকে এর আগে অনেক সুবিধা দেয়ার পরও সুদের হার একক অঙ্কে বাস্তবায়ন করেনি- এমন প্রশ্নের জবাবে অর্থমন্ত্রী বলেন, উচ্চ আদালতে মামলার কারণে এটি হয়নি। কারণ কেউ টাকা-পয়সা দেয়নি।

খেলাপি ঋণ কমাতে অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট কোম্পানি গঠন নিয়ে বৈঠকে কোনো আলোচনা হয়েছে কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট কোম্পানিসহ কয়েকটি আইন সংশোধন করা হয়েছে। এটি খুব শিগগিরই মন্ত্রিসভায় উপস্থাপন করা হবে। এরপর জাতীয় সংসদে নেয়া হবে আইনগুলো পাস করার জন্য।

ব্রিফিংয়ে আরও উপস্থিত ছিলেন অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সিনিয়র সচিব মো. আসাদুল ইসলামসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা।

সাত সদস্যের কমিটি গঠন :

সুদের হার সিঙ্গেল ডিজিট বাস্তবায়ন করতে সাত সদস্যের কমিটি গঠন করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। রোববার রাতে বাংলাদেশ ব্যাংকের ডেপুটি গভর্নর এসএম মনিরুজ্জামানকে প্রধান করে এ কমিটি গঠন করা হয়। কমিটির সদস্য সচিব হলেন অগ্রণী ব্যাংকের চেয়ারম্যান ড. জায়েদ বখত। অন্য সদস্যদের মধ্যে রয়েছেন- স্ট্যান্ডার্ড ব্যাংকের চেয়ারম্যান কাজী আকরাম উদ্দিন আহমেদ, রূপালী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ওবায়েদ উল্লাহ আল মাসুদ, মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ মাহবুবুর রহমান, আইএফআইসি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক শাহ এ সারওয়ার এবং এনআরবি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মেহমুদ হোসেন।