যুক্তরাষ্ট্রে পোশাক রপ্তানি বেড়েছে ১০.১৬%
বাংলাদেশের তৈরি পোশাক (আরএমজি) রপ্তানিতে চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথম চার মাসে ইতিবাচক প্রবৃদ্ধি হয়েছে। জুলাই থেকে অক্টোবর সময়ে দেশের তৈরি পোশাক রপ্তানি থেকে আয় হয়েছে ১ হাজার ৩৭৪ কোটি ৬৩ লাখ ডলার, যা আগের ২০২৫-২৬ অর্থবছরের একই সময়ের ১ হাজার ২৯৯ কোটি ৪ লাখ ডলারের তুলনায় ৫ দশমিক ৮২ শতাংশ বেশি।
এ সময়ে রপ্তানি আয়ের প্রবৃদ্ধিতে সবচেয়ে বেশি অবদান রেখেছে যুক্তরাষ্ট্রের বাজার। দেশটিতে পোশাক রপ্তানি বেড়েছে ১০ দশমিক ১৬ শতাংশ। পাশাপাশি অপ্রচলিত বাজারগুলোতেও রপ্তানি আয় বেড়েছে ৯ দশমিক ৩০ শতাংশ। অন্যদিকে ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) বাজারে প্রবৃদ্ধি তুলনামূলক কম থাকলেও নিট পোশাক রপ্তানি ওভেনের তুলনায় বেশি বেড়েছে।
রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) তথ্যের ভিত্তিতে বাংলাদেশ অ্যাপারেল ভয়েসের (বিএভি) সংকলিত পরিসংখ্যানে এ চিত্র উঠে এসেছে।
পরিসংখ্যান অনুযায়ী, আলোচ্য সময়ে নিট পোশাক রপ্তানিতে প্রবৃদ্ধি হয়েছে ওভেন পোশাকের তুলনায় বেশি। নিট পোশাক রপ্তানি ৬ দশমিক ৭৯ শতাংশ বেড়ে ৭৭৩ কোটি ডলারে দাঁড়িয়েছে। অন্যদিকে ওভেন পোশাক রপ্তানি ৪ দশমিক ৬০ শতাংশ বেড়ে হয়েছে ৬০২ কোটি ডলার। মোট তৈরি পোশাক রপ্তানিতে নিট পোশাকের হিস্যা এখন ৫৬ দশমিক ২ শতাংশ।
গত অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় চলতি অর্থবছরের প্রথম চার মাসে তৈরি পোশাক রপ্তানি বেড়েছে প্রায় ৭৫ কোটি ৬০ লাখ ডলার। এই বাড়তি রপ্তানি আয়ে সবচেয়ে বেশি অবদান রেখেছে যুক্তরাষ্ট্রের বাজার। দেশটিতে রপ্তানি বেড়েছে ২৬ কোটি ২৯ লাখ ডলার, যা মোট রপ্তানি বৃদ্ধির প্রায় ৩৫ শতাংশ। এ ছাড়া অপ্রচলিত বাজারগুলোতে রপ্তানি বেড়েছে ২০ কোটি ১৮ লাখ ডলার বা মোট বৃদ্ধির প্রায় ২৭ শতাংশ। ইউরোপীয় ইউনিয়নে (ইইউ) বেড়েছে ১৭ কোটি ৪৫ লাখ ডলার বা ২৩ শতাংশ। যুক্তরাজ্যে বেড়েছে ১০ কোটি ৬২ লাখ ডলার বা ১৪ শতাংশ। কানাডার বাজারে রপ্তানি বৃদ্ধির পরিমাণ ১ কোটি ৬ লাখ ডলার।
বাজারভিত্তিক রপ্তানির চিত্র
বাজারভিত্তিক পরিসংখ্যানে দেখা যায়, চলতি অর্থবছরের জুলাই-অক্টোবর সময়ে ইইউতে তৈরি পোশাক রপ্তানি হয়েছে ৬৪৩ কোটি ১৭ লাখ ডলার, যা আগের অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় ২ দশমিক ৭৯ শতাংশ বেশি। যুক্তরাষ্ট্রে রপ্তানি হয়েছে ২৮৫ কোটি ২ লাখ ডলার, প্রবৃদ্ধি ১০ দশমিক ১৬ শতাংশ।
অপ্রচলিত বাজারে রপ্তানি হয়েছে ২৩৭ কোটি ১৬ লাখ ডলার, যা আগের বছরের তুলনায় ৯ দশমিক ৩০ শতাংশ বেশি। যুক্তরাজ্যে রপ্তানি হয়েছে ১৬৪ কোটি ৮ লাখ ডলার, বেড়েছে ৬ দশমিক ৯২ শতাংশ। কানাডায় রপ্তানি হয়েছে ৪৫ কোটি ২৯ লাখ ডলার, প্রবৃদ্ধি ২ দশমিক ৪১ শতাংশ।
যুক্তরাষ্ট্রে প্রবৃদ্ধি সবচেয়ে বেশি
বাংলাদেশের তৈরি পোশাকের প্রধান বাজারগুলোর মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রে রপ্তানি প্রবৃদ্ধি সবচেয়ে বেশি হয়েছে। চলতি অর্থবছরের প্রথম চার মাসে দেশটিতে পোশাক রপ্তানি ১০ দশমিক ১৬ শতাংশ বেড়ে ২৮৫ কোটি ডলারে পৌঁছেছে। মোট তৈরি পোশাক রপ্তানিতে যুক্তরাষ্ট্রের অংশ বেড়ে ২০ দশমিক ৭৩ শতাংশ হয়েছে। গত অর্থবছরের একই সময়ে এই অংশ ছিল ১৯ দশমিক ৯২ শতাংশ।
যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে ওভেন পোশাক রপ্তানি ১০ দশমিক ২২ শতাংশ বেড়ে ১৭৫ কোটি ডলারে দাঁড়িয়েছে। নিট পোশাক রপ্তানি বেড়েছে ১০ দশমিক ০৬ শতাংশ, যার পরিমাণ ১১০ কোটি ডলার। আলোচ্য সময়ে বাংলাদেশের মোট ওভেন পোশাক রপ্তানির ২৯ দশমিক ০৮ শতাংশ গেছে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে।
ইইউতে প্রবৃদ্ধি কমেছে, শীর্ষ বাজার স্পেন
বাংলাদেশের তৈরি পোশাকের সবচেয়ে বড় গন্তব্য এখনো ইউরোপীয় ইউনিয়ন। চলতি অর্থবছরের জুলাই-অক্টোবর সময়ে এই অঞ্চলে রপ্তানি হয়েছে ৬৪৩ কোটি ১৭ লাখ ডলারের পোশাক। তবে প্রবৃদ্ধি হয়েছে মাত্র ২ দশমিক ৭৯ শতাংশ। মোট রপ্তানিতে ইইউর অংশ কমে ৪৬ দশমিক ৭৯ শতাংশে দাঁড়িয়েছে, যা আগের অর্থবছরের একই সময়ে ছিল ৪৮ দশমিক ১৭ শতাংশ।
ইইউতে নিট পোশাক রপ্তানি ৪ দশমিক ২৮ শতাংশ বাড়লেও ওভেন পোশাকে প্রবৃদ্ধি ছিল মাত্র ০ দশমিক ২৯ শতাংশ।
ইউরোপের দেশগুলোর মধ্যে স্পেনে বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানি উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। দেশটিতে রপ্তানি ১৩ দশমিক ৩৬ শতাংশ বেড়ে ১৪৪ কোটি ৮০ লাখ ডলারে পৌঁছেছে। এর ফলে জার্মানিকে ছাড়িয়ে ইইউর দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশের তৈরি পোশাকের সবচেয়ে বড় একক বাজার হয়ে উঠেছে স্পেন।
জার্মানিতে রপ্তানি প্রায় অপরিবর্তিত রয়েছে। দেশটিতে রপ্তানির পরিমাণ ১৪৩ কোটি ৯০ লাখ ডলার, প্রবৃদ্ধি মাত্র ০ দশমিক ০১ শতাংশ। নেদারল্যান্ডসে রপ্তানি ৮ দশমিক ৬৮ শতাংশ বেড়ে ৭০৮ কোটি ৪৬ লাখ ডলার হয়েছে। পোল্যান্ডে বেড়েছে ২ দশমিক ৮৫ শতাংশ, রপ্তানির পরিমাণ ৫৪ কোটি ৫৯ লাখ ডলার। সুইডেনে রপ্তানি ১০ দশমিক ৫৯ শতাংশ বেড়ে ২৪ কোটি ১ লাখ ডলারে দাঁড়িয়েছে। রোমানিয়ায় প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৪৫ দশমিক ২৮ শতাংশ; দেশটিতে রপ্তানি হয়েছে ৬ কোটি ৮৮ লাখ ডলার।
তবে ইউরোপের কয়েকটি বড় বাজারে বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানি কমেছে। ফ্রান্সে রপ্তানি ৭ দশমিক ৮৭ শতাংশ কমে ৬১ কোটি ১১ লাখ ডলারে দাঁড়িয়েছে। ইতালিতে কমেছে ৪ দশমিক ২৯ শতাংশ, রপ্তানির পরিমাণ ৪৩ কোটি ৯৪ লাখ ডলার। ডেনমার্কে রপ্তানি ১২ দশমিক ১০ শতাংশ কমে ২৭ কোটি ১ লাখ ডলার হয়েছে। বেলজিয়ামে কমেছে ২ দশমিক ১৪ শতাংশ, রপ্তানির পরিমাণ ১৭ কোটি ২৫ লাখ ডলার।
যুক্তরাজ্যে নিট পোশাকে প্রবৃদ্ধি, ওভেনে পতন
চলতি অর্থবছরের প্রথম চার মাসে যুক্তরাজ্যে তৈরি পোশাক রপ্তানি ৬ দশমিক ৯২ শতাংশ বেড়ে ১৬৪ কোটি ৮ লাখ ডলারে পৌঁছেছে। তবে দেশটিতে নিট ও ওভেন পোশাকের রপ্তানি প্রবণতায় পার্থক্য দেখা গেছে।
যুক্তরাজ্যে নিট পোশাক রপ্তানি ১১ দশমিক ৩০ শতাংশ বেড়ে ১১৪ কোটি ডলার হয়েছে। অন্যদিকে ওভেন পোশাক রপ্তানি ১ দশমিক ৭৮ শতাংশ কমে ৫০ কোটি ৪০ লাখ ডলারে দাঁড়িয়েছে।
এ সময়ে কানাডায় বাংলাদেশের তৈরি পোশাক রপ্তানি ২ দশমিক ৪১ শতাংশ বেড়ে ৪৫ কোটি ২৯ লাখ ডলার হয়েছে।
অপ্রচলিত বাজারে তুরস্কের উল্লম্ফন
প্রচলিত বড় বাজারগুলোর বাইরে অপ্রচলিত বাজারেও বাংলাদেশের তৈরি পোশাক রপ্তানি বাড়ছে। চলতি অর্থবছরের জুলাই-অক্টোবর সময়ে এসব বাজারে রপ্তানি ৯ দশমিক ৩০ শতাংশ বেড়ে ২৩৭ কোটি ১৬ লাখ ডলারে পৌঁছেছে। মোট রপ্তানিতে অপ্রচলিত বাজারের অংশ বেড়ে ১৭ দশমিক ২৫ শতাংশ হয়েছে, যা গত অর্থবছরের একই সময়ে ছিল ১৬ দশমিক ৭০ শতাংশ।
অপ্রচলিত বাজারগুলোর মধ্যে তুরস্কে রপ্তানি বৃদ্ধির হার ছিল সবচেয়ে বেশি। দেশটিতে রপ্তানি ১০৭ দশমিক ০৫ শতাংশ বেড়ে ২০ কোটি ৬৫ লাখ ডলারে দাঁড়িয়েছে। গত অর্থবছরের একই সময়ে এই বাজারে রপ্তানির পরিমাণ ছিল ৯ কোটি ৯৭ লাখ ডলার। অপ্রচলিত বাজারগুলোতে মোট রপ্তানি বৃদ্ধির প্রায় ৫৩ শতাংশ এসেছে শুধু তুরস্ক থেকে।
তুরস্কে নিট পোশাক রপ্তানি বেড়েছে ১১৭ দশমিক ১১ শতাংশ এবং ওভেন পোশাক রপ্তানি বেড়েছে ৯২ দশমিক ৭৪ শতাংশ।
অপ্রচলিত বাজারগুলোর মধ্যে জাপান এখনো বাংলাদেশের তৈরি পোশাকের সবচেয়ে বড় বাজার। দেশটিতে রপ্তানি ২ দশমিক ৪০ শতাংশ বেড়ে ৪৩ কোটি ৭৩ লাখ ডলারে দাঁড়িয়েছে। মেক্সিকোতে রপ্তানি ১৫ দশমিক ৬৯ শতাংশ বেড়ে ১১ কোটি ৩৩ লাখ ডলার হয়েছে। সংযুক্ত আরব আমিরাতে বেড়েছে ১৯ দশমিক ৮৯ শতাংশ, রপ্তানির পরিমাণ ১০ কোটি ১৪ লাখ ডলার।
ব্রাজিলে রপ্তানি ৩৬ দশমিক ৭৯ শতাংশ বেড়ে ৭ কোটি ৮৩ লাখ ডলার এবং দক্ষিণ আফ্রিকায় ১৫ দশমিক ২৪ শতাংশ বেড়ে ৪ কোটি ৯৩ লাখ ডলার হয়েছে। দক্ষিণ কোরিয়ায় রপ্তানি ৫ দশমিক ৮২ শতাংশ বেড়ে ১৫ কোটি ১৩ লাখ ডলারে দাঁড়িয়েছে। অস্ট্রেলিয়ায় বেড়েছে ৩ দশমিক ০১ শতাংশ, রপ্তানির পরিমাণ ২৬ কোটি ৪০ লাখ ডলার।
অন্যদিকে অপ্রচলিত বাজারের কয়েকটি দেশে রপ্তানি কমেছে। ভারতে তৈরি পোশাক রপ্তানি ৫ দশমিক ৩৮ শতাংশ কমে ২৫ কোটি ৯ লাখ ডলার হয়েছে। চীনে কমেছে ৩ দশমিক ১৭ শতাংশ, রপ্তানির পরিমাণ ৯ কোটি ১১ লাখ ডলার। রাশিয়ায় রপ্তানি ১৬ দশমিক ০৪ শতাংশ কমে ৫ কোটি ৫৭ লাখ ডলার এবং নিউজিল্যান্ডে ১০ দশমিক ৫৫ শতাংশ কমে ৩ কোটি ৯ লাখ ডলারে দাঁড়িয়েছে।
দুই বড় বাজারে নির্ভরতা সামান্য কমেছে
বাংলাদেশের তৈরি পোশাক রপ্তানিতে ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও যুক্তরাষ্ট্রের সম্মিলিত অংশ এখনো প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ। চলতি অর্থবছরের প্রথম চার মাসে এই দুই বাজারে গেছে মোট রপ্তানির ৬৭ দশমিক ৫ শতাংশ। গত অর্থবছরের একই সময়ে এই অংশ ছিল ৬৮ দশমিক ১ শতাংশ।
অর্থাৎ মোট রপ্তানিতে ইইউ ও যুক্তরাষ্ট্রের সম্মিলিত অংশ সামান্য কমেছে। এর পেছনে রয়েছে ইইউর বাজারে তুলনামূলক কম প্রবৃদ্ধি এবং অপ্রচলিত বাজারগুলোতে বেশি প্রবৃদ্ধি।
ইপিবির তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশের তৈরি পোশাক রপ্তানিতে সামগ্রিক প্রবৃদ্ধি বজায় থাকলেও বিভিন্ন বাজারের প্রবৃদ্ধির হারে উল্লেখযোগ্য পার্থক্য রয়েছে। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র ও অপ্রচলিত বাজারে রপ্তানি বৃদ্ধির বিপরীতে ইউরোপীয় ইউনিয়নের কয়েকটি বড় বাজারে প্রবৃদ্ধি কমেছে কিংবা রপ্তানি হ্রাস পেয়েছে।



