ভয়ংকর স্বদেশ লাইফ: সব টাকা লুটে খাচ্ছে সিন্ডিকেট!
জিনান মাহমুদ:
আইন লংঘন, অনিয়ম, নজিরবিহীন দুর্নীতি ও চরম জালিয়াতির অভয়ারণ্যে পরিণত হয়েছে স্বদেশ ইসলামী লাইফ ইন্স্যুরেন্স। বছরের পর বছর হাজার হাজার সাধারণ গ্রাহকের আমানতের কোটি কোটি টাকা লুটপাট করা হলেও প্রভাবশালী সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণে ব্যর্থ হচ্ছে বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ (আইডিআরএ)। ভুয়া বিল-ভাউচার তৈরি, সরকারি ভ্যাট-ট্যাক্স আত্মসাৎ এবং লাইফ ফান্ডের অর্থ লুট ও পেইড-আপ ক্যাপিটাল তছরুপের চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে আসছে। এ বিষয়ে তদন্ত ও কঠোর শাস্তির দাবি জানিয়ে আইডিআরএ‘র কাছে আবেদন করেন প্রতিষ্ঠানটির সিনিয়র ডিএমডি মোর্শেদ সাইফুল। তিনি স্বদেশ লাইফের চিহ্নিত সিন্ডিকেটের রামরাজত্বের ভয়ংকর চিত্র তুলে ধরেন।
ঝুঁকিপূর্ণ স্বদেশ এখন তলাবিহীন ঝুঁড়ি- এমন মন্তব্য করেন সাবেক সিইও জাহাঙ্গির মোল্লা। অর্থবাংলাকে বলেন, লুটপাটের আখড়ায় পরিণত এই প্রতিষ্ঠানে গ্রাহকের প্রিমিয়াম, পেইড-আপ ক্যাপিটাল, লাইফ ফান্ড, বাংলাদেশ ব্যাংকের সিকিউরিটি কিংবা এফডিআর এর কোটি কোটি টাকা, কোনো কিছুই রক্ষা করা হয়নি—সব লোপাট করা হয়েছে। চেয়ারম্যান, পরিচালনা পর্ষদ, সাবেক সিইও শাহিন, বহিস্কৃত সাজিদ ও আব্দুল জব্বার কাওছারের কর্মকান্ড তদন্ত করলে সব অপর্কম বেড়িয়ে আসবে।
এদিকে মোর্শেদ সাইফুল অভিযোগে উল্লেখ করেন-
• লিয়েন রেখে টাকা গায়েব: স্বদেশ ইসলামী লাইফের পরিশোধিত মূলধন (পেইড আপ ক্যাপিটাল) ব্যাংকে লিয়েন রেখে চেয়ারম্যান ও পরিচালনা পর্ষদ ১৪.৩০ কোটি টাকা ঋণ নিয়ে আত্মসাৎ করেন। অর্থ লোপাটের অপরাধে পর্ষদের চেয়ারম্যান ও ভাইস চেয়ারম্যানসহ ১২ জন পরিচালককে বরখাস্ত করা হয়। তবে দীর্ঘ দুই বছর হলেও সেই টাকা ফেরত না দিয়ে বহাল তবিয়তে আছেন।
বিষয়টি নিয়ে সাবেক ভারপ্রাপ্ত সিইও মো. জামাল উদ্দিন অর্থবাংলাকে বলেন, অনিয়ম ও দুর্নীতিতে ডুবছে স্বদেশ লাইফ। অথচ এ বিষয়ে আইডিআরএ থেকে শুরু করে সরকারের কোনো পক্ষই ব্যবস্থা গ্রহণ করছে না। ১২ জন পরিচালককে অপসারণ করলেও সেই মামলার সকল কার্যক্রম থমকে আছে। হাইকোর্টের ৬ মাসের স্থগিতাদেশের মেয়াদ পেরিয়ে ২ থেকে ৩ বছর শেষ হতে চললেও এই মামলা নিয়ে আইডিআরএ সম্পূর্ণ নীরব। নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের রহস্যজনক ভূমিকা প্রশ্নবিদ্ধ। শুধু স্বদেশের প্রথম বর্ষের ব্যবসা বন্ধ নয়—অবিলম্বে লাইসেন্স বাতিল করা উচিত।
• সিইও নিয়ে তেলেসমতি: স্বদেশ লাইফে গত ৩বছর ‘সিইও’ পদ শূন্য হলেও এখনো স্থায়ী সিইও নিয়োগ করা হচ্ছে না। একেক সময় একেক কর্মকর্তাকে চলতি দায়িত্ব দিয়ে- আবার তাকে বাদ দেওয়া হয়। এই প্রক্রিয়ায় এখন পর্যন্ত প্রশাসকসহ ৬ জন কে সিইও চলতি দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।
এদিকে নিজেকে ‘সিইও’ দাবী করে জাহাঙ্গির মোল্লা অর্থবাংলাকে বলেন, ‘বহিষ্কৃত পরিচালনা পর্ষদ আমাকে দায়িত্ব পালনে বাধা দিয়ে বারবার নতুন সিইও নিয়োগ দিচ্ছে, আবার কিছুদিন পরই এই সিইওদের কোনো নোটিশ ছাড়াই বহিষ্কার করছে। এখানে সিইও নিয়োগের নামে বাণিজ্য করা হচ্ছে। নতুন নতুন কথিত সিইওদের নিয়ে কোটি টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে।’
• শাহীনের জালিয়াতি ও অবৈধ নিয়ন্ত্রণ: ইনসেনটিভ বোনাস ও গ্রাহকদের প্রিমিয়ামের টাকা ব্যাংক অ্যাকাউন্টে জমা না দিয়ে ব্যক্তিগতভাবে ১ কোটি ২ লাখ ২৭ হাজার ২২২ টাকা আত্মসাৎ করেন সাবেক সিইও ইখতিয়ার উদ্দিন শাহিন। ২০২৩ সালের ১৯ নভেম্বর আইডিআরএ থেকে টাকা পরিশোধ বা কোম্পানির অ্যাকাউন্টে জমা দেওয়ার জন্য নির্দেশ দেওয়া হলেও তা অমান্য করা হয়।
আইডিআরএর নির্দেশনায় আরও বলা হয়, শাহীন স্বদেশের সিইও পদে কাজ করতে পারবেন না এবং প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে ব্যবস্থাপনা সংক্রান্ত কোনো কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত থাকতে পারবেন না। পরে ২০২৪ সালের ১৩ জুন তার বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) একটি মামলা দায়ের করা হয়।
দুদকের মামলা ও আইডিআরএর নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে শাহিন এখনো বিভিন্ন পদ-পদবি ব্যবহার করে স্বদেশ নিয়ন্ত্রণ করছেন।
জানতে চাইলে অভিযোগ অস্বীকার করে ইখতিয়ার শাহিন অর্থবাংলাকে বলেন, ‘আরএসআরএম কোম্পানির নির্বাহী পরিচালক’ হিসেবে স্বদেশ প্রতিনিধিত্ব করছেন। অর্থ আত্মসাৎ বা ভুয়া বিল-ভাউচার তৈরির অভিযোগ সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন। স্বদেশের আর্থিক লেনদেন সংক্রান্ত কোন বিষয়ের সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগ মিথ্যা। একটি পক্ষ ঈর্ষান্বিত হয়ে অপপ্রচার চালাচ্ছে।”
• চুরি মামলার আসামী কাওছারের লুটপাট: স্বদেশ থেকে বহিস্কৃত ও চুরি মামলার আসামি আব্দুল জব্বার কাওছারকে হঠাৎ করে মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তা (ভারপ্রাপ্ত) হিসেবে দায়িত্ব দেওয়া হয়। নৈতিক স্খলনের মামলা থাকার পরও শুধুমাত্র সিন্ডিকেটের স্বার্থ হাসিলের জন্য কাওছারকে দায়িত্ব দেওয়া হয় বলে অভিযোগ উঠে। পদ পেয়ে কাউছার ৯৮ লক্ষ টাকা ভুয়া কমিশন ইনসেনটিভ বিল, ব্যাংক আমানতের ৩০ লক্ষ টাকাসহ কোটি টাকা ভূয়া বিল ভাউচার করে অর্থ আত্মসাৎ করেন। এর আগে বির্তকিত কর্মকান্ডের কারণে প্রোটেক্টিভ ইসলামী লাইফ থেকেও বহিস্কার হয়েছিলেন কাওছার। তিনি এখন আকিজ তাকাফুল ইন্স্যুরেন্সে কাজ করছেন। এ বিষয় জানতে ফোন দেওয়া হলে তাকে পাওয়া যায় নি।
• কথিত সিইও সাজিদ: অপসারিত সিইও শাহীনের সহযোগী বহিস্কৃত সাজিদ হোসেনকে অবৈধ পদোন্নতি দিয়ে এডিশনাল এমডি করা হয়। এরপর যোগ্যতা না থাকার পরও সিইও বানাতে চেষ্টা করা হলে- আইডিআরএ সাজিদের নিয়োগ অনুমোদন বাতিল করে দেয়। এখন আইডিআরএর নির্দেশনা ভঙ্গ করে অবৈধভাবে ‘সিইও’ পদবী ব্যবহার করে প্রতিষ্ঠান থেকে লাখ লাখ টাকা তুলে নিচ্ছেন তিনি।
• আসলামের বিদায়: সম্প্রতি স্বদেশে মো. আসলামকে সিইও পদে বসিয়ে ১ কোটি ১২ লাখ টাকার ভুয়া বিলে সই করতে চাপ দেওয়া হয়। তিনি অস্বীকৃতি জানালে তার অনুমতি ছাড়া বিয়ারার চেকের মাধ্যমে ব্যাংক থেকে ৭ লাখ টাকা তুলে নেওয়া হয়। এ প্রসঙ্গে মোঃ আসলাম অর্থবাংলাকে বলেন, দায়িত্ব পালনকালীন সময়ে না জানিয়ে বহিস্কৃত কোম্পানি সেক্রেটারী সাজিদ হোসেন এবং কর্মকর্তা আব্দুর রহিম লিটন যৌথ স্বাক্ষরে ব্যাংক থেকে (চেক নং CDC-6538477 ও CDC-6538478) বিয়ারার করে নগদ ৭ লক্ষ টাকা উত্তোলন করেন। এভাবে অবৈধ সিইও পদবী ব্যবহার ও চেকে ভূয়া স্বাক্ষরের মতো অসংখ্য জালিয়াতি ও প্রতারণার ভয়ংকর কর্মকান্ড চলছে স্বদেশ লাইফে। এ ঘটনার প্রতিবাদ জানালে, কোনো সুযোগ না দিয়ে অবৈধভাবে কোম্পানী থেকে বের করে দেওয়া হয়।
চেক দিয়ে অর্থ উত্তোলনের বিষয় জানতে চাইলে ইখতিয়ার উদ্দিন শাহিন বলেন, চেকের মাধ্যমে ৭ লাখ টাকা তুলে আইডিআরএ’কে জরিমানা দেওয়া হয়েছে। তবে সাজিদের সিইও হিসেবে স্বাক্ষরের বিষয়টি এড়িয়ে যান তিনি।
• ভ্যাট-ট্যাক্স ফাঁকি: ২০১৯ সাল থেকে কোনো ভ্যাট বা ট্যাক্স জমা দেয়নি স্বদেশ লাইফ। এমনকি মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন ও কমিশন থেকে ভ্যাট ও ট্যাক্সের টাকা কেটে নিয়ে- জমা না দিয়ে ভাগবাটোয়ারা করা হয়।
• ম্যানুয়াল ভাউচার ও হরিলুট: জালিয়াতি ধরা পড়ার ভয়ে কোম্পানিতে কোনো আধুনিক অনলাইন ব্যবস্থা বা ব্যাংক অ্যাকাউন্ট রাখা হয়নি। বেতন, কমিশন ও ভাড়ার নামে ভুয়া ও বেনামি ম্যানুয়াল ভাউচার বানিয়ে পর্ষদের যোগসাজশে কোটি কোটি টাকা নগদ তুলে নেওয়া হয়। এসব বিষয় কেউ প্রতিবাদ করলে চাকরিচ্যুতির ভয় দেখানো হয় বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।
• অডিট বন্ধ করে জালিয়াতি: স্বদেশ লাইফে দীর্ঘ বছর ধরে কোনো সিএফও কিংবা স্থায়ী সচিব নেই। ২০১৮ থেকে ২০২১ সাল পর্যন্ত অনুমোদিত সীমার ২১৯% পর্যন্ত অতিরিক্ত ব্যবস্থাপনা ব্যয় দেখিয়ে লুটপাট চালানো হয়। এসব বিশাল জালিয়াতি ঢাকতে ২০২১ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত কোনো অডিট করতে দেওয়া হয়নি। এমনকি এজিএম ও ইজিএম করেনি এই জীবন বীমা প্রতিষ্ঠান।
স্বদেশ লাইফের ভয়াবহ অনিয়ম দূর্নীতি ও লুটপাট তদন্তে আইডিআরএ’র পাশাপাশি অর্থ মন্ত্রনালয়, কর কমিশনার ও দুদকের হস্তক্ষেপ চেয়েছেন মোর্শেদ সাইফুল।
এছাড়াও স্বদেশ ইসলামী লাইফের প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান এবং সাবেক পরিচালক নুরুল আলম চৌধুরী নানান অনিয়ম নিয়ে একাধিকবার আইডিআরএতে অভিযোগ করেছেন।
স্বদেশ নিয়ে ব্যবস্থা গ্রহণ প্রসঙ্গে- আইডিআরএ’র এক কর্মকর্তা অর্থবাংলাকে জানান, “খাতের যেকোনো অনিয়ম বা বিশৃঙ্খলা রোধে আইডিআরএ নিয়মিত তদারকি করা হচ্ছে। এ বিষয়ে কোনো ধরনের ছাড় দেওয়ার সুযোগ নেই। স্বদেশ লাইফের বিরুদ্ধে আরও কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করবে আইডিআরএ।”



