তুরস্কে বাংলাদেশের রপ্তানি দ্বিগুণ
তুরস্কের বাজারে বাংলাদেশের পণ্য রপ্তানি চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকে দ্বিগুণেরও বেশি বেড়েছে।
রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) তথ্যমতে, জুলাই-সেপ্টেম্বরে তুরস্কে বাংলাদেশের রপ্তানি আয় হয়েছে ২১ কোটি ৫ লাখ ৪০ হাজার মার্কিন ডলার, যা আগের অর্থবছরের একই সময়ে ছিল ১০ কোটি ৫২ লাখ ১০ হাজার ডলার। ফলে এক বছরের ব্যবধানে দেশটিতে বাংলাদেশের রপ্তানি বেড়েছে ১০০ দশমিক ১১ শতাংশ।
এ সময়ে বাংলাদেশের সামগ্রিক পণ্য রপ্তানি বেড়েছে ৬ দশমিক ৩৪ শতাংশ। জুলাই-সেপ্টেম্বরে মোট রপ্তানি আয় হয়েছে ১ হাজার ৩০৯ কোটি ৪১ লাখ ৩০ হাজার ডলার, যা আগের অর্থবছরের একই সময়ে ছিল ১ হাজার ২৩১ কোটি ৩১ লাখ ৭০ হাজার ডলার। অর্থাৎ দেশের সামগ্রিক রপ্তানি প্রবৃদ্ধির তুলনায় তুরস্কের বাজারে বাংলাদেশের রপ্তানি প্রবৃদ্ধি ছিল অনেক বেশি।
তুরস্কে বাংলাদেশের প্রধান রপ্তানি পণ্য তৈরি পোশাক। এর পাশাপাশি পাট ও পাটজাত পণ্য, জুতা, অপটিক্যাল সামগ্রী এবং চিকিৎসা ও বস্ত্রশিল্পের বিভিন্ন সরঞ্জামও দেশটিতে যাচ্ছে। ফলে তৈরি পোশাকের পাশাপাশি এসব পণ্যের বাজার সম্প্রসারণেরও সুযোগ রয়েছে।
রপ্তানিমুখী তৈরি পোশাক শিল্প মালিকদের সংগঠন বিকেএমইএর নির্বাহী সভাপতি ফজলে শামীম এহসান বলেন, তুরস্কে জীবনযাত্রার মান ও আয় বেড়ে যাওয়ায় দেশটির শ্রমিকরা ধীরে ধীরে তৈরি পোশাক শিল্প থেকে সরে আসছেন। ফলে স্থানীয় উৎপাদনে এক ধরনের ঘাটতি তৈরি হচ্ছে। সেই ঘাটতি পূরণে বিদেশি পোশাকের চাহিদা বাড়ছে। বাংলাদেশের তৈরি পোশাক রপ্তানির জন্য এটি এখন সম্ভাবনাময় বাজার হিসেবে সামনে এসেছে। বাংলাদেশের উৎপাদন সক্ষমতা, পণ্যের মান, প্রতিযোগিতামূলক দাম ও সময়মতো সরবরাহের সক্ষমতা কাজে লাগিয়ে এ বাজারে আরও বেশি প্রবেশের সুযোগ রয়েছে।
তিনি বলেন, এই সম্ভাবনা কাজে লাগাতে পণ্যের বৈচিত্র্য ও মূল্য সংযোজনের দিকেও গুরুত্ব দিতে হবে। উচ্চমূল্যের পোশাক, মানবসৃষ্ট তন্তু ও কারিগরিখাতের বস্ত্রের পাশাপাশি পাট ও পাটজাত পণ্য, জুতা এবং অন্যান্য সম্ভাবনাময় পণ্যের বাজার সম্প্রসারণের সুযোগ রয়েছে। তুরস্কের সঙ্গে যোগাযোগ আরও বাড়াতে হবে।
তিনি আরও বলেন, নতুন বাজারে রপ্তানি সম্প্রসারণে সরকারি ও বেসরকারি উভয় পর্যায়কে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে। আন্তর্জাতিক বাণিজ্য মেলা, ক্রেতা-বিক্রেতা বৈঠক এবং ব্যবসায়িক যোগাযোগ বাড়ানোর মাধ্যমে তুরস্কের বাজারে বাংলাদেশের উপস্থিতি আরও জোরদার করা সম্ভব।
বাংলাদেশ ও তুরস্কের মধ্যে বাণিজ্য সম্প্রসারণে ইতোমধ্যে সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে উদ্যোগও জোরদার হয়েছে। গত এপ্রিলে তুরস্কের রাষ্ট্রদূত রামিস সেনের সঙ্গে বৈঠকে বিজিএমইএ দুই দেশের বাণিজ্য ও বিনিয়োগ বাড়ানো এবং বস্ত্র খাতে কৌশলগত অংশীদারত্ব জোরদারের ওপর গুরুত্ব দেয়। ওই বৈঠকে বাংলাদেশে মানবসৃষ্ট তন্তু ও কারিগরি বস্ত্র খাতে যৌথ বিনিয়োগ, তুরস্ক থেকে কাঁচামাল ও আধুনিক বস্ত্রযন্ত্র আমদানি এবং দ্রুত পণ্য পরিবহনে তুর্কি এয়ারলাইনস ও ইস্তাম্বুল বিমানবন্দরের লজিস্টিক সুবিধা ব্যবহারের সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা হয়।
তুরস্কের বাজারে বাংলাদেশের তৈরি পোশাকের পাশাপাশি নতুন পণ্যের প্রবেশ বাড়াতেও এ ধরনের সহযোগিতা গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। বিশেষ করে তুরস্কের শক্তিশালী শিল্প ও পরিশোধন সক্ষমতা বাংলাদেশের পোশাক খাতের জন্য কাঁচামাল সরবরাহে সহায়ক হতে পারে। একই সঙ্গে তুরস্কের অর্গানিক তুলা ও আধুনিক বস্ত্রযন্ত্র আমদানির সুযোগ বাংলাদেশের শিল্পকে আরও উচ্চমূল্যের পণ্য উৎপাদনে সহায়তা করতে পারে।
দুই দেশের বাণিজ্য সম্পর্ক আরও বড় পরিসরে নেওয়ার লক্ষ্যও রয়েছে। গত জুনে তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদান বাংলাদেশ সফরের সময় দুই দেশের বর্তমান প্রায় ১৩০ কোটি ডলারের বাণিজ্য ২০০ কোটি ডলারে উন্নীত করার উদ্যোগের কথা জানান। পাশাপাশি বাণিজ্য সম্প্রসারণে আরও অনুকূল কাঠামো তৈরির বিষয়েও আলোচনা হয়।
ইপিবির ভাইস চেয়ারম্যান মোহাম্মদ হাসান আরিফ বলেন, তুরস্কের বাজারে রপ্তানি বাড়ার এই প্রবণতা ধরে রাখতে পণ্যভিত্তিক রপ্তানি সক্ষমতা ও ক্রেতাদের চাহিদা বিশ্লেষণ করে নতুন সুযোগ কাজে লাগাতে হবে। প্রচলিত পণ্যের পাশাপাশি পাট ও পাটজাত পণ্য, জুতা, তৈরি পণ্য এবং অপটিক্যাল, চিকিৎসা ও বস্ত্রশিল্পের সরঞ্জামের মতো সম্ভাবনাময় পণ্যের বাজার সম্প্রসারণে গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, চলতি অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকে তুরস্কে বাংলাদেশের রপ্তানি দ্বিগুণের বেশি বেড়ে যাওয়া দেশটির বাজারে বাংলাদেশের পণ্যের বাড়তি সম্ভাবনার ইঙ্গিত দিচ্ছে। এখন এ প্রবৃদ্ধিকে কাজে লাগিয়ে তৈরি পোশাকের পাশাপাশি নতুন পণ্য, বিনিয়োগ ও যৌথ উদ্যোগ বাড়ানো গেলে দুই দেশের অর্থনৈতিক সম্পর্ক আরও গভীর হবে এবং ২০০ কোটি ডলারের দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যের লক্ষ্য অর্জনের পথও সহজ হবে।



