জ্বালানি সংকটে রেকর্ড লোডশেডিং

জ্বালানিসংকট, গ্যাসের তীব্র ঘাটতি, কয়লাভিত্তিক কয়েকটি বড় কেন্দ্রের উৎপাদন কমে যাওয়া এবং তেলচালিত কেন্দ্র চালাতে আর্থিক সীমাবদ্ধতার কারণে দেশে রেকর্ড পরিমাণ লোডশেডিং দেখা দিয়েছে। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে অনেক গ্রামাঞ্চলে বিদ্যুৎ থাকার সময়ের চেয়ে না থাকার সময়ই বেশি।

পাওয়ার গ্রিড কোম্পানি অব বাংলাদেশ (পিজিসিবি) সূত্রে জানা গেছে, সোমবার দিবাগত রাত ১টায় দেশে সর্বোচ্চ ৩ হাজার ৭৫৭ মেগাওয়াট লোডশেডিং হয়। ওই সময় বিদ্যুতের চাহিদা ছিল ১৬ হাজার ২৬২ মেগাওয়াট, কিন্তু সরবরাহ করা সম্ভব হয়েছে মাত্র ১২ হাজার ৫০৫ মেগাওয়াট। অর্থাৎ চাহিদার প্রায় ২৩ শতাংশ বিদ্যুৎ সরবরাহ করা যায়নি।

বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (পিডিবি) তথ্য অনুযায়ী, সোমবার (১০ আগস্ট) ২৪ ঘণ্টায় গড় বিদ্যুৎ চাহিদা ছিল ১৭ হাজার ৪০৩ মেগাওয়াট। এর বিপরীতে লোডশেডিং হয়েছে ২ হাজার ৭২২ মেগাওয়াট। পরিমাণের দিক থেকে সবচেয়ে বেশি লোডশেডিং হয়েছে ঢাকা অঞ্চলে, যেখানে ঘাটতি ছিল ৫৪৭ মেগাওয়াট। চট্টগ্রাম অঞ্চলে কোনো লোডশেডিং না হলেও সময়ের বিচারে সিলেট, ময়মনসিংহ ও খুলনা অঞ্চলে বিদ্যুৎ বিভ্রাট বেশি হয়েছে।

বিদ্যুৎ বিভাগের হিসাবে দেশে স্থাপিত বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা প্রায় ২৯ হাজার মেগাওয়াট। অথচ বর্তমান চাহিদা ১৬ থেকে ১৭ হাজার মেগাওয়াটের মধ্যেই ওঠানামা করছে। তবু উৎপাদন ও সরবরাহে বড় ঘাটতি তৈরি হয়েছে।

পরিস্থিতির দ্রুত অবনতি হচ্ছে। এর আগের দিন সর্বোচ্চ লোডশেডিং ছিল ৩ হাজার ৬৭১ মেগাওয়াট এবং ৩ আগস্ট ছিল ৩ হাজার ৫১২ মেগাওয়াট। মঙ্গলবার দুপুরেও ৩ হাজার মেগাওয়াটের বেশি লোডশেডিং হয়েছে। মাত্র তিন সপ্তাহ আগে পরিস্থিতি এতটা নাজুক ছিল না। ২১ জুলাই মহেশখালীর ভাসমান এলএনজি টার্মিনালে দুর্ঘটনার দিন সর্বোচ্চ লোডশেডিং ছিল মাত্র ৪৮৮ মেগাওয়াট। সেই তুলনায় বর্তমান ঘাটতি সাত গুণেরও বেশি বেড়েছে।

সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, বর্তমান সংকটের মূল কারণ জ্বালানি ও অর্থসংকট। বিদ্যুৎকেন্দ্র থাকলেও পর্যাপ্ত গ্যাস, কয়লা ও তেল না থাকায় সেগুলো চালানো যাচ্ছে না। আবার ব্যয়বহুল তেলচালিত কেন্দ্র বেশি চালালে পিডিবির লোকসান ও সরকারের ভর্তুকির চাপ আরও বাড়বে।

দেশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর মোট সক্ষমতা ১২ হাজার মেগাওয়াটের বেশি। কিন্তু পর্যাপ্ত গ্যাস না থাকায় উৎপাদন নেমে এসেছে প্রায় ৩ হাজার ৮০০ থেকে ৪ হাজার মেগাওয়াটে। এর আগে এ খাত থেকে প্রায় সাড়ে ৫ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ পাওয়া যেত।

২১ জুলাই কক্সবাজারের মহেশখালীতে এক্সিলারেট এনার্জির পরিচালিত ভাসমান এলএনজি টার্মিনালে অগ্নিকাণ্ডের পর জাতীয় গ্যাস সরবরাহ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়। দুর্ঘটনার আগে দৈনিক গ্যাস সরবরাহ ছিল প্রায় ২৬৫ কোটি ঘনফুট, যা নেমে আসে প্রায় ২১৪ কোটি ঘনফুটে। পরে আংশিক চালু হলেও সরবরাহ এখনো আগের পর্যায়ে ফেরেনি।

পেট্রোবাংলার টার্মিনাল পুরোপুরি সচল হওয়ার আগেই সামিটের ভাসমান টার্মিনালে একটি এলএনজি কার্গো বৈরী আবহাওয়ার কারণে নির্ধারিত সময়ে যুক্ত হতে পারেনি। ফলে গ্যাস সরবরাহ আবার কমে প্রায় ২১০ কোটি ঘনফুটে নেমে এসেছে।

গ্যাসের ঘাটতি সামাল দিতে এখন প্রধান ভরসা কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র। এ খাতে মোট সক্ষমতা প্রায় ৭ হাজার ৯৪৫ মেগাওয়াট হলেও উৎপাদন হচ্ছে প্রায় সাড়ে ৫ হাজার মেগাওয়াট। পায়রা বিদ্যুৎকেন্দ্রের একটি ইউনিট রক্ষণাবেক্ষণে থাকায় উৎপাদন কমে যায়। বৈরী আবহাওয়ার কারণে কয়লা খালাস ও পরিবহনেও সমস্যা তৈরি হয়েছে।

ভারতের ঝাড়খণ্ডে আদানি পাওয়ারের কেন্দ্র থেকেও সরবরাহ কমেছে। সাধারণত বাংলাদেশে ১ হাজার ৪০০ থেকে ১ হাজার ৫০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ সরবরাহ করা সম্ভব হলেও তা নেমে এসেছে ৮০০ থেকে ১ হাজার মেগাওয়াটের মধ্যে। রামপাল কেন্দ্রেও উৎপাদন কমেছে এবং বড়পুকুরিয়া কেন্দ্রের তিনটি ইউনিটের মধ্যে দুটি কারিগরি ত্রুটির কারণে বন্ধ রয়েছে।

এ অবস্থায় তেলচালিত কেন্দ্রগুলো দিয়ে ঘাটতি পূরণের চেষ্টা করা হচ্ছে। তবে ফার্নেস অয়েল ও ডিজেলভিত্তিক বিদ্যুতের উৎপাদন ব্যয় গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুতের তুলনায় কয়েক গুণ বেশি। ফলে সন্ধ্যার সর্বোচ্চ চাহিদার সময় উৎপাদন বাড়ানো হলেও গভীর রাতে অনেক কেন্দ্রের উৎপাদন কমিয়ে দেওয়া হচ্ছে। এতে মধ্যরাতের পর লোডশেডিং আরও বেড়ে যাচ্ছে।

পিডিবির কাছে বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর বকেয়া বর্তমানে প্রায় ৫০ হাজার কোটি টাকার কাছাকাছি পৌঁছেছে। এর মধ্যে তেলভিত্তিক বেসরকারি কেন্দ্রগুলোর পাওনাই প্রায় ১৭ হাজার কোটি টাকা। বকেয়া না পাওয়ায় অনেক কেন্দ্র নতুন করে জ্বালানি কিনতে সমস্যায় পড়ছে।

এর মধ্যেই গত জুনে পাইকারি পর্যায়ে বিদ্যুতের দাম গড়ে ১৯ দশমিক ৮৫ শতাংশ এবং গ্রাহক পর্যায়ে ১৬ দশমিক ৬৮ শতাংশ বাড়ানো হয়েছে। তবে দাম বাড়ানোর পরও বিপুল বকেয়া পুরোপুরি পরিশোধ করা সম্ভব হয়নি। বিদ্যুৎ বিভাগ ও পিডিবি বাড়তি রাজস্ব দিয়ে ধীরে ধীরে বকেয়া কমানোর চেষ্টা করছে।

বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, বর্তমানে বিভিন্ন এলাকায় বৃষ্টির কারণে চাহিদা কিছুটা কম রয়েছে। তাপমাত্রা বাড়লে এবং গরমের তীব্রতা বাড়লে বিদ্যুৎ সরবরাহ পরিস্থিতি আরও সংকটপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।

সম্পর্কিত খবর