ভয়াবহ সংকটে বীমা খাত!
বন্ধ হচ্ছে জাল সনদে সিইও নিয়োগের সুযোগ
জিনান মাহমুদ:
ভুয়া সনদধারী আর অর্ধশিক্ষিতদের ভারে ডুবছে বীমা খাত। অনেকেই জাল, ভুয়া সনদ কিংবা বির্তকিত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সনদ দিয়ে ফিনান্সিয়াল অ্যাসোসিয়েট (এফএ) থেকে শুরু করে মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তার (সিইও) পদ দখল করছেন। জাল সনদে চাকরির ছড়াছড়ি- বীমা খাতকে ভয়াবহ সংকটে ফেলছে। এবার এসব অপকর্ম বন্ধ করতে কঠোর হচ্ছে বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ।
শুধুমাত্র সিইও নিয়োগ ও নবায়নের ক্ষেত্রে কাগজপত্র যাচাই বাছাই করে আইডিআরএ। আইন অনুযায়ী, বিমা কোম্পানির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা বা সিইও নিয়োগ ও নবায়ন উভয় ক্ষেত্রেই আইডিআরএর কাছে সিইও সম্পর্কিত সব তথ্য, প্রমাণ ও দলিলসহ আবেদন করতে হয়। আইডিআরএ এসব তথ্য ও শিক্ষাগত যোগ্যতার সনদ যাচাই করে অনুমোদন দিয়ে থাকে। অনেক ক্ষেত্রেই এসব পদে আবেদনকারীরা শিক্ষাগত যোগ্যতা ও অভিজ্ঞতার জাল সনদ দিচ্ছেন। বীমায় চাকরী আর জাল সনদ পাশাপাশি চলছে। কর্মী-কর্মকর্তাদের শিক্ষাগত যোগ্যতা যাচাই করলে অসংখ্য ভুয়া সনদের অস্তিত্ব মিলবে। শুধু তাই নয়, কয়েকজন অনুমোদনহীন কিংবা মানহীন দেশি-বিদেশি বিশ্ববিদ্যালয়ের সনদ দিয়েছেন- এমন তথ্য স্পষ্ট। স্নাতক ও স্নাতকত্তোর সনদ যেমন জাল তেমনি শুরু হইছে অনেকে টাকার দিয়ে কিনছেন পিএইচডির ভূয়া সার্টিফিকেট। আবার এদের অনেকে আদালতে ‘রীট’ করে টিকে আছেন।
তবে, জাল কিংবা বিতর্কিত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সনদ দিয়ে সিওই নিয়োগের বিষয় ব্যাপক আলোচিত হলে- অনিয়ম বন্ধ করতে কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করছে আইডিআরএ। সম্প্রতি প্রতিষ্ঠানটির পরিচালক মোহাঃ আব্দুল মজিদ স্বাক্ষরিত চিঠিতে সিইও পদে ‘নিয়োগ ও নবায়ন’ ক্ষেত্রে শিক্ষাগত যোগ্যতা নিয়ে পর্যবেক্ষণ ও সুপারিশ তুলে ধরা হয়। চিঠিতে বীমাকারীর পাঠানো তথ্য, দলিল ও প্রমাণের মধ্যে অনেকের শিক্ষাগত যোগ্যতা সনদ ‘প্রশ্নবিদ্ধ’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়। বিশেষ করে ইবাইস ইউনিভার্সিটি, দি ইউনিভার্সিটি অফ কুমিল্লা, আমেরিকা বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি, দারুল ইহসানের মতো বেশ কিছু প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয় থেকে নেয়া সনদ যাচাইয়ে জালিয়াতি ও শঠতার প্রমাণ পায় আইডিআরএ। এছাড়া, অনলাইন থেকে নেয়া শিক্ষাগত যোগ্যতার সনদের সঠিকতাও প্রশ্নবিদ্ধ বলে মনে করছে কর্তৃপক্ষ। এই নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করে আইডিআরএ বলছে, “সিইও নিয়োগের তথ্য যাচাই-বাছাই করতে একদিকে কর্তৃপক্ষের অহেতুক সময়ক্ষেপন হচ্ছে। অন্যদিকে বীমা আইনের বিধান অনুযায়ী যথাসময়ে মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তার পদ পূরণ না হওয়ায় বীমাকারীও আইনগত জটিলতার সম্মুখীন হচ্ছে।”
সিইও নিয়োগ প্রসঙ্গে কিছু নির্দেশনাও দেয়া হয় নিয়ন্ত্রণ সংস্থার পক্ষ থেকে। বলা হয়-
ক) মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তা হিসেবে নিয়োগ ও নবায়নের প্রস্তাব অনুমোদনের জন্য কর্তৃপক্ষ বরাবরে প্রেরণের পূর্বে আলোচ্য ডিগ্রীটি বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশন (ইউজিসি) কর্তৃক অনুমোদিত বিশ্ববিদ্যালয়ের অনুমোদিত ক্যাম্পাসে অবস্থিত অনুমোদিত প্রোগ্রাম কিনা তাহা যাচাই করতে হবে।
খ) যেকোনো বিদেশি ডিগ্রি বা অনলাইনে প্রাপ্ত ডিগ্রির ক্ষেত্রে এর সত্যতা যাচাই করে সঠিক প্রত্যয়নপত্র এবং ইউজিসি ইস্যু করা সমতাপত্র প্রস্তাবের সঙ্গে জমা দিতে হবে। সিইও নিয়োগ বা নবায়নের জন্য যথাযথ যাচাই-বাছাই ছাড়া কোন সার্টিফিকেট পাঠানো হলে কর্তৃপক্ষের কাছে জাল জালিয়াতি বলে প্রমাণিত হবে। সংশ্লিষ্ট বীমাকারী অসত্য তথ্য, প্রমাণক সরবরাহ করে কর্তৃপক্ষকে বিভ্রান্ত বা হয়রানীর জন্য অভিযুক্ত হবেন।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ইতোপূর্বে জাল-ভুয়া আর বির্তকিত বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রাপ্ত সনদ দাখিল করা একাধিক ব্যক্তিদের সিইও অনুমোদন দিয়েছে আইডিআরএ। জালিয়াতির সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিরা এখনো বহাল তবিয়তে আছেন। এ ধরনের অপরাধ কর্মকান্ডের ভয়াবহ তথ্য ওপেন সিক্রেট হলেও কারো বিরুদ্ধে কোন আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হচ্ছে না। দায়িত্ব পালনে অবহেলা ও সঠিক তদারকির অভাবে এমন ঘটনা অহরহই ঘটছে। আবার সবকিছু জানা সত্ত্বেও নিরব নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ। এভাবে অপরাধীদের সুযোগ দেয়ায়- আইডিআরএর কর্মকান্ড নিয়ে প্রশ্নের পাশাপাশি ক্ষোভ প্রকাশ করছেন। তারা বলেন, অনেক ক্ষেত্রেই সিইও নিয়োগে সব নিয়মকানুন যথাযথভাবে পালন করা হয়নি। যার ফলে এখন সেগুলো বিমা খাতের বিশৃঙ্খলার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। আইডিআরএ নতুন নির্দেশনা বাস্তবায়নের পাশাপাশি অভিযোগ উঠা সিইওদের শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে, একইসঙ্গে কোম্পানিকেও দায় নিতে হবে।
‘সিইও নিয়োগ ও নবায়ন’ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ ইন্স্যুরেন্স এসোসিয়েশন ও বাংলাদেশ ইন্স্যুরেন্স ফোরামের একাধিক সদস্য অর্থবাংলাকে বলেন, বিভিন্ন কারনে ইমেজ সংকটে ভুগছে কোম্পানিগুলো। খাত বিকাশে অন্যতম সমস্যা হচ্ছে শিক্ষিত জনগোষ্ঠীর অভাব। একদিকে ‘ব্যবসা’ চাকরির মুল যোগ্যতা অন্যদিকে ‘বেতন’ কম থাকায় মেধাবীরা মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছেন। এরমধ্যে জাল, ভুয়া শিক্ষা সনদ কিংবা অবৈধ প্রতিষ্ঠান থেকে পাশ দেখানো লোকজনের নিয়োগ- বীমা খাতকে খাদের কিনারায় নিয়ে যাচ্ছে।
তাদের মতে, শুধু নতুন সিইও নিয়োগের ক্ষেত্রে নয়- পুরাতন যাঁদের বিরুদ্ধে অবৈধ বিশ্ববিদ্যালয় কিংবা সনদ জালিয়াতির অভিযোগ আছে, তাদেরকেও চিহ্নিত করে বাদ দিতে হবে। শিক্ষিত ও যোগ্য নেতৃত্বের মাধ্যমে কোম্পানিকে পরিচালিত করতে হবে।
এ প্রসঙ্গে আইডিআরএর লাইফ সদস্য আপেল মাহমুদ অর্থবাংলাকে বলেন, ‘‘বিতর্কিত ব্যক্তিদের সিইও হিসেবে নিয়োগ বন্ধে যথাযথ পদক্ষেপ গ্রহণ করা হচ্ছে। নিয়োগের ক্ষেত্রেও অভিজ্ঞতা ও সনদের ভুল তথ্য দেয়া হলে জটিলতা তৈরী এবং সময় ক্ষেপন হয়। এখন থেকে কোম্পানীকেই সিইও নিয়োগে সনদ যাচাইয়ের দায়িত্ব নিতে হবে। তবে ভুল তথ্য দেয়া হলে কোম্পানীকে শাস্তির মুখে পড়তে হবে। এতে করে নিয়োগের ক্ষেত্রে শতভাগ স্বচ্ছতা বজায় রাখা সম্ভব হবে। যে নির্দেশনাটি জারি করা হয়েছে, সেটি এ খাতের শৃঙ্খলা ফেরাতে সহায়তা করবে। ’’
আইডিআরএর নন-লাইফ সদস্য আবু বকর অর্থবাংলাকে বলেন, ‘‘দেশের কোটি মানুষের সঙ্গে জড়িয়ে আছে বীমা খাত। এই খাতের সংস্কার প্রয়োজন- এ জন্য যথাযথ কিছু পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে। বীমা আইন ও অন্য আরোপিত বিধি-নিষেধ পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে অনুসরণ ও বাস্তবায়নের মাধ্যমে বীমা খাতে ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে।’’


