জুলাই চেতনা’য় ঐক্যবদ্ধ দলগুলোর মধ্যে বিভেদ ‘রহস্যজনক’

‘সংস্কার চলছে-বিকল্প পথে চলুন’ রাস্তায় হরহামেশাই এমন সাইনবোর্ড চোখে পড়ে। কোনো রাস্তা সংস্কারকাজে মূল রাস্তাটি বন্ধ রাখায় পথচারীদের অন্য পথে চলাচলের পরামর্শ দেয়া হয়। অন্তর্বর্তী সরকার এখন যেন সংস্কার নিয়ে ব্যস্ত। ফলে জনগণের ভোটের অধিকার ‘নির্বাচন গৌণ’ বোঝাচ্ছে। সংস্কার ইস্যুতে জাতীয় ঐকমত্য কমিশনে দিনের পর দিন রাজনৈতিক দলগুলোর সাথে সংলাপ চলছে। সংলাপের কোথায় লেজ আর কোথায় মাথা জাতি বুঝতে পারছে না।

ঐকমত্য কমিশন কী চায়?

ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের এজেন্ডায় কি কেবল ‘সংস্কার ইস্যু’ ছিল? রাষ্ট্র মেরামতের অজুহাতে আয়োজিত এ সংলাপে অভ্যুত্থানে অংশ নেয়া নাগরিক সমাজ, পেশাজীবী সংগঠন, আইনজীবী সমাজ, শিক্ষক, শিক্ষার্থী, সাংবাদিক, ডাক্তার, প্রকৌশলী, ব্যবসায়ী, শ্রমিক, কৃষক ও প্রান্তিক জনগণের প্রতিনিধির মতামতের প্রয়োজন নেই? সংলাপে অংশ নেয়া বিএনপি, জামায়াতসহ কয়েকটি দল ছাড়া প্যাডসর্বস্ব রাজনৈতিক দলগুলোর কি গণ-অভ্যুত্থানে অংশগ্রহণ ছিল? যারা জাতীয় ঐকমত্য কমিশনে রয়েছেন আন্দোলনে তাদের ভূমিকা কি ছিল? রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধি হিসেবে সংলাপে যারা অংশ নিচ্ছেন তাদের বেশির ভাগই অপরিচিত মুখ। প্রশ্ন হচ্ছে, এ সংলাপ কতদিন চলবে? সংলাপে যারা নেতৃত্ব দিচ্ছেন তাদের উদ্দেশ্য কী? এ নিয়ে সোশ্যাল মিডিয়ায় বিতর্ক শুরু হয়েছে।

বাংলাদেশের রাজনীতির ইতিহাসে এমন দীর্ঘমেয়াদি সংলাপ কেউ দেখেনি। অবশ্য জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সহসভাপতি ড. আলী রীয়াজ গতকাল রাজধানীর ফরেন সার্ভিস একাডেমিতে রাজনৈতিক দলগুলোর সাথে দ্বিতীয় ধাপের সংলাপের ১৫তম দিনের আলোচনায় দাবি করেছেন, ‘৩১ জুলাইয়ের মধ্যে একটি সনদের জায়গায় যাওয়া। যেটি আপনাদের-আমাদের সবার ইচ্ছা ও প্রচেষ্টা। দেশের জনগণও সেটিই প্রত্যাশা করছেন।’ শেখ হাসিনার পালানো এবং ড. ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তী সরকার গঠনের পর রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে ঐক্য অটুট ছিল। বিশেষ করে শেখ হাসিনা ও আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে সবাই ছিলেন একআত্মা। হাসিনার পক্ষে ভারত আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বাংলাদেশের বিরুদ্ধে অপপ্রচার শুরু করলে সব দল ঐক্যবদ্ধভাবে প্রতিবাদ করে।

শুধু তাই নয়, ভারত বাংলাদেশকে নানাভাবে অস্থিরতা তৈরির চেষ্টায় জুডিশিয়াল ক্যু, সংখ্যালঘু নির্যাতনের ভুয়া প্রচারণা, গার্মেন্টসে অস্থিরতা, পাহাড়ে অশান্তিসহ নানা অপপ্রচার চালালে সব দল ঐক্যবদ্ধভাবে প্রতিবাদ করে। কিন্তু জাতীয় ঐকমত্য কমিশন গঠন এবং সংস্কার ইস্যুতে আলোচনা শুরু হওয়ার পর হঠাৎ করে জামায়াত, ইসলামী আন্দোলন এবং ছাত্রদের দল এনসিপি ‘পিআর পদ্ধতির নির্বাচন’ এবং ‘সংস্কারের পর নির্বাচন’ দাবিতে সোচ্চার হয়ে উঠে। ফলে গণ-অভ্যুত্থানের রাজনৈতিক শক্তিগুলোর মধ্যে বিভেদ দেখা দেয়।

যাদের নিয়ে অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা পরিষদ গঠন এবং বিভিন্ন কমিশনের গুরুত্বপূর্ণ পদে বসানো হয়েছে তাদের বেশির ভাগের সাথে জনগণের কোনো সম্পৃক্ততা অতীতে ছিল না; বর্তমানেও নেই। কেউ বিদেশে নাগরিকত্ব গ্রহণ করে দীর্ঘদিন ধরে বসবাস করেছেন। কেউ দেশে থাকলেও এনজিও এবং একান্ত নিজেদের নিয়ে সময় কাটিয়েছেন। জনগণ থেকে এরা যোজন যোজন মাইল দূরে। এদের কেউ কেউ ১৮ বছর আগে যুক্তরাষ্ট্র ও ভারতের প্রযোজনায় ওয়ান-ইলেভেনের মাধ্যতে গঠিত ফখুরুদ্দিন-মঈন ইউ আহমদ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সুবিধাভোগী। এখন নিজেদের সুবিধা দীর্ঘমেয়াদি করতে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে বিরোধ বাধিয়ে রাখছেন এমন অভিযোগ তুলেছেন সোশ্যাল মিডিয়ায়।

অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা ও সংস্কার কমিশনের গুরুত্বপূর্ণ পদে থাকা ব্যক্তিদের সম্পর্কে সাংবাদিক এম এ আজিজ বলেছেন, অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টাদের মধ্যে ১৭ জন বিদেশি নাগরিক। এদের সঙ্গে জনগণের কোনো সম্পর্ক নেই। ড. ইউনূসও দুটি দেশের নাগরিক এবং তিনি প্রধান উপদেষ্টার পদে বসে ব্যবসায়ীর মতোই নিজের সুবিধা আদায় করে ব্যবসা করছেন। অন্যদিকে, এনসিপি যারা গঠন করেছেন সেই ছাত্ররা নির্বাচন হলে একটি আসনও পাবে না। ফলে নির্বাচন বিলম্বিত করা হচ্ছে।

জানা যায়, ড. মুহাম্মদ ইউনূস সরকার গঠন করার পর জনগণের ভোটের অধিকার পুনঃপ্রতিষ্ঠায় নির্বাচন দেয়ার বদলে বিভিন্ন বিষয়ে সংস্কারের দিকে ঝুঁকে পড়েন। তিনি প্রায় ১১টি সেক্টরে সংস্কারের জন্য কমিশন গঠন করেন। কমিশনগুলো রিপোর্ট দেয়ার আগেই গত ১৩ ফেব্রুয়ারি প্রধান উপদেষ্টা প্রফেসর ড. মুহাম্মদ ইউনূসকে সভাপতি করে সাত সদস্যের ‘জাতীয় ঐকমত্য কমিশন’ গঠন করা হয়।

সংবিধান সংস্কার কমিশনের প্রধান এবং দীর্ঘ তিন দশক থেকে আমেরিকায় বসবাসকারী প্রফেসর ড. আলী রীয়াজকে এই কমিশনের সহসভাপতি এবং জনপ্রশাসন সংস্কার কমিশন প্রধান আব্দুল মুয়ীদ চৌধুরী, পুলিশ সংস্কার কমিশনের প্রধান সফররাজ হোসেন, নির্বাচন ব্যবস্থা সংস্কার কমিশনের প্রধান ড. বদিউল আলম মজুমদার, বিচার বিভাগ সংস্কার কমিশনের প্রধান বিচারপতি এমদাদুল হক এবং দুর্নীতি দমন কমিশন সংস্কার কমিশনের প্রধান ড. ইফতেখারুজ্জামানকে সদস্য করা হয়। এ কমিশন ১৫ ফেব্রুয়ারি থেকে এই কমিশন কাজ শুরু করে। প্রথমে রাজনৈতিক দলগুলোর মতামত নিতে এ কমিশন সংস্কারের ১৬৬টি গুরুত্বপূর্ণ সুপারিশ নিয়ে ছক আকারে পাঠায় এবং নেয়। এরপর দলগুলোর সঙ্গে এ কমিশনের আলোচনা শুরু করে। ২০ মার্চ থেকে শুরু হওয়া প্রথম ধাপের আলোচনা চলে ১৯ মে পর্যন্ত। অতঃপর জাতীয় ঐকমত্য কমিশন রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে গত ২ জুন দ্বিতীয় পর্বের আলোচনা শুরু করে। গতকাল ছিল সংলাপের ১৫তম দিন। আলোচনায় অংশ নেয়া নেতাদের বেশির ভাগই অপরিচিত এবং জনগণ থেকে বিচ্ছিন্ন।

নির্বাচন করলে ইউনিয়ন পরিষদের মেম্বার হতে পারবেন না এমন নেতাদের সংস্কার সংলাপে গুরুত্ব দিয়ে কালক্ষেপণ চলছে। ছয় বছর আগে গণভবনে রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে হাসিনার সংলাপের মতো। ২০১৮ সালের নির্বাচনের আগে শেখ হাসিনার গণভবনে রাজনৈতিক দলগুলোর সাথে সংলাপের কথা মনে আছে? ওই বছরের নভেম্বর মাসে আয়োজিত সংলাপে দেড়শ’ দলকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। ওই সংলাপে জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট নেতা ড. কামাল হোসেন কি খেতে পছন্দ করেন তা গণমাধ্যম ও সোশ্যাল মিডিয়ায় গুরুত্বপূর্ণ খবরে পরিণত হয়েছিল। বর্তমানের জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সংলাপ নিয়ে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমদ বলেছিলেন, ‘সংলাপে আলোচনার চেয়ে খানাপিনা বেশি হয়’।

জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সংলাপে অংশগ্রহণ করেছেন এমন কয়েকজন নেতা জানান, দিনের পর দিন ধরে সংলাপে তারা বিরক্ত। তবে সংলাপে সুযোগ পাওয়ায় তারা খুশি। কিন্তু তারা মনে করেন, এমন সংলাপ জাতির কোনো উপকারে আসবে না; বরং সংলাপ দীর্ঘমেয়াদি করা, এনসিপিকে প্রতিষ্ঠিত করাই কমিশনের নেপথ্যের এজেন্ডা। হঠাৎ করে পিআর পদ্ধতি আলোচনায় এনে বিএনপিকে ‘সাইজ’ দিল্লির এজেন্ডা বাস্তবায়নে জামায়াত-এনসিপি-ইসলামী আন্দোলন ঐক্যবদ্ধ হওয়ায় বাংলাদেশ নিয়ে নেতিবাচক প্রচার শুরু হয়েছে। হাসিনার পালানোর পর থেকে ভারত সারাবিশ্বে বাংলাদেশে জঙ্গিবাদের উত্থান ঘটেছে এমন অপপ্রচার চালাচ্ছে। অতঃপর যুক্তরাষ্ট্রের ‘জামায়াত মডারেট ইসলামী দল’ সার্টিফিকেট নিয়ে জামায়াত-শিবির ব্যাপকভাবে প্রচারণা চালাচ্ছে।

জনগণের মধ্যে তেমন সাড়া ফেলতে না পারলেও সোশ্যাল মিডিয়ায় জামায়াত ব্যাপক প্রচারণায় রয়েছে। আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমগুলো বাংলাদেশ ‘মৌলবাদের উত্থান’ ঘটছে এমন খবর প্রচার করছে। বিশেষ করে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে ইসলামী আন্দোলনের সমাবেশে বিএনপিকে বাইরে রেখে অন্য দলগুলোকে আমন্ত্রণ এবং একই স্থানে জামায়াতের সমাবেশে বিএনপিকে বাদ দিয়ে অন্য দলগুলোকে একত্রিত করার খবর আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে প্রচার হচ্ছে। আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম এটিকে মৌলবাদের উত্থান প্রচার করছে। নির্বাচন বিলম্বিত হলে এমন প্রচারণা চলতেই থাকবে। অথচ সংস্কারের নামে নির্বাচন বিলম্বিত করার চেষ্টা চলছে। বাংলাদেশ লিবারেল ডেমোক্রেটিক দেশ। নির্বাচন বিলম্ব করে এমন প্রচারণা উসকে দেয়ার মাধ্যমে কী দেশের লিবারেল ডেমোক্রেটিক দেশের পরিচিতির ব্র্যান্ডিং চেঞ্জ করার অপচেষ্টা চলছে।

সম্পর্কিত খবর